
বছর দুয়েক হলো, নবাব রোডের এই বাসাটায় ভাড়া আছি। ” বাসাটা খুব সুন্দর । বেশি সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ । মনে হয় রিসোর্টে আছি। দূরের পাহাড়গুলো দেখলে মনে হয়, শহরটাকে আগলে রেখেছে । এখান থেকে সুরমা নদী দেখা যায় । নদীর বুকে নৌকা চলে, সেটা যেমন দেখতে ভালো লাগে, তেমনি নদীর উপরের ব্রিজ দিয়ে গাড়িগুলোর যাওয়া আসা দেখতেও ভালো লাগে । ” – কথাগুলো আমার নয়, আমার স্ত্রী নীলার। কিন্তু ছয়মাস যেতে না যেতেই নীলার সুর পরিবর্তন হলো। সে যে কোন মূল্যেই এই বাসা ছাড়তে চায় । কারণ আর কিছুই নয়। কাজের মহিলা বলেছে, বাসার সামনের সবচেয়ে সুন্দর যে জায়গাটা নীলার পছন্দ, যেখানে একটা সুন্দর পুকুর আছে, অনেক সুন্দর সুন্দর গাছপালা আছে, সেটা আসলে কবরস্থান !
নীলা কবরস্থান খুব ভয় পায় । আমাকে বললো,
– প্লিজ অনীক, দয়া করে এই বাসাটা চেন্জ করো। তুমিতো সারাদিন বাড়ি থাকো না। কাজের বুয়া কাজ করে চলে যায় সকাল এগারোটার ভিতরে । আমার ভয় করে।
বাসা পরিবর্তন খুব ঝামেলার কাজ। দুইদিন পরপর বাড়ি পরিবর্তন করা তাই সম্ভব নয়। বললাম,
– তুমি স্মার্ট মেয়ে । ভূতের ভয় কেন পাবে ?
নীলা রাগ করে বললো,
– ভূতের ভয় কেন পাবো ? কতগুলো মৃতলোক চোখের সামনে শুয়ে আছে, ব্যাপারটা ভাবতেই কেমন জানি লাগে ।
– ব্যাপারটা ওভাবে দেখছো কেন নীলা ? আমরা সবাই তো একদিন মরবো। ঐটাইতো আমাদের আসল ঠিকানা । নিজের আসল ঠিকানাকে ভয় পাওয়ার কি আছে?
নীলাকে এটা সেটা বলে বুঝিয়ে দিয়েছিলাম । প্রথম কিছুদিন ঘ্যান ঘ্যান করলেও পরবর্তীতে নীলার ভয়টা কেটে যায় ।
কিছুদিন হলো নতুন একটা আব্দার করছে। প্রায়ই বলে,
– অনীক আজ চেম্বারে যেও না প্লিজ । তোমাকে অদ্ভুত একটা ব্যাপার দেখাবো।
– অদ্ভুত ব্যাপার দেখানোর জন্য চেম্বার বন্ধ রাখতে হবে কেন ? এখনই দেখাও।
– ব্যাপারটা ঘটে বিকাল চারটা পাঁচটার দিকে ।
– তুমি বোঝো না কেন নীলা ? আমার চেম্বার থাকে বিকাল তিনটা থেকে । দুই ঘন্টা দেরি করে গেলে আসতে আসতে রাত একটা দুইটা বেজে যাবে । সকাল আটটা থেকে আবার অফিস । আমারও তো একটু বিশ্রাম এর প্রয়োজন হয়, না কি ?
– একদিন চেম্বার না করলে কি হয় ?
– এটা তুমি কি বলো ? রোগীগুলো কতদূর থেকে আসে। তাদের সমস্যাটা তুমি বুঝবা না ?
– তুমি ছাড়া কি দেশে আর কোন ডাক্তার নেই ? একদিন তাদের কাছে যেতে পারবে না ?
– অদ্ভুত ব্যাপারটা কি সেটা বলবেতো ?
– দরকার নেই । তুমি যাও চেম্বারে।
নীলাকে বোঝানো আর না বোঝানো সমান কথা। আমি বেশি পাত্তা দিই না । চলে যাই চেম্বারে।
আজ নীলার জন্মদিন । ওকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য চেম্বার বন্ধ রেখেছি। নীলা ভীষণ খুশি । ওকে বললাম,
– বেশ কিছুদিন আগে তুমি একটা অদ্ভুত ব্যাপার আমাকে দেখাতে চাইতে। আজ দেখানো যাবে ?
