পোস্টগ্র্যাজুয়েট ওয়ার্ক পারমিটের ভাষা নিয়ে বিভ্রান্তি

Large conference hall with an audience facing a decorated stage; two screens show a speaker in a red robe.
উচ্চশিক্ষা শেষ করে দেশটিতে কাজের সুযোগ পাওয়ার আশায় প্রতিবছর হাজারো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী পোস্টগ্র্যাজুয়েট ওয়ার্ক পারমিট পিজিডব্লিউপি এর জন্য আবেদন করেন

কানাডায় উচ্চশিক্ষা শেষ করে দেশটিতে কাজের সুযোগ পাওয়ার আশায় প্রতিবছর হাজারো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী পোস্টগ্র্যাজুয়েট ওয়ার্ক পারমিট (পিজিডব্লিউপি) এর জন্য আবেদন করেন। এই পারমিটকে অনেকেই কানাডায় স্থায়ী ভবিষ্যৎ গড়ার প্রথম ধাপ হিসেবে দেখেন। কিন্তু সম্প্রতি কানাডার ফেডারেল সরকারের নতুন নীতিগত পরিবর্তন বহু শিক্ষার্থীর জন্য অনিশ্চয়তা ও হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই সংকটের মুখে পড়েছেন ঢাকায় জন্ম নেয়া আবিদুল ইসলাম। তিনি ২০২৪ সালের এপ্রিলে কানাডার অন্যতম শীর্ষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইউনিভার্সিটি অব অটোয়া থেকে পলিটিক্যাল সাইয়েন্স বিষয়ে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষে তার পরিকল্পনা ছিল কোনো কানাডিয়ান প্রতিষ্ঠানে নিজের অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা কাজে লাগানো। কিন্তু বাস্তবতা তার জন্য একেবারেই ভিন্ন হয়ে দাঁড়ায়।

- Advertisement -

গ্র্যাজুয়েশনের পর আবিদ পোস্টগ্র্যাজুয়েট ওয়ার্ক পারমিটের জন্য আবেদন করেন। সাধারণত এই পারমিট আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কানাডায় বৈধভাবে কাজ করার সুযোগ দেয়। আবেদন প্রক্রিয়া চলাকালীন সময়েও শিক্ষার্থীরা অনেক ক্ষেত্রে কাজ করতে পারেন। আবিদও সেই সুযোগে একটি কানাডিয়ান পরিবেশভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করেছিলেন। তার ধারণা ছিল, যেহেতু তিনি অনুমোদিত একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা সম্পন্ন করেছেন এবং অন্যান্য সব শর্ত পূরণ করেছেন, তাই ওয়ার্ক পারমিট পাওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার। কিন্তু ১৭ মার্চ তার কাছে পৌঁছায় একটি সরকারি চিঠি, যা মুহূর্তেই বদলে দেয় তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। চিঠিতে জানানো হয়, আবেদনপত্রের সঙ্গে ইংরেজি বা ফ্রেঞ্চ ভাষা পরীক্ষার ফলাফল সংযুক্ত না করায় তার আবেদন বাতিল করা হয়েছে।

২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে কানাডা সরকার পোস্টগ্র্যাজুয়েট ওয়ার্ক পারমিটের ক্ষেত্রে ভাষা পরীক্ষার ফলাফল বাধ্যতামূলক করে। কিন্তু আবিদুলের অভিযোগ, তিনি যখন আবেদন জমা দেন, তখন নির্দেশিকায় এই শর্ত পরিষ্কারভাবে উল্লেখ ছিল না। তার ভাষায়, “মনে হয়েছে যেন হঠাৎ একটি ট্রাক এসে ধাক্কা দিয়ে গেল। তারপর আপনি বুঝতেই পারছেন না, কীভাবে আগের মতো স্বাভাবিক জীবন চালিয়ে যাবেন।” আবিদুল আরও জানান, তার পরিবার দীর্ঘদিন ধরে ইংরেজিভাষী পরিবেশে বসবাস করছে। তার বাবা-মাও কানাডার অভিবাসন প্রক্রিয়ায় ইংরেজি দক্ষতার জন্য ভালো স্কোর পেয়েছিলেন। তিনি নিজেও সাবলীলভাবে ইংরেজিতে কথা বলতে পারেন। তবু কেবল একটি আনুষ্ঠানিক ভাষা পরীক্ষার সনদ না থাকায় তার আবেদন বাতিল হয়েছে।

আবিদুলের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম রেডিটে পোস্টগ্র্যাজুয়েট ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে গড়ে ওঠা বিভিন্ন কমিউনিটি গ্রুপে একই ধরনের অভিযোগে ভরে উঠেছে আলোচনা থ্রেডগুলো। অনেক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, তারা আবেদন করার সময় নতুন নীতিমালার ব্যাপারে পর্যাপ্তভাবে অবগত ছিলেন না। কেউ কেউ বলছেন, নীতিমালার পরিবর্তন নিয়ে সরকারি যোগাযোগ ছিল অস্পষ্ট। আবার অনেকের দাবি, আবেদন জমা দেওয়ার পর হঠাৎ নতুন শর্ত কার্যকর হওয়ায় তারা অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়ে যান। ভাষা দক্ষতা যাচাইয়ের উদ্দেশ্য থাকলেও নীতিমালার পরিবর্তন বাস্তবায়নে আরও স্বচ্ছতা প্রয়োজন ছিল। কারণ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা শুধু শিক্ষার জন্য নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার পরিকল্পনা ও আর্থিক বিনিয়োগ নিয়েও কানাডায় আসেন।

গত কয়েক বছরে কানাডা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছিল। পড়াশোনা শেষে কাজের সুযোগ এবং পরবর্তীতে স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার সম্ভাবনাই ছিল এর মূল আকর্ষণ। তবে সম্প্রতি অভিবাসন নীতিতে ধারাবাহিক পরিবর্তনের কারণে অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। কেউ কেউ মনে করছেন, সরকার অভিবাসন ও অস্থায়ী বাসিন্দার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান নেওয়ায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরাও এর প্রভাবের শিকার হচ্ছেন। আবিদুলের মতো শিক্ষার্থীদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে, কারণ আবেদন বাতিল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতিও শেষ হয়ে যায়। ফলে চাকরি হারানো, আর্থিক সংকট এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাদের।

এখন আবিদুলের সামনে রয়েছে নতুন করে ভাষা পরীক্ষা দেওয়া এবং পুনরায় আবেদন করার পথ। কিন্তু ততদিনে তার চাকরি, আয় এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সবই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে। তার অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে অভিবাসন ও কাজের অনুমতির নিয়ম যেকোনো সময় বদলাতে পারে, আর সেই পরিবর্তনের প্রভাব জীবন বদলে দিতে পারে মুহূর্তেই।

আবিদুল এই প্রতিবেদককে বললেন, এখন প্রতি মুহূর্ত কাটছে কেবল টেনশন আর অনিশ্চয়তায়।

রেজাউল হক : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার

- Advertisement -

Read More

Recent