
কানাডা দিবসকে ঘিরে এবছর অন্টারিও সরকার এক অভিনব উদ্যোগের ঘোষণা দেয়। ২৯ জুন থেকে ৭ জুলাই পর্যন্ত টানা নয় দিন প্রদেশের যেকোনো খোলা জলাশয়ে মাছ ধরতে লাইসেন্সের প্রয়োজন হয়নি। পরিবার, শিশু, পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য উন্মুক্ত এ সুযোগকে কেন্দ্র করে গোটা অন্টারিও উৎসবমুখর হয়ে ওঠে।
প্রাদেশিক সরকারের তথ্য অনুযায়ী, অন্টারিওতে মাছ ধরা কেবল একটি বিনোদন নয়, বরং একটি বড় অর্থনৈতিক খাত। প্রতিবছর প্রায় ১৩ লাখ মানুষ মাছ ধরার সঙ্গে যুক্ত থাকেন, যার মধ্যে প্রায় অর্ধেকই কানাডার বাইরের পর্যটক। বার্ষিক হিসাবে এই খাত অন্টারিওর অর্থনীতিতে অবদান রাখে ১.৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। এ কারণেই সরকার মনে করছে, গ্রীষ্মকালে পর্যটন বাড়াতে বিনা লাইসেন্সে মাছ ধরার এ উদ্যোগ সময়োপযোগী এবং অর্থনীতির জন্য কার্যকর।
অন্টারিওর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যে কত সমৃদ্ধ, তা বোঝা যায় এর জলাশয়ের সংখ্যায়। প্রায় আড়াই লাখ হ্রদ ও নদী এবং তাতে ১৬০টিরও বেশি প্রজাতির মাছ এই বৈচিত্র্যই আকর্ষণ করে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যটককে। সাধারণ সময়ে মাছ ধরতে হলে বয়স ও সময়ভেদে নির্দিষ্ট ফি দিয়ে লাইসেন্স নিতে হয়। তবে এবছর কানাডা দিবস উপলক্ষে সেই নিয়ম শিথিল করা হয়। এর ফলে অসংখ্য পরিবার শিশুদের নিয়ে মাছ ধরতে বের হন।
শিশুরা প্রথমবার মাছ ধরার অভিজ্ঞতা পেয়ে যেমন আনন্দ প্রকাশ করেছে, তেমনি বাবা-মা এটিকে পরিবারের সম্পর্ক দৃঢ় করার এক দারুণ উপায় হিসেবে দেখেছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই উদ্যোগ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতি ভালোবাসা ও সচেতনতা সঞ্চার করবে।
তবে বিনা লাইসেন্স মানেই যে সীমাহীন স্বাধীনতা, তা নয়। প্রাদেশিক প্রাকৃতিক সম্পদ ও বন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নির্দিষ্ট সংরক্ষণ আইন পুরোপুরি কার্যকর ছিল। প্রজাতি অনুযায়ী মাছের আকার, ধরার সীমা এবং মৌসুমের নিয়ম সকলকেই মানতে হয়েছে। এর উদ্দেশ্য ছিল পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং অতিরিক্ত মাছ শিকার প্রতিরোধ করা।
স্থানীয় ব্যবসায়ী এ্যান্দ্রেয়া গনজালভেজ টরন্টো বাংলা টাউনের এই প্রতিবেদককে বলেন, এই উদ্যোগ পর্যটন খাতে বাড়তি প্রাণসঞ্চার করেছে। হোটেল, কটেজ, ক্যাম্পিং সাইট এবং মাছ ধরার সরঞ্জামের দোকানগুলোতে বিক্রি বেড়েছে চোখে পড়ার মতো হারে। অনুমান করা হচ্ছে, নয় দিনে পর্যটন খাতে অতিরিক্ত কয়েক শ’ মিলিয়ন ডলারের আর্থিক কার্যক্রম ঘটেছে।
অনেক বাসিন্দা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন “এটি শুধু অবসর কাটানোর মাধ্যম নয়, পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার এক দারুণ সুযোগ।” কেউ কেউ প্রথমবার ধরা মাছের ছবি শেয়ার করেছেন, আবার অনেকেই বন্ধু-পরিজনের সঙ্গে প্রকৃতির সান্নিধ্যে কাটানো সময়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন।
অভিজ্ঞ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এ উদ্যোগ সাময়িক আনন্দের সীমা ছাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদে প্রদেশের অর্থনীতি ও পরিবেশ সচেতনতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কারণ, মানুষ যত বেশি প্রাকৃতিক সম্পদের সঙ্গে যুক্ত হবে, তত বেশি তার সংরক্ষণে দায়িত্বশীল হবে।
কানাডা দিবস উপলক্ষে অন্টারিও সরকারের এ সিদ্ধান্ত প্রমাণ করেছে যে উৎসব কেবল শহরের আতশবাজি ও কনসার্টে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃতির সান্নিধ্যে থেকেও জাতীয় ঐক্য, আনন্দ এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ভাগাভাগি করা সম্ভব এবারের মাছ ধরা সপ্তাহ তারই এক অনন্য উদাহরণ।


