
কানাডার কুইবেক প্রদেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু খাদ্যসামগ্রী ও স্বাস্থ্য-সংশ্লিষ্ট পণ্যের ওপর থেকে প্রাদেশিক বিক্রয় কর আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করা হয়েছে। বুধবার থেকে কার্যকর হওয়া এই সিদ্ধান্তের ফলে নির্দিষ্ট কিছু পণ্য কেনার সময় ভোক্তাদের আর প্রায় ১০ শতাংশ কিউএসটি পরিশোধ করতে হবে না। প্রাদেশিক সরকারের দাবি, এই পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কিছুটা কমাতে সাহায্য করবে। তবে অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন, এর প্রকৃত আর্থিক প্রভাব সীমিত হতে পারে এবং সিদ্ধান্তটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ।
সরকারের ঘোষণায় বলা হয়েছে, কর প্রত্যাহারের সুবিধা সব ধরনের পণ্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। বরং দৈনন্দিন ব্যবহারের কিছু নির্দিষ্ট খাদ্য ও স্বাস্থ্যপণ্যের ওপরই এই ছাড় কার্যকর হবে। যেসব পণ্যে আর কিউএসটি দিতে হবে না, তার মধ্যে রয়েছে : নির্দিষ্ট কিছু সিঙ্গেল-সার্ভিং আইসক্রিম, কিছু বেকড পণ্য, প্রস্তুত করা ফল ও সবজির ট্রে, নির্দিষ্ট ধরনের লবণযুক্ত বীজ ও বাদাম, টয়লেট পেপার এবং টিস্যু পেপার। সরকারের ভাষ্য, এসব পণ্য নিয়মিত কেনাকাটার তালিকায় থাকায় কর ছাড়ের সুফল সরাসরি সাধারণ ভোক্তারা পাবেন।
কুইবেকে কিউএসটির হার ৯.৯৭৫ শতাংশ। অর্থাৎ, কোনো পণ্যের মূল দাম যদি ৫ ডলার হয়, তাহলে কেবল কিউএসটি বাবদ প্রায় ৫০ সেন্ট অতিরিক্ত পরিশোধ করতে হয়। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, নতুন নীতির ফলে একটি পরিবার বছরে গড়ে প্রায় ৫০ ডলার পর্যন্ত সাশ্রয় করতে পারবে। অঙ্কের হিসেবে এটি খুব বড় না হলেও, ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির সময়ে নিয়মিত কেনাকাটায় কিছুটা হলেও স্বস্তি এনে দিতে পারে বলে মনে করছে সরকার।
কুইবেকের প্রিমিয়ার ক্রিস্টিন ফ্রেশেট গত মে মাসে প্রথম এই কর ছাড়ের ঘোষণা দেন। সে সময় তিনি বলেছিলেন, মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোই সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার এবং সেই লক্ষ্যেই নির্দিষ্ট কিছু খাদ্য ও স্বাস্থ্যপণ্যের ওপর থেকে কিউএসটি স্থায়ীভাবে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়তে থাকায় মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়েছে। সরকারের এই পদক্ষেপ সেই চাপ কিছুটা কমানোর একটি প্রচেষ্টা।
ডালহৌসি বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রি-ফুড অ্যানালাইটিকস ল্যাবের পরিচালক সিলভেইন শার্লেবোয়িস, যিনি এই নীতি প্রণয়নে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন, তার মতে এই সিদ্ধান্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দিক রয়েছে। তিনি বলেন, প্রস্তুত খাবারের কাউন্টার থেকে যারা নিয়মিত খাবার কেনেন, তাদের বড় একটি অংশই জ্যেষ্ঠ নাগরিক বা একা বসবাসকারী মানুষ। অনেক সময় দোকানে একটি পণ্য আলাদাভাবে কেনার সুযোগ থাকে না; বরং তিন বা চারটি একসঙ্গে কিনতে হয়। তার ভাষায়, একজন ব্যক্তি যদি মাত্র একটি মাফিন কিনতে চান, কিন্তু বাধ্য হয়ে কয়েকটি কিনতে হয়, তাহলে অতিরিক্ত খাবার অপচয় হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ফলে কর ছাড় থাকলেও ভোক্তার প্রকৃত সুবিধা কমে যায়। নতুন নীতির মাধ্যমে অন্তত কিছু ক্ষেত্রে সেই বৈষম্য কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
তবে সবাই এই উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন না। অর্থনীতিবিদ ও কলামিস্ট পিয়েরে-ইভস ম্যাকসুইনের মতে, পরিবারের বার্ষিক ৫০ ডলার সাশ্রয় জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় খুবই সীমিত। তার দাবি, নির্বাচনী প্রচারণার আগে সরকারের জনপ্রিয়তা বাড়ানোর লক্ষ্যেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সমালোচকদের যুক্তি, যদি সত্যিই মানুষের আর্থিক চাপ কমানো উদ্দেশ্য হয়, তাহলে আরও বিস্তৃত পরিসরে কর হ্রাস বা আয়কর সুবিধার মতো পদক্ষেপ বেশি কার্যকর হতে পারত।
খুচরা বিক্রেতারা জানিয়েছেন, এই কর ছাড় তাদের বিক্রির পরিমাণ বা রাজস্বে বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে বলে তারা মনে করছেন না। তবে নতুন কর কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে বিলিং ও পয়েন্ট-অফ-সেল (POS) সফটওয়্যারে পরিবর্তন আনতে হবে, যা ব্যবসায়ীদের জন্য অতিরিক্ত প্রশাসনিক কাজ তৈরি করবে। যদিও দীর্ঘমেয়াদে এটি ভোক্তাদের জন্য কেনাকাটা কিছুটা সহজ করবে বলে তাদের আশা।
কুইবেক সরকারের এই উদ্যোগ মূলত প্রতীকী হলেও তা সম্পূর্ণ গুরুত্বহীন নয়। দৈনন্দিন ব্যবহারের কিছু প্রয়োজনীয় পণ্যে কর ছাড়ের ফলে ভোক্তারা নিয়মিত কেনাকাটায় সামান্য হলেও সাশ্রয় করবেন। বিশেষ করে একা বসবাসকারী ব্যক্তি, প্রবীণ নাগরিক এবং সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর জন্য এই সুবিধা কিছুটা স্বস্তি বয়ে আনতে পারে। তবে অর্থনীতিবিদদের একটি অংশের মতে, জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে আরও বড় পরিসরের অর্থনৈতিক সংস্কার প্রয়োজন। ফলে এই কর ছাড় সাধারণ মানুষের জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও, মূল্যস্ফীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মোকাবিলায় এটি এককভাবে যথেষ্ট নয়।
