নেপালের কাঠমান্ডুতে রাত্রি – দিন

নেপালের কাঠমান্ডুতে রাত্রি দিন

নেপালের প্রধান আকর্ষণ হিমালয় পর্বত। যারা নেপাল যায় তাদের সবার মন সেদিকে ছুটে। ২৩ মার্চ ২০১৫ খ্রিষ্টিয় সালে ঢাকা থেকে নির্ধারিত সময়ের ৫৫ মিনিট দেরিতে দুপুর ১ টা ৫৫ মিনিটে ছেড়ে ৩৪,০০০ ( চৌত্রিশ হাজার) ফুট উপর দিয়ে বাংলাদেশ বিমান প্রায় ২ ঘন্টায় বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের আকাশ পথে উড়াল দিয়ে ৩ টা ৫০ মিনিটের সময় নেপালের ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্টে নামে। আমি বিমান থেকে নেমে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু ‘র মাটিতে পা রাখি।

এয়ারপোর্টের ভিতরে ভাষাগত সমস্যার কারণে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। বাংলা ভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় কথা বলতে পারি না। আমি নেপালী ভাষা বুঝি না। তারা বাংলা ভাষা বুঝতে পারে না। উপায় ইংলিশ ভাষা। আমি অল্প কিছু জানা ইংলিশ ও হিন্দি মিলিয়ে শব্দ দিয়ে পোর্টের ভিতরের পোর্ট এন্ট্রি ইত্যাদি কাজ শেষ করি। এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে ট্যাক্সি নিয়ে চলে যাই Hotel Sky Lark. খোঁজ নিয়ে গেছি হোটেলটি বাঙালি – মুসলিম মালিকানাধীন। ধর্ম বিবেচনায় হালাল খাবার সকল বিদেশে সবখানে মিলে না। সাধারণ মানের এই হোটেলের অবস্থান Thamel, Kathmandu, Nepal.

- Advertisement -

হোটেলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। ঢাকা ও কাঠমান্ডুর আবহাওয়ার তারতম্য অনুভব করলাম। শীত শীত অনুভূতি। তাই হোটেল কামরায় বসে চা অর্ডার দিয়ে চা পান করলাম। আগেই প্রস্তুতি ছিলো, তাই শীতের কাপড় হিসেবে সাথে থাকা কাস্মীরী চাদর গায়ে জড়িয়ে দুতলা থেকে নিচে নামলাম। হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে ডানে বামে দেখে নিলাম। প্রতিটি দোকান ও আশেপাশের হোটেল ও রেস্টুরেন্টে বাতি জ্বলছে। ভাবলাম একটু কাছাকাছি হেঁটে আসি। হোটেলের বারান্দা থেকে নেমে দুই মিনিট হাঁটতে পারিনি। ঝমঝম করে বৃষ্টি এলো। অবাক কান্ড। কথা নেই কোনো বিজলি নেই হঠাৎ বৃষ্টি ! বাধ্য হয়ে হোটেলে ফিরে এলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে বৃষ্টি আরও জোরে ঝরতে লাগলো। বৃষ্টি আর থামে না। কিছু সময় হোটেলের রিসিপশন কক্ষে বসে টেলিভিশন দেখলাম। কিন্তু ; বিদ্যুৎ চলে গেছে। জেনারেটর চালু হলো। আলাপ করে জানলাম, তাদের ওখানে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি খুবই খারাপ। মনে পড়ে গেল, এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে রাস্তার পাশে প্রচুর সোলার প্যানেল দেখেছি। সেদিক থেকে আমরা বাংলাদেশে অনেক ভালো আছি মনে হলো।