নীলা একটু গম্ভীর হয়ে বললো,
– বাদ দাও। আমি একটু বেশি কৌতুহলী । তাই কৌতুহল জেগেছিল । এখন আর কৌতুহল নেই।
– এবার কিন্তু তুমি আমার কৌতুহল বাড়িয়ে দিচ্ছ। কি ব্যাপার বলাতো যাবে ?
– তেমন কিছু নয়। গত সাত আট মাস ধরে দেখছি, বিকাল চারটা পাঁচটার দিকে কালো রঙের একটা দামী গাড়ি এসে থামে কবরস্থানটার সামনে । একটা সুন্দর ছেলে গাড়িটা থেকে নামে। সম্ভবত নিজেই ড্রাইভ করে আসে। কারণ দ্বিতীয় আর কাউকে সাথে কখনো দেখিনি । প্রথম প্রথম তেমন খেয়াল করতাম না। কিন্তু একটা দিন বিকালে বেলকনিতে বসেছিলাম । হঠাৎ খেয়াল করে দেখি, ছেলেটা গাড়ি থেকে দুইটা ফোল্ডিং চেয়ার বের করলো। একটায় নিজে বসলো । আর একটায় সুন্দর একটা ফ্ল্যাক্স এবং দুইটা মগ রাখলো। আমি ভেবেছিলাম, হয়তো কারো আসার কথা। কিন্তু অবাক হয়ে খেয়াল করলাম, সে দুইটা মগেই চা বা কফি ( দেখে বোঝা যায়নি ) ঢেলে একটা মগ চেয়ারটার উপর রাখলো আর একটা মগের চা বা কফি নিজে খেলো। ব্যাপারটা আমার কাছে অদ্ভুত লেগেছে । তাই প্রতিদিন খেয়াল করা শুরু করলাম । প্রতিদিন একই কাজ করে সে। প্রতিদিন এক দুই ঘন্টা সময় সে এই কবরস্থানটার সামনে কাটায়। এখন আমিও দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি।
ব্যাপারটা আমার কাছেও বেশ অদ্ভুত লেগেছে । বললাম,
– এখনতো পাঁচটা দশ বাজে। চলোতো বেলকনিতে । দেখি আজও এসেছে কিনা।
বেলকনিতে এসে দেখি, নীলা ঠিকই বলেছে । ছেলেটা বসে আছে কবরস্থানের সামনে ! চা বা কফি পর্ব সম্ভবত শেষ হয়েছে । পাশের চেয়ারে রাখা। আমি নীলাকে বললাম,
– দাড়াও। ছেলেটার সাথে একটু কথা বলে আসি।
– কি দরকার ? সেতো আমাদের কোন ডিস্টার্ব করছে না ?
– না, সেজন্য নয়। কৌতুহল হচ্ছে তাই। কৌতুহল হলে অপেক্ষা করতে আমার ভালো লাগে না ।
আমি নীলাকে আর কথা বলার সুযোগ না দিয়ে লিফট দিয়ে নেমে গেলাম নিচে। সোজা ছেলেটার কাছে যেয়ে বললাম,
– আমি ডা. অনীক। পাশের এই বিল্ডিংটাতেই থাকি । আপনাকে প্রায়ই দেখি । ভাবলাম, পরিচিত হয়ে যায় ।
ছেলেটা একটু বিব্রত হলো। সম্ভবত তাকে কেউ খেয়াল করে, এটা তার মাথায় আসেনি। খুব লাজুক ভঙ্গিতে বললো,
– আমি রাসেল। বিজনেস করি। আমার কিছু শিল্প প্রতিষ্ঠান আছে।
– কবরস্থানের সামনে বসে থাকেন। বাবা মা কেউ মারা গেছে নাকি ?
– জ্বি না। আট মাস এগারো দিন আগে আমার স্ত্রী মারা গেছে ।
আমি বেশ চমকে উঠলাম। এত অল্প বয়সী একজনের বউ মারা গেছে, ব্যাপারটা মাথায় আসেনি। আমি বেশ আহত হয়ে বললাম,
– খুব বেশি ভালোবাসতেন বুঝি ?
– হ্যাঁ । কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, আমার স্ত্রী নেহা সেটা বুঝতে পারেনি। কথা নেই বার্তা নেই, হঠাৎ করেই সুইসাইড করে বসলো।
– মানে ?!!!
