লক্ষাধিক মানুষ বিদ্যুৎহীন, নগর কাঠামোর দুর্বলতা প্রকট

জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে মাত্র কয়েক ঘণ্টার টানা মুষলধারে বৃষ্টিপাত কানাডার অন্যতম আধুনিক শহর টরন্টোর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা পুরোপুরি বিপর্যস্ত করে দেয়

জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে মাত্র কয়েক ঘণ্টার টানা মুষলধারে বৃষ্টিপাত কানাডার অন্যতম আধুনিক শহর টরন্টোর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা পুরোপুরি বিপর্যস্ত করে দেয়। আবহাওয়া দপ্তরের তথ্যে জানা গেছে, মাত্র তিন ঘণ্টায় ৯০ মিলিমিটারেরও বেশি বৃষ্টি হয়েছে যা সাধারণত এক মাসে যতটা হয়, তারও চেয়ে বেশি।

এই আকস্মিক বৃষ্টির ধাক্কায় শহরের প্রধান সড়ক, মেট্রোর টানেল, আবাসিক এলাকা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সবকিছু পানির নিচে তলিয়ে যায়। বিদ্যুৎ লাইনে পানি ঢুকে পড়ায় প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার বাসিন্দা বিদ্যুৎহীন অবস্থায় দীর্ঘ সময় কাটাতে বাধ্য হন। নগরীর বহু এলাকায় যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়; জরুরি পরিষেবা এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

- Advertisement -

শহরের ডাউনটাউন, স্কারবোরো, নর্থ ইয়র্কসহ একাধিক এলাকায় গাড়ি ডুবে আটকে যায়। পুলিশের পাশাপাশি দমকল বাহিনীকে নামতে হয় শত শত মানুষকে উদ্ধার করতে। পাতাল রেলের অন্তত ছয়টি স্টেশন সম্পূর্ণ প্লাবিত হওয়ায় যাত্রীদের হাঁটতে হাঁটতে বের হয়ে আসতে হয়। অনেক যাত্রী ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থেকেছেন অন্ধকার টানেলে।

শহরের বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, ঝড় ও ভারী বৃষ্টির কারণে প্রায় ৫০০-এরও বেশি ট্রান্সফরমার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে পড়া ও তার ছিঁড়ে যাওয়ার কারণে বৃহৎ এলাকা অন্ধকারে ডুবে যায়। জরুরি ভিত্তিতে দুই হাজারেরও বেশি টেকনিশিয়ান মেরামতের কাজ শুরু করলেও পূর্ণ বিদ্যুৎ সেবা পুনরুদ্ধার করতে সময় লেগে যায় ২৪ ঘণ্টারও বেশি।

স্থানীয় বাসিন্দা আসিফ খান টরন্টো বাংলাটাউনকে অভিযোগ করেন,  টরন্টোর ঝড়নিষ্কাশন ব্যবস্থা একেবারেই অপ্রতুল। নগর পরিকল্পনাবিদরাও একমত হয়েছেন যে, শহরের পুরোনো ড্রেনেজ অবকাঠামো আধুনিক জলবায়ুর বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খায় না। অতীতে যতটুকু বৃষ্টিপাত হতো তার তুলনায় এখন দ্বিগুণ তীব্রতা দেখা গেলেও নালা ও ড্রেনের ধারণক্ষমতা একই রয়ে গেছে। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও ভবন প্রায় প্রতিবছরই প্লাবিত হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের হিসাবে, এই একদিনের বৃষ্টিতে টরন্টোর অবকাঠামোগত ক্ষতির পরিমাণ অন্তত ৩০০ মিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার ছাড়িয়েছে। শুধুমাত্র ব্যবসায়িক ক্ষতিই দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ডলার। হাজার হাজার পরিবার ঘর মেরামত, আসবাবপত্র পরিবর্তন এবং বীমা দাবি করতে শুরু করেছেন। তবে বীমা কোম্পানিগুলো সব দাবি পূরণ করবে কিনা, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টরন্টো ও আশপাশের অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আকস্মিক বর্ষণ ও প্লাবনের প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। ২০১৩ সালে শহরে যে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল, এবার তার পুনরাবৃত্তি আরও তীব্রভাবে ঘটেছে। তারা সতর্ক করেছেন, নগর ব্যবস্থাপনায় যদি বড় ধরনের সংস্কার না আনা হয় তবে আগামী দিনে আরও ভয়াবহ দুর্যোগ ঘটতে পারে।

এই দুর্যোগ কেবলমাত্র টরন্টোর নগর কাঠামোর দুর্বলতাই উন্মোচন করেনি, বরং দেখিয়ে দিয়েছে যে, বিশ্বের অন্যতম উন্নত শহরও প্রকৃতির আকস্মিক আঘাতের সামনে কতটা অসহায়। নগর পরিকল্পনা ও জলবায়ু অভিযোজন নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে না পারলে ভবিষ্যৎ আরও সংকটময় হয়ে উঠবে এমনই আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

- Advertisement -

Read More

Recent