রাতে অল্প টাকার স্বল্প খাবার খেয়ে আমার নির্ধারিত কক্ষে গিয়ে শুয়েছি। বাহিরে বৃষ্টি হচ্ছে এবং এদিকে শীতের তীব্রতাও বেড়েছে। আমি কম্বল দুই ভাঁজ করে গায়ে জড়িয়ে ঘুমিয়েছিলাম। হঠাৎ গুড়ুম গুড়ুম বিকট শব্দে ভয়ে জেগে উঠি। মুহূর্তে বুঝতে পারি, বজ্রপাত হচ্ছে। এভাবেই রাত কাটাই। সকালে নিচে নাস্তা করতে নেমে পরিচয় হয় বাংলাদেশের কয়েকজনের সঙ্গে। তারা আমাকে জানালো, তারা সবাই মিলে একটি গাড়ি নিয়ে হিমালয় পর্বত দেখতে যাবে, আমি চাইলে সমান সমান ভাগে নেপালী মুদ্রা দিয়ে তাদের সাথে অংশ নিতে পারি। আমি দেখলাম তাদের সাথে তিন চার বছরের ছোটো বাচ্চাও আছে। প্রথমে ইচ্ছে হয়েছিলো এবং এমন ইচ্ছে নিয়েই অনেকের মতো আমিও নেপাল এসেছি। আমি খোঁজ নিয়ে জানলাম, একেবারে হিমালয়ের কাছে যাওয়া হবে না। তখন, হঠাৎ আমি সিদ্ধান্ত পাল্টে ফেলি। মনে হলো, সবাই যা দেখে তার অনেক গল্প আমি শুনেছি এবং আরও শুনতে পারবো। আমি বরং ; কাঠমান্ডুতে ফুটপাত, নদী ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখবো। নেপালের মানুষ দেখবো।

হোটেলের ম্যানেজারের নিকট থেকে কিছু নির্দেশনা ও তথ্য নিয়ে আমি হোটেল থেকে বেরিয়ে দশ মিনিট হাঁটতে হাঁটতে দেখতে পেলাম থামেল এলাকায় আমাদের দেশের মতো তিন চাকার পায়ে চালানোর রিকশা আছে এবং অনেক রিকশা। এর মধ্যে পেয়ে গেলাম রাস্তার পাশে দাঁড়ানো কয়েকটি ট্যাক্সি। আমি একটি ট্যাক্সির কাছে দাঁড়াতেই ড্রাইভার হিন্দির মিশেলে নেপালী ভাষায় আমাকে কিছু একটা বললেন। কিন্তু ; আমি কিছুই বুঝিনি। আমি কিছুটা হিন্দির মতো করে বুঝাতে চাইলাম, আমি কাঠমান্ডুতে নদী ও বিশ্ববিদ্যালয় দেখবো। ড্রাইভার তখন পুরোদমে হিন্দিতে আমাকে বুঝালেন এবং ঘন্টা হিসেবে নেপালী মুদ্রা ঠিক করে ট্যাক্সিতে উঠে বসি।

প্রায় চার ঘন্টার কাঠমান্ডু শহর ভ্রমণে দেখেছি অনেক শৃঙ্খলা এবং অনেক বিশৃঙ্খলা। সংক্ষেপে বলছি। ট্যাক্সি চলছে কখনো ধীর গতিতে কখনো দ্রুত গতিতে। ঘুরেছি Balkhu এলাকা, Tekupachali এলাকা, Kirtipur ইত্যাদি। ড্রাইভার সাহেব বিনয়ী। তার কাছে জানতে চাইলাম, তিনি সিনেমা দেখেন কি-না। সাথে সাথে তার মুখ থেকে মনীষা কৈরালা নামটি শুনলাম। মনীষা কৈরালা নেপালের, কিন্তু ; হিন্দি সিনেমার সুপার হিট অভিনেত্রী।

Tekupachali এলাকা হয়ে আমি যাই Bagmati River দেখতে। নদীটি দেখে আমার মন খারাপ হয়েছে। নদীর তীর ঘেষে রাস্তা ধরে যতোদূর গেছি, নদীতে পানি নেই। আমি ড্রাইভার থেকে জানতে পারলাম, যখন হিমালয় থেকে পানির প্রবাহ নেমে আসে তখন কয়েক ঘন্টা নদী ভরে পানি চলতে থাকে। সবখানেই নদী আমার প্রিয় একটা জায়গা। কারণ, নদী চলতে থাকে নদীতে জীবন থাকে। হ্যাঁ, আমি কাঠমান্ডুতে দেখেছি নদী Bagmati.

এরপর দেখেছি Tribhuvan University ‘র চমৎকার পরিবেশ। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় রয়েছে সবুজ গাছের সারি। কোথাও বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেয়াল জুড়ে পোস্টার সাটানো চোখে পড়েনি। মনে পড়ে যায়, আমাদের সিলেটের এমসি কলেজের দৃষ্টিনন্দন গেইট-তো দেখা-ই যায় না বিভিন্ন সংগঠনের ও নেতার ছবি সম্বলিত কাগজের পোস্টার ও কাপড়ের ব্যানারে ঢাকা থাকে।

কাঠমান্ডুতে দেখেছি College of education, Kirtipur, Kathmandu,  Nepal. Founded 1956.

