শিরিনের কণ্ঠে গান

বেশ ক’বছর আগে টরন্টোর আবৃত্তির সংগঠন ‘অন্যস্বর’ আয়োজিত ‘দ্রোহ এনেছে বিজয়’ শিরোনামের অনুষ্ঠানে শিরিন চৌধুরীর একটি গান শুনে চমকে ওঠেছিলাম। একটি গান শুরু হওয়ার আগেও যে শুরুর বন্দনা থাকে, সেটা নির্মল, খাঁটি, কোমল ও মাটিলগ্ন গন্ধমাখা। এখনো আমার কানে বাজে – মনপ্রাণ উজাড় করে শিরিনের কণ্ঠ থেকে গান নয়, যেন পুরো দেশের জন্য একটি মানুষ তার হৃদয়ের সকল খিড়কি খুলে সমস্থ অন্তর ঢেলে আকুলভাবে সেই কথাগুলো মিজান ফার্ণিচারের ছোট্ট কক্ষ থেকে আকাশে বাতাসে উড়িয়ে দিচ্ছেন। কতবার, কতজনের কণ্ঠে এই গান শুনেছি! কিন্তু, ‘দ্রোহ এনেছে বিজয়ের অনুষ্ঠানে শিরিনের আবেগ, দরদ ও উদাত্তকণ্ঠ গানটি অন্যমাত্রায় নিয়ে গিয়েছিল আমার কানে। শিরিন অসাধারণ হারমোনিয়াম বাজিয়ে – ও ভাই, খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি….গাইলো।

- Advertisement -

শিরিনের একটিমাত্র গান, বিদ্যুৎ ঝলকানির মতো আমাকে নিয়ে গেল আমার সোনার বাংলাদেশে। ঐ তো শোনা যায়, শীতের শিশির ভেজা সকালে কলেজের শহীদ মিনার প্রাঙ্গন থেকে ভেসে আসছে দেশাত্মবোধক গান – মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি/ সালাম সালাম হাজার সালাম লাখো শহীদ স্মরণে / জয় বাংলা বাংলার জয় / ও আমার আটকোটি ফুল দেখো গো মালি, শক্ত হাতে বাইন্দো মালি লোহার জালি / জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো / কত কত গান, মাত্র একটি মুহূর্তকণায় আমার ভেতরে দৌড়ে এসে ঝাপটিয়ে ধরলো। অথচ, আমি শুনছি শিরিনের কণ্ঠে – এই দেশেরই ধুলায় পড়ি

মানিক যায় রে গড়াগড়ি

বিশ্বে সভার ঘুম ভাঙালো

এই দেশেরই জিয়নকাঠি

আমার দেশের মাটি

 

কত জায়গায় কতভাবে কতদিন, বছর এই একই গান শুনেছি। কিন্তু ঐ মুহূর্তে শিরিন আমার কানে গানের বাণীবদ্ধ সুর কিংবা চিত্রভাষ্য ছাড়িয়ে জীবনের যে নির্মল, নিষ্পাপ চঞ্চল আবেগের ফেলে আসা সময়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। ঐ বাঁশের চূড়ায় তিনদিকে মুখ করে তিনটি মাইকে আমার দেশের মাটির খাঁটি গন্ধটুকুও যে ভেসে যেত গানের সাথে সাথে, সেই সন্ধ্যায় এখানেও আমার কানে তার সৌরভ এসে সুরভিত করে দিয়েছে। শিরিন দীর্ঘ বছর থেকে এই শহরে নানান ধরনের গান গেয়ে খুব পরিচিত ও জনপ্রিয় শিল্পী। বিশেষ করে শিরিনের কণ্ঠে লালনগীতি তো অপূর্ব সুন্দর। শাহ আব্দুল করিমের গান গেয়েও শিরিন শ্রোতাদের মন জয় করেছেন৷

শিরিনের কণ্ঠস্বরটি সত্যিই মিষ্টি। তার কণ্ঠশক্তিও অসাধারণ। ওঁর কণ্ঠে ঝর্নার মতো এমন তরঙ্গময় সুমিষ্ট প্রবহমানতা আছে যে, প্রায়শই এক বিখ্যাত শিল্পীর কণ্ঠের সঙ্গে তার সাযুজ্য পেয়ে আমরা আপ্লুত হয়ে উটি৷ শিরিনের অবশ্যই আলাদা একটি শিল্পী সত্তা আছে, এবং এটি একান্তই শিরিন চৌধুরী নামের শিল্পীর। কত ভক্ত, কত প্রিয়জন শিরিনকে একক গানের অনুষ্ঠান করার জন্য অনুরোধ করেছিলেন, প্রেরণা দিচ্ছিলেন৷ বহু বছর পর শিরিন সত্যি সত্যি একক গানের অনুষ্ঠানের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছেন। শুধু তাই নয়, শিরিন তার সন্তান সুষ্ময় চৌধুরীকেও মায়ের সঙ্গে দ্বৈত গানের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে আসছেন। একটি মাত্র দুই ঘন্টার আয়োজন! কত যে কষ্ট করেন প্রবাসের শিল্পীরা, ভাবলে অবাক হয়ে যাই। খুব কাছে থেকে শিরিনের যুদ্ধটা দেখছি। আসলে প্রত্যেক শিল্পীরই পরিশ্রমটা হয়তো এরকমই।

আমি দৃঢ়ভাবে আশাবাদী এতো এতো পরিশ্রম, সাধনা, রেওয়াজ সবই সার্থক হবে পনেরই নভেম্বর রাতে। কেননা, রুপতনু শর্মা, রাজিব, আবির শিরিনের গানে সঙ্গত করবেন। অতএব, এই আসর সুরের মৌতাতে ভরে উঠবেই। আহমেদ হোসেন, মানবী মৃধা কথার মালা দিয়ে শ্রোতাদর্শকদের সাথে শিরিনের গানের ফাঁকে ফাঁকে আসরের আনন্দ ভাগ করে দেবেন। আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে আছি শিরিনের গান শুনবো। মনমাতানো গান।

অনেক শুভকামনা শিরিন।

 

টরন্টো

- Advertisement -

Read More

Recent