অক্সিকোটিন পিল যেভাবে ছড়িয়েছে

অক্সিকোটিন বাজারজাত করার জন্য পারডিউ ফার্মা এবং তাদের বিপণন সহযোগীরা নেয় আগ্রাসী ও পরিকল্পিত প্রচারণা

১৯৯৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধবাজারে প্রথম যখন অক্সিকোটিন আসে, তখন সেটিকে উপস্থাপন করা হয়েছিল এক ধরনের যুগান্তকারী আবিষ্কার হিসেবে। শক্তিশালী ব্যথানাশক হয়েও এটি নাকি আসক্তি তৈরি করে না এমন দাবিই ছিল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান পারডিউ ফার্মার মূল বিক্রয়কৌশল। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জনস্বাস্থ্যের ইতিহাসে এই দাবি পরে যে কতটা ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনবে, তা তখন কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।

অক্সিকোটিন বাজারজাত করার জন্য পারডিউ ফার্মা এবং তাদের বিপণন সহযোগীরা নেয় আগ্রাসী ও পরিকল্পিত প্রচারণা। চিকিৎসক, হাসপাতাল ও ফার্মেসিগুলোকে বোঝানো হয় যেকোনো ধরনের ব্যথার চিকিৎসায় এই ওষুধ নিরাপদ এবং কার্যকর। ব্যথা ব্যবস্থাপনায় অক্সিকোটিনকে প্রায় “ম্যাজিক ড্রাগ” হিসেবে তুলে ধরা হয়।

- Advertisement -

এই প্রচারণার অংশ হিসেবে প্রশিক্ষণ সেমিনার, স্পন্সরড সম্মেলন এবং সরাসরি চিকিৎসকদের কাছে প্রতিনিধিদের পাঠানো হয়। মূল বার্তাটি ছিল একটাই “আমরা এমন একটি নতুন নারকোটিক পেয়েছি, যা আসক্তিমূলক নয়।” ইতালিয়ান নির্মাতা ফ্রান্সেস্কো পাপাটোনিওর ডকুমেন্টারি সিনেমায় সেই সময়ের এই মনোভাবকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

কিন্তু বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ব্যবস্থাপত্রে অক্সিকোটিনের ব্যবহার বাড়তে থাকতেই দ্রুত স্পষ্ট হয়ে ওঠে এর ভয়ংকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। অল্প সময়ের মধ্যেই বহু রোগী এই ওষুধের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। ১৯৯৯ সালের দিকে অক্সিকোটিন শুধু হাসপাতাল বা ফার্মেসিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি ঢুকে পড়ে অবৈধ মাদকবাজারেও।

সেই সময় থেকেই অক্সিকোটিন বিক্রি শুরু করেন ড্রাগ ডিলার আলেক্স ডিম্যাট্টিও। পরে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “দুই সপ্তাহের মধ্যেই একজন মানুষ অক্সিকোনে আসক্ত হয়ে পড়ে। এটা ছিল নিশ্চিত।”

তার মতো আরও অনেক সাবেক মাদক কারবারী জানান, অক্সিকোটিন সংগ্রহ করা ছিল অস্বাভাবিক রকম সহজ। বৈধ চিকিৎসা ব্যবস্থাই যেন অবৈধ ব্যবসার দরজা খুলে দিয়েছিল।

তাদের বর্ণনা অনুযায়ী, একটি সংগঠিত পদ্ধতিতে কাজ চলত। ডিলাররা একদল মানুষকে নিয়ে যেতেন ক্লিনিক বা চিকিৎসকের চেম্বারে। এই দলে থাকত অপরিচিত মানুষ, আত্মীয়স্বজন, এমনকি রাস্তা থেকে পাওয়া লোকজনও। সবাই একই ধরনের ব্যথার কথা বলত। চিকিৎসকরা প্রায় কোনো প্রশ্ন ছাড়াই প্রত্যেকের জন্য আলাদা আলাদা ব্যবস্থাপত্র লিখে দিতেন।

এরপর সেই দলকে একটি ভ্যানে তুলে নিয়ে যাওয়া হতো ফার্মেসিতে। সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ অক্সিকোটিন সংগ্রহ করা হতো একেবারে আইনসম্মত উপায়ে। পরে সেই ওষুধই চলে যেত অবৈধ বাজারে।

ডিম্যাট্টিও সেই সময়ের কথা স্মরণ করে বলেন, “এটা ছিল একেবারে পাগলামি। কোনো কোনো চিকিৎসক একেকজন রোগীর জন্য ৫০০ বা ৬০০ পিল লিখে দিতেন। আমার মনে হয়, মৃত্যু পথযাত্রী ক্যানসার রোগীর ক্ষেত্রেও ১০টি পিল যথেষ্ট হওয়ার কথা।”

এই লাগামছাড়া ব্যবস্থাপত্রই শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে ঠেলে দেয় এক ভয়াবহ ওপিওয়েড সংকটে। লক্ষ লক্ষ মানুষ আসক্ত হয়ে পড়েন, হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে ওভারডোজে। পরে পারডিউ ফার্মার বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা হয়, প্রশ্ন ওঠে ওষুধ কোম্পানির নৈতিকতা ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতা নিয়ে।

একসময় যে অক্সিকোটিনকে বলা হয়েছিল “আশ্চর্য ওষুধ”, আজ সেটিই ইতিহাসে পরিচিত এক ভয়াবহ স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের প্রতীক হিসেবে।

This article was written by Rezaul Haque as part of the LJI

- Advertisement -

Read More

Recent