আমি পত্রিকায় মাঝে মাঝে সিলেট, সুনামগঞ্জ এবং বাংলাদেশের রাস্তা, ফুটপাত ইত্যাদিতে অব্যবস্থাপনা নিয়ে উপসম্পাদকীয় কলামে লিখি। ফুটপাতে পায়ে হেঁটে নির্বিঘ্নে চলাচল করা সিলেট, চট্টগ্রাম ও ঢাকার মানুষের পক্ষে সম্ভব হয় না। বাংলাদেশের এতো উন্নয়ন হচ্ছে, কিন্তু ; ফুটপাতে শৃঙ্খলা এলো না। আমি নেপালের কাঠমান্ডুতে যেটুকু দেখেছি, ফুটপাত দিয়ে মানুষ নির্বিঘ্নে হেঁটে চলতে পারে। দেখতে পেলাম, ট্রাফিক পুলিশের নির্দেশ মেনে নিয়ে অনেকগুলো মটর সাইকেল দাঁড়িয়ে রইলো। কেউ ওভারটেক করে যাচ্ছে না।

বাংলাদেশ ধনী দেশ:

আমার ভাড়া করা গাড়ির ড্রাইভার এবং কোনো কোনো দোকান থেকে হালকা খাবার কিনতে গিয়ে দুই জনের সাথে আলাপ করে জানলাম, বাংলাদেশকে তারা ধনী দেশ হিসেবে জানে। তবে তারা খাদ্য ও অনেক কিছুর জন্যে পার্শ্ববর্তী ভারতের উপর নির্ভরশীল। প্রকৃতপক্ষে, পর্যটন খাত থেকে নেপাল যথেষ্ট আয় করে।

আমি মাত্র দুটো দিন নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে খুব সামান্য দেখতে পেরেছি। দেখেছি সাত বছর আগে ২০১৫ খ্রিষ্টিয় সালে, এখন খ্রিষ্টিয় সালের ক্যালেন্ডার অনেক এগিয়ে এসেছে ২০১৫ খ্রীষ্টিয় সালের সেই মার্চ মাসের ক্যালেন্ডারকে পিছনে রেখে। তখন কোনো কিছু লিখে রাখা হয়নি। তাই, অনেক জায়গার নাম এবং ট্যাক্সি ড্রাইভারের নাম মনে নেই। স্মৃতি থেকে অল্প উপস্থাপন করলাম। ভ্রমণ শুধু চোখের দেখা-ই নয়, ভ্রমণে বহু শেখা-ও হয়।

আমরা সিলেটের মানুষ জানি, নেপালের অনেক শিক্ষার্থী জালালাবাদ রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা করেন। ওই কলেজে গেলে দেখতে পাওয়া যায়। জালালাবাদ রাগীব – রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসা নিতে গেলে কিছু নেপালী ইন্টার্নি চিকিৎসকের দেখা-ও পাওয়া যায়। ডাক্তারি পড়াশোনা ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে এ বিষয়টি আন্তর্জাতিক ভাবে আমাদের জন্যে ইতিবাচক।

