প্রিয়কথন

অটোয়ায় আমাদের ছোট্ট ঘরটিতে বাঁ থেকে প্রিয় লুৎফর রহমান রিটন আবেদ খান সানজিদা আখতার শার্লি এবং রুমকি আলোকচিত্রসাবরিনা নদী

সাংবাদিক আবেদ খান-সানজিদা আখতার দম্পতির একমাত্র সন্তানের নামটি প্রিয়। প্রিয় আমাদেরও খুব প্রিয়। প্রিয় যখন ছোট্ট এইটুকুন একটা ছেলে, শার্লিসহ আমরা কতিপয় তখন ওদের গ্রিন রোডের বাড়ির প্রশস্ত লিভিং রুমে আড্ডা পেটাতাম প্রায়ই। আমাদের বিকেলের আড্ডা শেষ হতো গভীর রাত্রিতে। প্রিয়র জন্যে কঠিন নিয়ম বেঁধে দিয়েছিলো প্রিয়র বাবা মা। সন্ধ্যা আটটার পর ওকে ঘুমুতে যেতে হবে। নো হাংকিপাংকি। খুব মন খারাপ করে আমাদের সবাইকে গুডনাইট কিস দিয়ে প্রিয়কে চলে যেতে হতো পাশের কামরায়। ওর ঘরের লাইট অফ করে দেয়া হতো। বাবা মায়ের কথার একটুও অবাধ্য না হয়ে অন্ধকার ঘরে চুপচাপ শুয়ে পড়তো ছেলেটা। কিছুক্ষণ মন খারাপ করে শুয়ে থাকার পর ঘুমপরি এসে ওকে ঘুম পাড়িয়ে দিতো।

আমাদের সবার আদরের প্রিয় নামের ছেলেটা ধিরে ধিরে বড় হচ্ছে। ছোট্ট এইটুকুন হলেও আমাদের রসিকতা উপভোগ করতো সে হিহিহি হিহিহি হাসিতে। ওর মা আমার রূপবান। আর আমি ওর মায়ের রহিম বাদশা। আমাদের দুজনার আপাত এডাল্ট খুনসুটিতে কী যে মজা পেতো ছেলেটা! ওকে আনন্দ দেবার জন্যে কতো কী যে বলতাম ওর মাকে! ওর মায়ের সঙ্গে আমার সাজানো বা বানোয়াট অসমবয়েসী ‘প্রেমিক-প্রেমিকা’র একটা সম্পর্ক ঘটা করে রীতিমতো ঢোল পিটিয়ে রটনা করতো ওর মা টেলিভিশনের বিখ্যাত উপস্থাপক ও অধ্যাপক সানজিদা আখতার! ওর মায়ের এই ধরণের রটনার শিকার হয়ে নিজেকে ওই ডেঞ্জারাস মহিলার খপ্পর থেকে বাঁচাবার প্রাণান্তকর একটা প্রচেষ্টাকে আমি দৃশ্যমান করে তুলতাম আমার আচরণে ও কথাবার্তায়। আমার সেই ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা দেখে খিলখিল হাসিতে উল্লসিত হয়ে উঠতো প্রিয়।

- Advertisement -

এরকম চলতে চলতেই আমাদের চোখের সামনে অনেক বড় হয়ে গেলো একদিন, ছেলেটা।

দিন যায়। একদিন, প্রিয়শহর প্রিয়দেশ সবকিছু ছেড়েছুঁড়ে নদী আর শার্লিকে নিয়ে আমি জাপান চলে গেলাম, ২০০১ সালে। তারপর নিয়তির দৌঁড়ানি খেয়ে নিউইয়র্কে চারসপ্তাহ ছুটোছুটি করে ২০০২ সালের মার্চের এক বিষণ্ণ বিকেলে কানাডার অটোয়ায় এসে ডেরা বাঁধলাম।

২০০৪/০৫ সালের দিকে বাংলাদেশ থেকে উচ্চ শিক্ষার্থে বিদেশ যাত্রা করলো প্রিয়। পৃথিবীতে এতো এতো দেশ থাকতে ওর বাবা মা ওকে পাঠিয়ে দিলো কানাডায়। আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে বিদেশ বিভুঁই-এ টরন্টোর একটা ইউনিভার্সিটিতে অর্থনীতি বিষয়ে পড়তে আসা প্রিয়, বাবা মায়ের অতি আদরের একমাত্র সন্তান প্রিয় আত্মীয় পরিজনহীন অবস্থায় যেনো বা ছিটকে পড়লো অকুলপাথারে। এইরকম পরিস্থিতিতে হাতের পাঁচ হিশেবে ওর মায়ের কথিত ‘রহিম বাদশা’কেই বেছে নিলো সে। রহিম বাদশা থাকে অটোয়ায়। সুতরাং নানান অজুহাতে ওর অটোয়া আগমন শুরু হলো। ছুটি-ছাটায় হুট-হাট চলে আসে প্রিয়, অটোয়ায়, আমাদের বাড়িতে। দুদিন হৈ-হুল্লোড় আর বিস্তর খানাখাদ্য হাপিস করে আবার চলে যায় টরন্টোতে, পড়াশুনার জগতে। অটোয়া আসবার আগে টেলিফোনে শার্লি আন্টির কাছে লাঞ্চ-ডিনার আর ব্রেকফাস্টের সম্ভাব্য আইটেমগুলোর হৃদয়বিদারক একটা তালিকা পেশ করে রাখে। শার্লি সেটা আমার হাতে ধরিয়ে দেয়। বিপুল ডলারের শ্রাদ্ধ করে আমাকে কিনে আনতে হয় প্রিয়র প্রিয় বড় সাইজের একগাদা চিংড়ি। খাসির মগজ। মুর্গির গিলা-কলিজা। রুই-পাঙ্গাশ। কালিজিরা পোলাওএর চাল। আরো কতো কী! বিরস বদনে আমি আইটেমগুলো কিনি আর বলি—পৃথিবীতে এতো দেশ থাকতে ব্যাটা তোকে কেনো কানাডাতেই আসতে হবে! আমাকে ফতুর করার এটা একটা গভীর চক্রান্ত তোর মায়ের। বেশি খাইস না বাবা।

কিন্তু আমাকে বেদনার সাগরে নিক্ষেপ ক’রে আবেদ-সানজিদার পুত্রটি খাদক হিশেবে আবির্ভূত হয়। ডায়নিং টেবিলে পরিবেশিত চিংড়ি ভুনা আর কৈ ভাজাগুলো নিমেশে উধাও হয়ে যায়! গিলা-কলিজার বাটিটাও সাফা হয়ে যায় মুহূর্তেই! ভোজনরসিক পুত্রের নিষ্ঠুর মাতার ‘রহিম বাদশা’ হবার ফলাফল শেষ জীবনে এসে আমি টের পাই হাঁড়ে হাঁড়ে।

দিনরাত কোমর বেঁধে ক্লান্তিহীন রান্নায় মেতে থাকে শার্লী। এন্তার মোগলাই মশ্‌লার সঙ্গে অপরিসীম মাতৃমমতা মেশানো থাকে ওর রান্নায়। ফলে খাবার হয় প্রয়োজনের অতিরিক্ত সুস্বাদু। একেকটা আইটেম প্রিয় মুখে দেয় আর অপূর্ব অপূর্ব বলে আহাউহু করে। টেবিল থেকে উঠে গিয়ে জড়িয়ে ধরে শার্লি আন্টিকে—আন্টি কী যে মজা হয়েছে তোমার রান্না! তারপর আবার এসে মনোযোগ দেয় খাদ্যসংহারে।

প্রিয় দেখে না কিন্তু আমি দেখতে পাই শার্লির চোখ দুটো চিকচিক করছে। হাতের চেটোয় অশ্রু মুছে নেয় শার্লি। আমি জানি শার্লির এই লুকানো অশ্রুতে আনন্দের পরিমানটাই বেশি।

গভীর রাত্রিতে, প্রিয় যখন ঘুমুচ্ছে, শার্লি আমার কাছে ওর আবেগটির ব্যাখ্যা করেছে নিজের থেকেই—ছেলেটা ভালোমন্দ খেতে এতো ভালোবাসে কিন্তু এখানে ওর মা নেই। কতো দূরে ওর মা-টা আহারে! ওর মা এখানে থাকলে তো এই খাবারগুলো ওর মা-ই ওকে রান্না করে খাওয়াতো।

আমি শার্লিকে বলি—ওর মা নেই এখানে কিন্তু আন্টি তো আছে, তাই না! (আর মনে মনে বলি—বেটা তুই রিটন চাচাকে ফতুর করেই ছাড়বি মনে হয়!)

প্রিয় এলে অটোয়ায় আমাদের বাড়িতে কেমন একটা উৎসব উৎসব গন্ধ ম ম করে। বাড়িতে খানাখাদ্যের সুবাসের সঙ্গে যুক্ত হয় আড্ডার সুবাস। বাবা আর মায়ের মতোই আড্ডাবাজ এই ছেলেটা। গভীর রাত পর্যন্ত কতো অজস্র গল্প করেছি আমরা দুজন!

এক রাতে লিভিং রুমের পাশাপাশি সোফায় শুয়ে শুয়ে গল্প করছি আমরা। আলোচনার বিষয় জামাত এবং শিবিরবান্ধব তরুণ প্রজন্মের ইতিহাস অসচেতনতা। লেখাপড়া জানা একজন তরুণ শিবির সমর্থক হয় কেমন করে? মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা বিরোধী হয় কেমন করে? এইকথা সেইকথার এক পর্যায়ে প্রিয় বললো—রিটন চাচা সেই ছেলেবেলায় তোমার রাজাকারের ছড়া পড়েছিলাম বলে মস্তিষ্কের মধ্যে গেঁথে ছিলো মুক্তিযুদ্ধ- স্বাধীনতা এবং ঘাতক-রাজাকার-আলবদর বিষয়গুলো। যে কারণে আমাকে বিভ্রান্ত করা সহজ ছিলো না। অথচ আমার সহপাঠীদের কেউ কেউ মহাবিভ্রান্ত। আসলে চাচা, শৈশবেই এই বিষয়গুলোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে ছেলেমেয়েদের। তাহলে টাউট রাজনীতিবিদরা তরুণদের বিভ্রান্ত বা বেপথু করতে পারবে না সহজে।

দিন যায়। মাস যায়। বছর যায়। প্রিয় আসে। প্রিয় যায়। মাঝে মধ্যে প্রিয়কে দেখতে আসা ওর বাবা আবেদ খানও আসে প্রিয়র সঙ্গে আমাদের অটোয়ার বাড়িতে। আমাদের বাড়িটায় তখন ঈদের আনন্দ।

লিভিংরুমে আমাদের সোফা কাম বেডে বাপ-বেটা ঘুমায়। খুব ভোরে উঠে আমি আবিস্কার করি বিছানায় বাপ-বেটা দুজনেই দুজনকে খোঁচাখুঁচি করে আনন্দ করছে। ইকনোমিক্সে মাস্টার্স পুত্রের নাকে কপালে চিবুকে পেটে আঙুলের খোঁচা দিচ্ছে আবেদ খান। আহা কী অপরূপ সেই দৃশ্য!

দিন যায়। মাস যায়। বছর যায়। প্রিয় আসে। প্রিয় যায়। এবার প্রিয়র সঙ্গে আসে রুমকি নামের ছোটখাটো ঝলমলে একটা মেয়ে। প্রিয়র বউ আদুরে এই মেয়েটা। কিছুদিন আগে যে বিছানায় বাপ-বেটার খুনসুটি দেখেছি সেই বিছানায় প্রিয় আর রুমকি ঘুমায়। কী যে ভালো লাগে দৃশ্যটা! আহা সময় কতো দ্রুত বয়ে যাচ্ছে। সেদিনের পিচ্চি ছেলেটা কীনা এতো বড় হয়ে গেলো! আমার বাড়িতে ছেলেটা বেড়াতে এসেছে ওর বউকে নিয়ে! বুড়ো হয়ে যাচ্ছি নাকি!

দিন যায়। মাস যায়। বছর যায়। প্রিয় আসে। রুমকি আসে। প্রিয় যায়। রুমকি যায়। এবার রুমকি আর প্রিয়র সঙ্গে আসে প্রিয়র বাবা আবেদ খান আর প্রিয়র মা আমার ‘রূপবান’ সানজিদা আখতার। খুশির বন্যা বয়ে যায় আমাদের বাড়িতে। পৃথিবীর সমস্ত আনন্দ এসে জড়িয়ে ধরে আমাদের বাড়িটাকে।

দিন যায়। মাস যায়। বছর যায়। প্রিয় আসে। রুমকি আসে। প্রিয় যায়। রুমকি যায়। এবার রুমকি আর প্রিয়র সঙ্গে আসে আবেদ খান সানজিদা আখতার এবং একটা ছোট্ট রাজকুমার। রুমকি আর প্রিয়র ‘স্বপ্ন’। কয়েক বছর আগে যে বিছানায় আবেদ খানের সঙ্গে প্রিয়কে দেখে খুশি হয়েছিলাম, যে বিছানায় প্রিয়র সঙ্গে রুমকিকে দেখে বিস্মিত হয়েছিলাম, সেই বিছানায় প্রিয় আর রুমকির মাঝখানে স্বপ্ন নামের তুলতুলে দেবশিশুটাকে দেখে চোখে তো আমার পানি এসে গেলো! আহা একজীবনে জীবন আমাকে কতো বিচিত্র আর চমৎকার দৃশ্যই না উপহার দিয়েছে!

আমাদের আদরের সেই ছোট্ট ছেলেটা, প্রিয়, আজ টরন্টো ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি অর্জন করেছে! অভিনন্দন ডক্টর আসাদ করিম খান প্রিয়!

- Advertisement -

Read More

Recent