
আচ্ছা,মনে করুন,আপনাকে জীবনের মধ্য বয়সে এসে পৌছানোর পর কোনো এক রাতে আপনার চাওয়া-পাওয়া,পেয়ে হারানোর হিসেব নিকেশ আর সেখানে আপনার ভূমিকা কী ছিল,কী ই বা করতে পারতেন,একদম মুভির স্লাইড শো এর মতো দেখিয়ে দেওয়া হয়?
আমরা সবাই ই ভেবে নেই,যা করেছি,ঠিক করেছি,বা ভুল হলেও ভাগ্যের দোষ! তাই না?
পাশের মানুষটাকে তার সঠিক মূল্যটা দিচ্ছি তো?
ভালোবাসার মানুষদের নিজের আচরণে আঘাত করে বসছি না তো?
জটিল লাগছে কথাগুলো?
লাগবে না,উৎসব দেখুন সিনেমা হলে গিয়ে।
এ বছর সব ছবি ই ক্রাইম থ্রিলার বা একশ্যন ঘরানার সিনেমা। এর মধ্যে যেন এক পশলা বৃষ্টি এই ছবিটা।
চার্লস ডিকেন্সের A Cristmas Carol অবলম্বনে এক অনবদ্য সৃষ্টি আমাদের দেশের ছবি উৎসব।
জাহাঙ্গীর, যার স্বভাবের কারণে সবাই তাকে গালমন্দ করে,মধ্য বয়সে এসে একাকী জীবন যাপন করে যাচ্ছেন। কেন?
কেন ই এত হাড়কিপ্টে তিনি? কেন নিজের কাছের সব মানুষের কাছ থেকে দূরে সরে থাকেন?
ঈদের মতো একটা উৎসব ও কেন উৎসবের মতো নয় তার কাছে?
এভাবে কি চলতে দেওয়া যায়?
একদম না।
হাজির হয় তিন ভূত!
তারা কি বদলে দিতে পারে আপাত দৃষ্টিতে অদ্ভুত এই মানুষটাকে? কিংবা তার জীবনকে?
জীবন কী? আসল সত্য কী? বেঁচে থাকা কী? তা কি তিনি বুঝতে পারেন?
এ নিয়েই ছবি।
আমি সাধুবাদ জানাই তানিম নূর,পরিচালককে। এই ধুমধাড়াক্কার যুগে এমন ছবি বানানোর আর সেটা ওটিটিতে রিলিজ না দিয়ে বড় পর্দাতেই আনার সাহস করবার জন্যে। পুরো গল্পটাকে যেভাবে আমাদের দেশের আঙ্গিকে বুনেছেন,যথার্থ।
গল্প বোনায় ছিলেন তানিম নূর,আয়মান আসিব স্বাধীন,সুস্ময় সরকার এবং সামিউল ভূইয়া।
আর অসম্ভব মজার সব সংলাপ লিখেছেন স্বাধীন এবং সামিউল। মানুষকে জোর করে কাতুকুতু দিয়ে হাসানো নয়,একদম ডায়ালগের কারণে হুট করে খিলখিল হাসিতে মেতে ওঠার মতো সংলাপ।
সিনেমাটোগ্রাফিতে ছিলেন রাশেদ জামান, আয়নাবাজির জন্যে উনি জাতীয় পুরষ্কার পেয়েছেন।
এবার আসি অভিনয়ে…
এত গূণী সব অভিনেতা একসাথে,শেষ কবে দেখেছেন,বলুন তো?
মূল চরিত্রে জাহিদ হাসান। অনেকদিন পর দেখলাম ওনাকে। আর বুঝলাম কী মিস করেছি এতদিন আমরা! হাড়কিপ্টে রগচটা সবাইকে খোঁচা দিয়ে কথা বলা জাহাঙ্গীর চরিত্রে অসাধারণ তিনি।
আছেন Chanchal Chowdhury চঞ্চল চৌধুরী,কমিক টাইমিং,এক্সপ্রেশন চেঞ্জ-জাহিদ হাসানের সাথে দ্বৈরথ! স্লাইড শো এর শুরু তার হাতেই।
জয়া আহসান,নিজেকে নিয়ে হাসা সহজ নয়। বার বার করেছেন ডায়ালগ দিয়ে,বডি লেংগুয়েজে। আসলেই তো,বয়স কেন বাড়ে না ওনার! নিজেই বলেছেন। থাক,না বাড়ুক।
অপি করিম,প্রিয় অভিনেত্রী। কাজে অনিয়মিত,আমাদের স্মৃতিতে নন। ঠিক ই চিনে ফেলবে সবাই। নিয়মিত থাকুন প্লিজ,অনেক মিস করি।
তারেক আনাম খান,যত দেখি মুগ্ধ হই। এত বছর ধরে মান ধরে রাখা,আহা!
আফসানা মিমি,মাঝে নিঁখোজ নামের ওয়েব সিরিজে দেখেছিলাম। আবারো দেখলাম কাল। দেখে মনে হচ্ছিল,আপনি কোথাও কেউ নেই এর সেই দুই বেণী দোলানো কিশোরী ই রয়ে গেছেন স্নিগ্ধতায়,আর আমরা আপনার অভিনয়ের মাঝে মুগ্ধতায়। শেষ অংশে সত্য জানানোর জায়গাটুকুতে অসাধারণ।
ভাগ্নে জয় চরিত্রে শৈশব আর বড় হবার পর যিনি অভিনয় করেছেন,খুব ভালো লেগেছে।
এবার আসি,সাদিয়া আয়মান, সৌম্য জ্যোতির অভিনয়ে। আমার কাছে সবচেয়ে বড় সারপ্রাইজ এই দুইজনের অভিনয়। না,একক অর্থে নয়। আমি ওনাদের কাজ আগেই দেখেছি,সাদিয়ার বোহেমিয়ান ঘোড়াতেও কাজ খুব ভালো ছিল,আর সৌম্যের কাজ আমি কাইজারে, ইন্টার্নশিপে দেখেছি।
কিন্তু এখানে জুটি হিসেবে ওনাদের টাইমিং,এক্সপ্রেশনের পালাবদল,প্রথম প্রেমের রোমাঞ্চ বলুন,আর তিক্ততার সময়! বিশেষ করে ঝগড়ার দৃশ্যগুলোতে অনবদ্য ছিলেন তারা।
তুমি গানটা লেভেল ফাইভ ব্যান্ডের। নব্বই দশকের চিত্রায়ণে যথাযথ।
আর শাহরুখের পাগলা ফ্যান হবার কারণে তাকে দেওয়া হোমেজটাও ভালোবাসার কিছু,আমার জন্যে। ধন্যবাদ।
সেই ভিসিআর,ভিডিও ক্যাসেট,পুরোনো আমলের টেলিভিশন,সেই ৯০ দশকের আমরা।
আমি গিয়েছিলাম ১৭ বছরের আমার কন্যাকে নিয়ে। ভেবেছিলাম ওর কি ভালো লাগবে? ও কি সবাইকে চিনতে পারবে,যারা কাজে অনিয়মিত তাঁদের?
সিনেমার শেষ অংশে যখন আমি কাঁদছি,দেখি মেয়ে আমার হাত ধরলো,চোখে পানি ওর।
কাছের মানুষের জন্য আবেগ আসলে ৯০ তে আটকে থাকে না,এরা জেনারেশন কী যেন? ওরাও অনুভব করে।
শুধু অনুভব করাতে জানতে হয়।
অভিনন্দন,উৎসবকে আমাদের উৎসবে নিয়ে এসে উৎসব রাঙিয়ে তোলার জন্যে।
