
কানাডার টরন্টোর থর্নক্লিফ পার্কে দীর্ঘস্থায়ী অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এক নির্মাণ কোম্পানি, একটি কন্ডোমিনিয়াম কর্পোরেশন এবং একটি ভবন ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেছে টরন্টো ফায়ার সার্ভিসেস (টিএফএস)। তদন্তে উঠে এসেছে একাধিক গুরুতর অগ্নি নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘনের বিষয়, যা এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর ১১ থর্নক্লিফ পার্ক ড্রাইভে প্রথম অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। পরে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে পাশের ২১ ওভারলি বুলভার্ডের একটি টাওয়ারে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রায় এক মাস সময় লেগে যায়, এবং অবশেষে ২৫ ডিসেম্বর আগুন পুরোপুরি নিভেছে বলে ঘোষণা করা হয়। এই দীর্ঘ সময়জুড়ে কয়েকশ বাসিন্দা তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
টরন্টো ফায়ার চিফ জিম জেসপ জানান, ঘটনাটির পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তে দেখা গেছে যে ওই ভবনে চলমান নির্মাণকাজের সময় দাহ্য সামগ্রীর আশপাশে আগুনের উৎস ব্যবহার করা হচ্ছিল। নিরাপত্তা বিধি না মেনে এই ধরনের কার্যক্রম চালানোই আগুনের সূত্রপাত ঘটায় বলে ধারণা করা হচ্ছে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো অগ্নিকাণ্ডের শুরু হওয়ার পর প্রায় ৩০ মিনিটেরও বেশি সময় পর্যন্ত দমকল বিভাগকে বিষয়টি জানানো হয়নি। এই বিলম্ব আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই ঘটনায় পিএফসি কনস্ট্রাকশন ইনকর্পোরেশন-এর বিরুদ্ধে অন্টারিও অগ্নি বিধির একাধিক ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে – দাহ্য সামগ্রীর কাছে আগুনের উৎস নিরাপদে না রাখা, আগুনের ওপর পর্যাপ্ত নজরদারি না রাখা, বাসিন্দাদের সতর্ক করতে ব্যর্থ হওয়া, দমকল বিভাগকে দ্রুত অবহিত না করা এবং পর্যাপ্ত বহনযোগ্য অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র সরবরাহে ব্যর্থতা।
এছাড়া, মেট্রোপলিটন টরন্টো কন্ডোমিনিয়াম কর্পোরেশন ৯৫৬ এবং ভবন ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ডেল প্রোপার্টি ম্যানেজমেন্ট ইনকর্পোরেশন-এর বিরুদ্ধেও অভিযোগ আনা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ভবনের অগ্নি নিরাপত্তা পরিকল্পনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না করা।
এই তিনটি পক্ষের বিরুদ্ধে দায়ের করা অভিযোগের শুনানি চলতি মাসের শেষ দিকে প্রাদেশিক অপরাধ আদালতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
পিএফসি কনস্ট্রাকশন এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা তদন্তের প্রতিটি ধাপে পূর্ণ সহযোগিতা করেছে এবং অভিযোগগুলোকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছে, তারা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সব অভিযোগের জবাব দেবে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে উপস্থাপন করবে।
এই ঘটনা টরন্টোর মতো উন্নত নগরীতেও নির্মাণস্থলে নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা কতটা বিপজ্জনক হতে পারে, তার একটি বড় উদাহরণ। বিশেষ করে দাহ্য উপকরণের কাছে আগুনের উৎস ব্যবহারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ, এবং অগ্নিকাণ্ডের পর দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়ার প্রবণতা দুটিই ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। এছাড়া, অগ্নি নিরাপত্তা পরিকল্পনা শুধু কাগজে থাকলেই হয় না তার কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি। এই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট একাধিক পক্ষের অবহেলা একত্রে একটি বড় বিপর্যয়ের সৃষ্টি করেছে, যা ভবিষ্যতে নির্মাণ ও ভবন ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারির প্রয়োজনীয়তাকে আরও জোরালোভাবে সামনে এনেছে।
থর্নক্লিফ পার্কের এই অগ্নিকাণ্ড শুধু একটি দুর্ঘটনা নয় এটি একাধিক ত্রুটি ও অবহেলার ফল। আদালতের রায় যা-ই হোক, এই ঘটনা ভবিষ্যতে অগ্নি নিরাপত্তা বিধি কঠোরভাবে মেনে চলার গুরুত্ব সম্পর্কে একটি শক্ত বার্তা দিয়ে গেল।
রেজাউল হক : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ
