
দৈবাৎ আয়ুশের এমন প্রশ্নে প্রভূত চমকালো রজনী। প্রমোদে আবৃত গোটা মুখ-অবয়ব সহসা তমসায় ছেয়ে গেলো এক লহমায়ই! আয়ুশের অমন অগ্নিমূর্তি শ্রীতে বেশ খানিকটা ভয়ও পেলো ষোড়শী ভিতু রজনী। শুকনো ঢোক গিললো, পরপর আয়ুশের রক্তিমাভা টগবগে নেত্র দেখে চিবুক নুয়ে ফেললো। মৌন রইলো খানিকক্ষন, কিছু বলার জন্যে মৃদু অধর নাড়লেও কিছুই বলার সাহস অবধি পেলোনা!
রজনীর মৌনতায় আয়ুশ ধৈর্যের খেই হারালো। আগের চাইতেও আরও অত্যধীক রাগান্বিত কন্ঠস্বরে বলে উঠলো,” কথা বলতে পারিস না তুই? বধির হয়ে গিয়েছিস? ওই স্টুপিট তোকে যে উত্যক্ত করত, তুই সেটি জানাসনি ক্যান আমায়? তোকে না আগেও বহুবার বলেছি কেও কিছু বললে আমাকে ইনফ্রম করতে , তারপরেরটা আমি দেখে নিতাম!ওই রাকিব নামের ছেলেটি তোকে প্রপোজ করার মত সাহস পেলো কোথায়?”
আয়ুশের বাজখাই ধমকে রজনী কেপে উঠলো, পরপর অঝর ধারায় নেত্রযুগল বেয়ে পানি উপচে গড়িয়ে বেরিয়ে এলো। ঠোঁট চেপে কান্না আটকানোর প্রয়াস চালাতে লাগলো।
ছেলের এমন চিৎকারে হাবিবা বেগম ছেলের ঘরের দরজার খানিক দুরে দাঁড়িয়ে বলে উঠলেন,”এই আয়ুশ, এভাবে মেয়েটার সাথে চিল্লাছসিস ক্যান? কি হয়েছে?”
আয়ুশ সেদিকে তাকিয়ে লম্বা কদমে দরজার দিকে এগিয়ে গেলো। মায়ের দিকে ক্রদ্ধ দৃষ্টে তাকিয়ে ঠান্ডা স্বরে বললো,” তেমন কিছু না মা, এটা আমাদের ব্যাপার, তুমি ভেবনা।” এই বলে তড়িত গতিতে শয়ন কক্ষের দরজা লাগিয়ে রজনীর দিকে ফের এগিয়ে গেলো।
ছেলের এই কাটখট্টা জবাবে হাবিবা বেগম বিরবির করে বললেন,” খান বংশের বংশধর, এতো সহজে কথার উত্তর দেবে,এটা কল্পনা করাও ভুল! যাক বাপু ওদের ব্যাপার ওরা বুঝুক!” এই বলে তিনি ড্রাইং রুম পেরিয়ে রান্না ঘরের দিকে যেতে নিলে বাধ সাধলো অদ্রি। সোফায় পায়ের উপর পা তুলে আশাম করে বসে টিভিতে হিন্দি মুভি দেখছিলো সে। মাকে দেখেই খানিক আগ্রহসমেত শুধালো,” ও মা, ভাইয়ার হঠাৎ মেজাজ খারাপ হলো কেনো? কি এমন হলো যে এভবর ষারের মত চিল্লাচ্ছে?”
তিনি মেয়ের পানে তাকিয়ে খ্যাক করে বলে উঠলেন,” তোর ভাইয়ের মেজাজ ভালো ছিলো কবে? কি জানি কি হয়েছে কিভাবে মেয়েটার সাথে চিল্লাচ্ছে! আক্কল জ্ঞান আর এই জনমে হবে না হতচ্ছাড়ার!” এই বলে তিনি ধুপধাপ পায়ে রান্না ঘরের দিকে চলে গেলেন।
আদৃ ব্যাক্কলের ন্যায় মায়ের যাওয়ার দিকে চেয়ে রইলো। কি হলো কিছুই তার মোটা মগজে ধুকলোনা।
ওদিকে, আয়ুশ রজনীর সামনে দাঁড়িয়ে ফের রেগেমেগে কিছু বলতে নিলে রজনী মাথা নুয়ে মিনমিনিয়ে বললো,” আমি বলতে চেয়েছিলাম আপনাকে কিন্তু, ভয় পেয়েছিলাম খুব! তাই বলিনি। কাওকে কিছুই বলিনি। এই প্রোপজালের ব্যাপারে শুধু লিজা আর অদৃ আপু জানতো। আমিই ওদেরকে খুব করে অনুরোধ করছিলাম কাওকে কিছু না বলতে তাই আর বলেনি।”
রজনীর কথাগুলো কর্ণে প্রবেশ করতেই আয়ুশের শিথিল ভ্রু গুটিয়ে এলো। মুখশ্রিতে রাগ কমে সেথায় এক রাশ অবাকের রেশ ভির জমালো। এই ভঙ্গিমা রেখেই রজনীকে বললো,” ভয় পেয়েছিলি! সিরিয়াসলি! কিন্তু কেনো? ঐ ছেলে তোকে ভয় দেখিয়েছে?”
রজনী উপর নিচ মাথা দোলালো কিঞ্চিত। পর মুহুর্তে বলতে আরম্ভ করলো,” ঘটনাটি বিয়ের দু সপ্তাহ আগে ঘটেছিলো ।সেদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছি। লিজা সিক থাকায় ও সেদিন যাইনি। আর শাকিল নানু বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলো দিন দুয়েকের জন্যে। স্কুলের সদর দরজা পেরিয়ে খানিক পথ এগোতেই রাকিব কালো রঙের বাইক নিয়ে অকস্মাৎ আমার সামনে পথ আটকে হাজির হলো। তার অতর্কিত আগমনে আমি ভড়কে যাই । সাথে খুব ভয় পাই। ও বাইক থেকে নেমে আমার সামনে এসে দাঁড়ালো। আমি মনে মনে ভেবেই নিয়েছিলাম যে আজও ও কিছু আজেবাজে কথা বলে নিজের মতো চলে যাবে। কিন্তু সেদিন ও আমাকে এক রাশ অবাক করে দিয়ে আমার সামনে আঠু মুড়ে বসে পরলো। তখন ছিলো বিকেল বেলা। রাস্তা ঘাটে লোকজন ছিলো না। সে সময়টা গ্রামের মেঠো পথ নিরব থাকে জানেনইতো! আমি সেদিন প্রচুর অবাক হই রাকিবের ভিন্ন আচরণে।
সেদিন ও কোমল স্বরে আমায় প্রপোজ করেছিলো। বলেছিলো,” ক্ষমা করে দিও রজনী, অনেক অন্যায় করছি,কটূ কথা বলেছি। তবে জেনে রেখ আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি,অনের বেশি! প্লিজ সবটা ভুলে গিয়ে আমার ভালোবাসাকে গ্রহন করে নাও। কথা দিচ্ছি রাজরানী করে রাখবো তোমায়! পৃথিবীর সকল সুখ তোমার পায়ের কাছে এনে রাখবো।”
অর মুখে সেদিন এ কথা শুনে যেমন অবাক হই তেমন রাগও হই। এতদিন আমায় উত্যক্ত করে এখন এসব সিনেমার প্রলাপ বকা হচ্ছে! ঠিক কতো মেয়ের সাথে ওর গভীর সম্পর্ক ছিলো তার ঠিক নেই!
সেদিন আমি প্রচন্ড রকমের রেগে ওকে বলে ফেলি,”অনেক সহ্য করেছি আর না। কি ভেবেছো তুমি? আমি ভালোবাসবো ছিহ!ভাবতেও ঘেন্না হচ্ছে। চ্যারমেনের ছেলে, অর্থ বিত্ত ক্ষমতার জোরে অনেক মেয়েকেই পেতে পারো তবে এই রজনীকে নয়! আর যাই হোক কোনো চরিত্রহীন ছেলের সাথে আমার কথা বলেতেও ঘেন্না লাগে,ভালোবাসাতো দুর!’
সেদিন ওকে এই কথাসহ আরও বুহু অপমান করে বাড়ি ফিরে আসি বেজায় রাগ আর মন খারাপ নিয়ে। অবাকের বিষয় এই যে আমি ওকে এত্ত এত্ত অপমান করলাম, ও কিচ্ছুটি বলাতো দুর,আমার দিকে মাথা তুলে তাকাইনি অবধি! সেদিন গোটা এক বছরের বিরক্ত করা, আমায় উত্যক্ত করার ঝাল মিটিয়ে দেই। এরপর ও আর আমার সামনে আসে নি। কিছুদিন পর জানতে পারি ও নাকি গ্রাম থেকে চিরতরে চলে গিয়েছে। শুনে ঠিক কি রকম যে প্রশান্তি পেয়েছি তা বলার মতো না। কিন্ত এই গোটা ব্যাপার আপনাকে বলতে চেয়েও বলিনি যদি ভুল বোঝেন এই ভয়ে। আম্মুকেও জানাইনি। শুধু লিজা আর অদ্রি আপুকে জানিয়েছিলাম।
রজনীর পুরো কথাগুলো আয়ুশ শুনলো। পরপর শান্ত কন্ঠে বললো,” ভুল বুঝবো ভেবে , বকাঝকা করতাম বলে কিছুই বলিসনি তুই? নাহয় একটু বকতাম,তোর মাও বকতো কিন্তু ভুল কেনো বুঝতো? এতবড় ব্যাপার লুকিয়ে রেখেছিস তুই!”
রজনী কিঞ্চিত হাসলো,পরপর ধীর কন্ঠে ফের বলতে লাগলো,” জানেনতো?এসব ব্যাপারে মেয়েদেরকেই আগে দোষারোপ করা হয়। গ্রামের মানুষেরা তিল কে তাল বানাতে এক্সপার্ট। এই বিষয়ে চাইলেই আমি আইনি পদক্ষেপ নিতে পারতাম ঐযে ইজ্জতের ভয়ে , বাপ চাচাদের মান সম্মান হীনতার ভয়ে আর এগোইনি। এইযে এই সব ব্যাপারে মেয়েদেরকেই যে ভিক্টম বানানো হয় বিষয়টা প্রথমে আমি বুঝিনি যদি না সেদিন ছোটো কাকি আমায় অপমান না করতেন!
