
কানাডার ভোক্তা বাজারে এথনিক পণ্যের জনপ্রিয়তা গত এক দশকে অভূতপূর্বভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশজুড়ে অভিবাসী জনসংখ্যার ধারাবাহিক প্রবাহ, বহুসংস্কৃতির সমাজব্যবস্থা এবং তরুণ প্রজন্মের বৈচিত্র্যময় স্বাদ ও জীবনধারার প্রভাব এই বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করেছে। বর্তমানে, স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার তথ্য অনুযায়ী, কানাডার মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৩ শতাংশই অভিবাসী। শুধু টরন্টো, ভ্যাঙ্কুভার এবং মন্ট্রিয়েলেই বসবাস করছে প্রায় ৬০ শতাংশ অভিবাসী জনগোষ্ঠী। দক্ষিণ এশীয়, চীনা, ফিলিপিনো, আফ্রিকান এবং লাতিন আমেরিকান সম্প্রদায়গুলো সবচেয়ে বড় অভিবাসী কমিউনিটি হিসেবে পরিচিত।
একটি সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, কানাডীয় মূলধারার প্রায় ৭২ শতাংশ নাগরিক বছরে অন্তত একবার এথনিক পণ্য ব্যবহার করেন, আর ৪৮ শতাংশ নাগরিক মাসে একাধিকবার এথনিক খাবার কেনেন।
কানাডার এথনিক খাবারের বাজার গত দশকে দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। ২০১৫ সালে এথনিক ফুড মার্কেটের আকার ছিল প্রায় ৫.২ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৩ সালের শেষ নাগাদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮.৬ বিলিয়ন ডলারে, অর্থাৎ ৬৫ শতাংশেরও বেশি প্রবৃদ্ধি। বিশেষত হালাল মাংস ও কোশার খাদ্যের বাজার বছরে প্রায় ১৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। দক্ষিণ এশীয় চাল, ডাল ও মসলা জাতীয় পণ্যের বিক্রি গত পাঁচ বছরে দ্বিগুণ হয়েছে। এশিয়ান নুডলস, সুশি, কোরিয়ান কিমচি এবং আফ্রিকান মসলাজাতীয় খাবার এখন শুধু অভিবাসীদের নয়, বরং মূলধারার ভোক্তাদের ডাইনিং টেবিলেও গুরুত্বসহকারে প্রবেশ করেছে।
টরন্টো, ব্র্যাম্পটন এবং সারে-ভ্যাঙ্কুভারের দোকানগুলোতে বছরে গড়ে প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলারের দক্ষিণ এশীয় পোশাক বিক্রি হচ্ছে। শুধুমাত্র বিয়ের মৌসুমেই শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ এবং গয়নার বাজার আয় ছাড়াচ্ছে প্রায় ৭৫ মিলিয়ন ডলার। জরিপ অনুযায়ী, কানাডীয় তরুণদের প্রায় ১৫ শতাংশ বিশেষ অনুষ্ঠানে এথনিক পোশাক পরতে আগ্রহী।
বর্তমানে কানাডায় ১২,০০০-এরও বেশি এথনিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার মধ্যে ৬৫ শতাংশ রেস্টুরেন্ট ও গ্রোসারি, ২০ শতাংশ পোশাক ও ফ্যাশন, এবং বাকিগুলো বিভিন্ন সেবা খাতে সক্রিয়। এই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে বছরে আনুমানিক ১৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি রাজস্ব আসছে এবং প্রায় ১,৫০,০০০ মানুষের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। বড় বড় সুপারমার্কেট চেইন যেমন ওয়ালমার্ট, কস্টকো, লব্লজ এবং মেট্রো ইতিমধ্যেই এথনিক পণ্যের জন্য বিশেষ সেকশন চালু করেছে। শুধু ওয়ালমার্ট কানাডা গত পাঁচ বছরে এথনিক ফুড সেকশনে প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে।
এথনিক পণ্যের জনপ্রিয়তা শুধু অর্থনীতির বিষয় নয়; এটি সংস্কৃতি ও বহুসংস্কৃতির প্রতিফলনও। টরন্টোর ‘টেস্ট অফ দ্য ড্যানফোর্থ’ বা ‘টেস্ট অফ এশিয়া’ মেলার মতো উৎসবগুলোতে প্রতিবছর কয়েক লাখ মানুষ অংশ নেন, যেখানে এথনিক খাবার, পোশাক এবং সাংস্কৃতিক প্রদর্শনীর মাধ্যমে বহুসংস্কৃতির চিত্র ফুটে ওঠে।
অর্থনীতিবিদরা অনুমান করছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে কানাডার এথনিক পণ্যের বাজারের আকার দাঁড়াতে পারে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারে। এতে মূলধারার করপোরেশন, অভিবাসী উদ্যোক্তা এবং স্থানীয় অর্থনীতির জন্য নতুন কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে।
কানাডার বহুসংস্কৃতির বাস্তবতায় এথনিক পণ্য এখন শুধু অভিবাসীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মূলধারার বাজারে এক শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। এটি অর্থনীতি ও সংস্কৃতির এক অনন্য সমন্বয়, যা ভবিষ্যতে কানাডার জাতীয় পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠতে পারে।
