
কানাডায় বিমানযাত্রীদের অধিকার রক্ষা ও সেবার মান উন্নয়নে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে ফেডারেল সরকার। যাত্রী সুরক্ষা আইন লঙ্ঘনকারী উড়োজাহাজ পরিবহনকারী সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে জরিমানার সর্বোচ্চ সীমা চারগুণ বাড়িয়ে ১০ লাখ ডলার করার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। বিদ্যমান আইনে এই জরিমানার সীমা ছিল ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার।
গত ১ মে অটোয়ায় কানাডার পরিবহনমন্ত্রী স্টিভেন ম্যাকিনন আনুষ্ঠানিকভাবে এই সিদ্ধান্তের কথা জানান। তিনি বলেন, সরকার চায় বিমান সংস্থাগুলো যাত্রী অধিকারকে গুরুত্ব দিক এবং আইন মেনে চলুক। যদিও নতুন জরিমানার সীমাকে তিনি নিয়মিত প্রয়োগযোগ্য শাস্তি হিসেবে নয়, বরং একটি কঠোর সতর্কবার্তা হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মন্ত্রী বলেন, “যদি কোনো এয়ারলাইন্সের বিরুদ্ধে আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা আশা করি, বিমান সংস্থাগুলো সরকারের প্রত্যাশা অনুযায়ী দায়িত্বশীল আচরণ করবে।”
এই ঘোষণা এমন এক সময়ে এলো, যখন কানাডাজুড়ে বিমানযাত্রীদের অসন্তোষ তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে ফ্লাইট বিলম্ব, বাতিল, লাগেজ হারানো এবং ক্ষতিপূরণ না পাওয়ার অভিযোগ দিন দিন বাড়ছে।
বর্তমানে কানাডিয়ান ট্রান্সপোর্টেশন এজেন্সির কাছে ৯৭ হাজারেরও বেশি যাত্রী অভিযোগ অনিষ্পন্ন অবস্থায় পড়ে রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই বিশাল সংখ্যক অভিযোগই প্রমাণ করে যে বর্তমান যাত্রী সুরক্ষা ব্যবস্থা কার্যকরভাবে কাজ করতে পারছে না এবং পুরো ব্যবস্থাটি ব্যাপক চাপের মুখে রয়েছে।
পরিবহনমন্ত্রী স্টিভেন ম্যাকিনন স্বীকার করেছেন যে, ২০২৩ সালে চালু হওয়া বর্তমান নিয়ন্ত্রণ কাঠামো প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। মূলত মহামারির সময় যাত্রীদের অধিকার রক্ষার জন্য যে নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছিল, তা বাস্তবে জটিল ও ধীরগতির ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, “এই ব্যবস্থাটি মানুষকে দ্রুত সহায়তা দেওয়ার পরিবর্তে আরও জবরজং ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। এতে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে এবং ভুক্তভোগী যাত্রীরা ন্যায়বিচার পেতে বিলম্বের শিকার হচ্ছেন।” মহামারির পর বিমান চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীসংখ্যা দ্রুত বাড়লেও অভিযোগ নিষ্পত্তির কাঠামো সেই হারে আধুনিকায়ন হয়নি। ফলে বিপুল সংখ্যক অভিযোগ বছরের পর বছর ঝুলে থাকছে।
জরিমানার সীমা বৃদ্ধির সিদ্ধান্তটি কানাডার ফেডারেল সরকারের সাম্প্রতিক স্প্রিং ইকোনমিক আপডেটের অংশ হিসেবে এসেছে। এই আপডেটে শুধু যাত্রী সুরক্ষা নয়, বরং দেশের বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনাতেও বড় ধরনের সংস্কারের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। সরকার বিকল্প মালিকানা কাঠামো, বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বিমানবন্দর পরিচালনায় নতুন মডেল নিয়ে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে মন্ত্রী ম্যাকিনন জানিয়েছেন, পুরো প্রক্রিয়াটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং শিল্প সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
জরিমানার সীমা ১০ লাখ ডলারে উন্নীত হওয়া কানাডার এয়ারলাইন্সগুলোর ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে যাত্রীদের ক্ষতিপূরণ, তথ্য সরবরাহ এবং ফ্লাইট ব্যবস্থাপনায় অবহেলা করলে এখন কোম্পানিগুলোকে বড় অঙ্কের আর্থিক ঝুঁকির মুখে পড়তে হতে পারে। এতে বিমান সংস্থাগুলো সেবার মান উন্নয়ন, সময়মতো তথ্য প্রদান এবং অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়ে আরও সতর্ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে কানাডা সরকার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, বিমানযাত্রীদের অধিকার আর অবহেলার বিষয় নয়। দীর্ঘদিনের অভিযোগ ও ক্ষোভের পর সরকার এখন কার্যকর আইন প্রয়োগের দিকে ঝুঁকছে। তবে শুধু জরিমানার সীমা বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ নিষ্পত্তির গতি বাড়ানো, প্রশাসনিক জটিলতা কমানো এবং যাত্রীদের দ্রুত সহায়তা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
রেজাউল হক : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ
