
কানাডায় গুরুতর অপরাধে জড়িত নন-সিটিজেনদের শরনার্থী মর্যাদা প্রাপ্তি নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। মঙ্গলবার হাউজ অব কমন্সে কনজার্ভেটিভ পার্টি একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেছে, যেখানে গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত বা জড়িত বিদেশি নাগরিকদের শরনার্থী মর্যাদা চাওয়ার সুযোগ সীমিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। এমনকি যেসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা আদালতে বিচারাধীন রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রেও আশ্রয় আবেদন প্রক্রিয়া প্রতিহত করার দাবি জানানো হয়েছে।
সম্প্রতি কানাডার কিছু প্রদেশ, বিশেষ করে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায়, চাঁদাবাজি সংক্রান্ত অপরাধের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এই প্রস্তাব সামনে আসে। ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের লক্ষ্য করে সংগঠিত অপরাধচক্রের হুমকি ও অর্থ আদায়ের অভিযোগ বেড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার প্রিমিয়ার ডেভি ইবি। তিনি অটোয়ার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, বিদ্যমান আইনের যেসব ফাঁকফোকর অপরাধীদের আশ্রয় প্রার্থনার সুযোগ দিচ্ছে, তা বন্ধ করতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হোক।
কনজার্ভেটিভ দলের ইমিগ্রেশন সমালোচক মিশেল রেম্পেল গার্নার হাউজ অব কমন্সে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেন, “যেসব ছোট ব্যবসায়ী ন্যাক্কারজনক হুমকি পাচ্ছেন, তারা তাদের উপার্জন ও নিরাপত্তার সুরক্ষা দাবি করছেন।” তার দাবি, চাঁদাবাজির ‘মহামারি’র জন্য দায়ী সন্দেহভাজনদের বহিষ্কারের প্রক্রিয়া আইনি জটিলতায় আটকে আছে।
ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার এক্সটরশন টাস্ক ফোর্স একাধিক বিদেশি নাগরিককে চিহ্নিত করেছে, যাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সি তদন্ত শুরু করতে গিয়ে জানতে পারে, সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ইতোমধ্যে শরনার্থীর মর্যাদা পেয়েছেন বা তাদের আবেদন প্রক্রিয়াধীন। এর ফলে অন্তত ১৪ জন সন্দেহভাজনের বহিষ্কার প্রক্রিয়া স্থগিত রয়েছে, যতক্ষণ না অভিবাসন কর্মকর্তারা তাদের আশ্রয়দানের বৈধতা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন।
বর্তমান কানাডীয় অভিবাসন আইনে গুরুতর অপরাধে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের শরনার্থী মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করার বিধান রয়েছে। তবে অভিযোগের পর্যায়ে থাকা বা বিচারাধীন মামলার ক্ষেত্রে বিষয়টি তুলনামূলক জটিল। আইনি প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রেই বহিষ্কার কার্যকর করা যায় না, যা সময়সাপেক্ষ।
প্রস্তাবিত পরিবর্তনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোর আইন বিভাগের অধ্যাপক অড্রে ম্যাকলিন বলেন, বিদ্যমান আইনেই গুরুতর অপরাধে দোষী ব্যক্তিদের শরনার্থী মর্যাদা না দেওয়ার বিধান রয়েছে। তার মতে, নতুন প্রস্তাবটি প্রকৃত সমস্যার সমাধান নয়; বরং এটি কঠোর রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা।
তিনি ইঙ্গিত করেন, আদালতে বিচারাধীন মামলার ক্ষেত্রে আগাম সিদ্ধান্ত নিয়ে আশ্রয় আবেদন বাতিল করা হলে তা সাংবিধানিক ও মানবাধিকার সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। কানাডা আন্তর্জাতিক শরণার্থী সুরক্ষা কাঠামোর অংশ হওয়ায়, যে কোনো পরিবর্তন আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রস্তাবটি মূলত জননিরাপত্তা ইস্যুকে সামনে এনে সরকারের ওপর চাপ তৈরির কৌশল। অপরাধ বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে জনমনে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, কনজার্ভেটিভরা সেটিকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগাতে চাইছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, মানবাধিকারকর্মীরা সতর্ক করে দিয়েছেন, অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগেই আশ্রয় আবেদন বাতিলের মতো পদক্ষেপ নিলে নিরপরাধ ব্যক্তিরাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। এতে ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
প্রস্তাবটি হাউজ অব কমন্সে উত্থাপিত হলেও এটি আইন হিসেবে কার্যকর হতে হলে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। সরকারের অবস্থান এখনো স্পষ্ট নয়। তবে অপরাধ দমনে কঠোরতা ও মানবাধিকার সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে মূল চ্যালেঞ্জ।
কানাডার অভিবাসন নীতির এই বিতর্ক শুধু আইনগত প্রশ্ন নয়; এটি জননিরাপত্তা, মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক কৌশলের এক জটিল সমীকরণে পরিণত হয়েছে। আগামী দিনগুলোতে এ নিয়ে সংসদ ও জনপরিসরে আরও তীব্র আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
Rezaul Haque : Local Journalism Initiative Reporter