কাঠমান্ডু ভ্রমণ ছিলো আমার তৃতীয় কোনো বিদেশ দেখা। এর আগে ২০১৪ খ্রিষ্টিয় সালে আমাদের স্কুল পড়ুয়া ছোটো ছোটো দুই ছেলেকে দেশে রেখে-ই, দুর্ভাগ্যজনক ভাবে থাইল্যান্ডের ব্যাংকক ও ভারতের কলকাতা শহরে গেছি। ২০১৪ খ্রীষ্টিয় সালে ব্যাংকক ও কলকাতা যাওয়া আমার জন্যে দুর্ভাগ্যজনক এজন্যে-ই যে, ব্যাংকক ও কলকাতা গিয়েছিলাম সস্ত্রীক আমাদের ৭ বছর বয়সী অসুস্থ ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে চিকিৎসার জন্যে। শেষে ওই বছর-ই ঢাকার বিএসএমএমইউ-তে চিকিৎসা চলাকালীন মেয়েটি এই ভিষিথ ছেড়ে চলে গেছে। মেয়েটিকে নিয়ে প্রথম দিকে জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা করিয়েছি। এখানকার একজন শিশু ডাক্তার খুব-ই আন্তরিক সেবা দিয়েছেন। মেয়েটি নিষ্পাপ শিশু ছিলো। আল্লাহ তাকে জান্নাতবাসী করুন। এরপর আমি ডিপ্রেশনে ভুগতে থাকি। ডিপ্রেশনের আরেক কারণ আছে। এর আগে ২০১০ সালে বাংলাদেশের শেয়ার মার্কেটে বড়ো ধ্বসের সময় আমার সম্পূর্ণ বিনিয়োগ ক্ষতি হওয়ায় আমি রীতিমতো টাকাহীন মানুষ হিসেবে দিশাহারা অবস্থার সম্মুখীন হই। সেই হতাশা ও ক্ষত তখন-ও কাটিয়ে উঠতে পারিনি। ঘুরে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি চলছিলো। তখন-ই মেয়ের অসুস্থতা। আমার ওই দুঃসময়ে অনেক মহৎপ্রাণ বন্ধু ও স্বজনের দেখা পেয়েছি। ওইসব মহৎপ্রাণ মানুষের মহৎকর্ম সবসময় মনেকরি এবং তাদের উদারতার প্রতি শ্রদ্ধা। অনুদার মানুষ-ও-তো সমাজে আছে। দেখবেন, আপনার কঠিন দুঃসময়ে-ও আপনার পাওনা ছাড়ে না। বরং ; বিদ্রুপাত্মক কথা ওদের কাছ থেকে তখনও শোনা যায়। কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার বলেন, “কী যাতনা বিষে বুঝিবে সে কিসে / কভূ আশী বিষে দংশেনি যারে”। আমি ধর্মের পথে ভাগ্যকে বিশ্বাস করি এবং এমন বিড়ম্বিত ভাগ্য যেনো আর কারো না-হয়। সকলে সয্য করতে পারবে না। এরপর কবিতায় লিখি –

“ডাক্তার হোমিও অ্যালোপ্যাথি

টাকার হয় অপচয়

ওষুধে কাজ হয় না

বাঁচে না সুখ বাঁচে না জীবন।”

এরপর, আমার ডিপ্রেশন কাটিয়ে উঠতে আমার বোন রাঙাআপা আমাকে নেপাল ভ্রমণ করানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সেই ভ্রমণ ছিলো নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে। ডিপ্রেশন নানান কারণে তারপরও আমাদের ছাড়ে না। প্রসঙ্গ ক্রমে একান্ত নিজের দুঃখের কথা চলে এলো। আমাদের জীবনের সুখের ছবি-ও-যে একেবারে নেই তা-নয়। পাশের বায্যিক দেখা  মানুষগুলো যে কতো রকম সুখ ও যাতনা নিয়ে এই পৃথিবীর পথে ভ্রমণ করে, আমরা বুঝতে পারি না। হ্যাঁ, জীবন সংগ্রাম বলে কথা। তবে একেক মানুষ একেক রকম সংগ্রাম করে।

নেপাল যাওয়া ও আসা পথে দেখেছি ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্ট। হ্যাঁ, ২০১৫ খ্রীষ্টিয় সালে আমার দেখা Tribhuvan International Airport খুব বেশি পরিচ্ছন্ন ছিলো না। ভিতরে বিভিন্ন ডেস্কে বিশৃঙ্খল অবস্থা দেখেছি। নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলায় আমাদের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, সিলেট অনেক এগিয়ে রয়েছে। আমরা যদি পৃথিবীর বিশেষ কয়েকটি ধনী দেশকে বাদ দিয়ে চিন্তা করি, তাহলে বলতে পারি অনেক অনেক দেশের চেয়ে ধান, সবজি, মাছ, চা, গ্যাস ইত্যাদি ক্ষেত্রে আমাদের মাটি ও পানি আমাদের জন্যে সৌভাগ্যের। আমাদের বড়ো বেশি প্রয়োজন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিচারকার্য এবং সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সততা ও শৃঙ্খলা।।

- Advertisement -

Read More

Recent