– বুয়েট থেকে পাশ করার পরে, আমি চাকরি না করে বিজনেস শুরু করি। খুব অল্প দিনেই আমার বিজনেসে সফলতা আসে। আমি একটার পর একটা শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়তে থাকি। আমার প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম বললে, আপনিও চিনবেন। আমি দিনরাত পরিশ্রম করে এগুলো তৈরি করেছি। নেহা এত ব্যস্ততা পছন্দ করতো না । সব সময় বলতো, “আমাকে অন্তত এক দুই ঘন্টা সময় দাও। বিকালটা বাসায় থাকো। দুজনে একসাথে কফি খাবো। ” আমি নেহার কোন কথাই কানে তুলতাম না। বিজনেসটা আমার কাছে নেশার মত ছিল।আমি থামতে পারছিলাম না । বোকা মেয়েটা ভাবলো, আমি ওকে ভালোবাসি না। হঠাৎ করেই সুইসাইড করলো। মৃত্যুর আগে ছোট্ট করে লিখে রেখে গেছে, ” আমাকে আর সময় দিতে হবে না । তোমাকে মুক্তি দিয়ে গেলাম। ”
ছেলেটা হাউমাউ করে কেঁদে ফেললো। বললো, ” আমার নেহা কত বোকা বলেন ? আমি এসব কার জন্য করছিলাম ? ওর ভবিষ্যতের জন্য, তাই না বলেন ? ওকে কোনদিন বলা হয়নি, আমি ওকে প্রচন্ড ভালোবাসি । সারাক্ষণ এই ব্যাপারটা আমাকে প্রচন্ড কষ্ট দেয় । ও জেনে গেল না, আমি ওকে কতটা ভালোবাসি। ”
আমিও ওর সাথে কাঁদছি। আশ্চর্য ! অপরিচিত একজনের কষ্ট দেখে আমার কেন কষ্ট হচ্ছে ? চোখটা মুছে বললাম,
– চলুন, আপনার স্ত্রীর কবরের কাছে যেয়ে বলবেন, আপনি তাকে ভালোবাসেন।
– কবরস্থানের ভিতরে যেতে আমার খুব ভয় করে। এইজন্যইতো প্রতিদিন বাইরে বসে থাকি।
– আমার সাথে চলুন ।
আমি রাসেল সাহেবকে নিয়ে তার স্ত্রীর কবরের পাশে গেলাম। সে বেশ ইতস্তত করছিল। আমি বললাম, আমি একটু সরে দাঁড়াচ্ছি। আপনি আপনার মনের কথা বলে ফেলুন।
কবরের কাছে যেয়ে সে কি বলেছে আমি শুনতে পাইনি। তবে ফিরে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললো, ” আপনি আমার কত বড় উপকার করলেন, বলে বোঝাতে পারবো না ভাই। অনেকদিন পর আজ অনেক হালকা লাগছে । আজ আমি ঘুমাতে পারবো। আপনার এই উপকারের কথা আমার আজীবন মনে থাকবে । ”
রাসেল সাহেব চলে গেলেন । আমার মনে তখন ঝড় উঠেছে । নীলাকেও তো আমি এভাবেই অবহেলা করি ! মেয়েটা সারাদিন বাসায় একা একা থাকে । আমি তাকে সময়ই দিইনা ! আর আমিও তো নীলাকে কখনো বলিনি, ওকে আমি কতটা ভালোবাসি । আমি আমার চেম্বারে ফোন করে জানিয়ে দিলাম, অনিবার্য কারণবশত আগামী তিনদিন আমার চেম্বার বন্ধ থাকবে । এটা নীলার জন্য একটা সারপ্রাইজ । বাসায় এসে নীলার হাতটা ধরে বললাম, ” তোমাকে খুব ভালোবাসি নীলা। ” অনভ্যস্ততার জন্য কথাটা কেমন আধো আধো হলো। নীলা এরকম শুনে অভ্যস্ত নয়। সেও নতুন বউ এর মত মুখটা নিচু করে ফেললো। বললো,
– কি হয়েছে বলবেতো ? ছেলেটার সাথে কি কথা হলো তোমার?
– সেটা তোমার জানার দরকার নেই । শুধু জানো, আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি ।
নীলার চোখে মুখে দারুণ তৃপ্তি । এতটা সুখী ওকে আগে কোনদিন দেখিনি।
