কার্নি বনাম ট্রাম্প: বাণিজ্য যুদ্ধের দ্বৈরথে উত্তপ্ত কানাডা-আমেরিকা সম্পর্ক

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি

উত্তর আমেরিকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে এখন সবচেয়ে আলোচিত ইস্যু হল কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বাণিজ্য যুদ্ধ। এই দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন দুই দেশের নেতা কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দুইজনের আদর্শিক অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত একদিকে কার্নির পরিবেশবান্ধব, বহুপাক্ষিক ও মানবিক বাণিজ্যনীতি, অন্যদিকে ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ ঘরোয়া শিল্প-কেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদী কৌশল।

এই মতবিরোধের সরাসরি প্রভাব পড়ছে দুই দেশের দীর্ঘস্থায়ী বাণিজ্য সম্পর্কে।

- Advertisement -

গত মাসে হোয়াইট হাউস এক তরফাভাবে কানাডা থেকে আমদানি হওয়া ইলেকট্রিক যান, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিপণ্য, দুগ্ধজাত দ্রব্য ও কৃষিপণ্যসহ বেশ কয়েকটি পণ্যে ২০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করে। সবচেয়ে বেশি ধাক্কা খেয়েছে অ্যালুমিনিয়াম ও স্টিল শিল্প, যেখানে শুল্ক বাড়ানো হয়েছে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত। যুক্তরাষ্ট্রের যুক্তি, এই পদক্ষেপ ঘরোয়া শিল্প ও শ্রমিকদের সুরক্ষার জন্য জরুরি।

ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, “আমেরিকার বাজার এখন কেবল আমেরিকানদের জন্য।”

কানাডা চুপ করে বসে থাকেনি। প্রধানমন্ত্রী কার্নির নেতৃত্বে দেশটি প্রতিশোধমূলক শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা গম, দুগ্ধজাত পণ্য ও মেশিনারিজে যার হার ২৫ শতাংশ পর্যন্ত। একইসঙ্গে বিষয়টি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা -তে আনুষ্ঠানিকভাবে চ্যালেঞ্জ করেছে কানাডা।

পরিস্থিতি সামাল দিতে কানাডা এখন বিকল্প বাণিজ্য জোট খোঁজার চেষ্টা করছে। মারকোসারএবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরালোভাবে চলছে।

উদ্ভূত এই বাণিজ্য দ্বন্দ্বে ইতোমধ্যে অর্থনৈতিক চাপ স্পষ্ট। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত শুধু শুল্ক বৃদ্ধির কারণে কানাডার আমদানি ব্যয় গড়ে ১৪.৩ শতাংশ বেড়েছে। তবে এক মাস আগের তুলনায় ট্রেড ডেফিসিট কিছুটা কমে এখন C$5.9 বিলিয়নে দাঁড়ালেও সংকট কাটেনি।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে জুন মাসে ২.৭ শতাংশে পৌঁছেছে। ইয়েল বাজেট ল্যাব এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, নতুন শুল্ক নীতির ফলে গড়ে একটি মার্কিন পরিবারকে বছরে অতিরিক্ত ২৮০০ ডলার খরচ বহন করতে হবে এবং জাতীয় জিডিপিতে অন্তত ০.৯ শতাংশ পয়েন্ট হ্রাস ঘটবে।

সবচেয়ে বেশি বিপদে রয়েছে অটোমোবাইল শিল্প। কানাডার টরন্টো ও উইন্ডসরে অবস্থিত মার্কিন বাজারনির্ভর কারখানাগুলোর উৎপাদন কমে যাচ্ছে। কর্মী ছাঁটাই এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। ট্রেড ইউনিয়ন ও শিল্পমালিকরা উভয়েই সরকারের কাছে দ্রুত ও কার্যকর সমাধানের দাবি জানাচ্ছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং এটি দুই নেতার দর্শনগত সংঘর্ষের বহিঃপ্রকাশ। মার্ক কার্নি যেখানে সবুজ প্রযুক্তি, জলবায়ু সচেতনতা এবং বৈশ্বিক অংশীদারিত্বে বিশ্বাসী, ট্রাম্প সেখানে নিজস্ব বাজার ও ভূরাজনৈতিক আধিপত্য সুরক্ষায় আগ্রাসী অবস্থান নিয়েছেন।

বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের আলোচনা চললেও কোন পক্ষ কতটা ছাড় দেবে, তা স্পষ্ট নয়। কার্নির সরকার যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বহুমুখী রপ্তানির দিকে যেতে চাইছে, আর ট্রাম্প শুল্কের মাধ্যমে আমেরিকার বাজারকে ‘নিরাপদ’ রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

এই সংঘাত ইতোমধ্যে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে ব্যাঘাত ঘটিয়েছে। মুদ্রা বাজার, শেয়ারবাজার এবং বহুজাতিক কোম্পানিগুলো রয়েছে অনিশ্চয়তার মধ্যে। প্রশ্ন এখন একটাই এই দ্বন্দ্ব কি শেষ পর্যন্ত সমঝোতায় পৌঁছাবে, নাকি তা আরও বিস্তৃত হয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করে তুলবে?

কারণ, এই লড়াইয়ে কেবল দুই দেশের নয় বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি শ্রমিক, বিনিয়োগকারী ও ভোক্তার ভাগ্য নির্ভর করছে।

- Advertisement -

Read More

Recent