
কানাডার অন্টারিও প্রদেশে সরকারি কর্মীদের জন্য ‘হাইব্রিড’ বা নমনীয় কর্মব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিকল্প কাজের ব্যবস্থার আবেদন করা হাজারো অন্টারিও পাবলিক সার্ভিস (ওপিএস) কর্মীর আবেদন একের পর এক প্রত্যাখ্যান করছে প্রাদেশিক সরকার। ইতোমধ্যে বহু কর্মীর কাছে আনুষ্ঠানিক প্রত্যাখ্যানপত্র পৌঁছাতে শুরু করেছে বলে নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সামনে বিশ্বকাপ ফুটবলকে ঘিরে কর্মীদের বাড়ি থেকে কাজের সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে তাদের প্রতিনিধিত্বকারী ইউনিয়ন। তবে সরকার আপাতত কঠোর অবস্থানেই অনড় রয়েছে।
অন্টারিও সরকারের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিকল্প কর্মব্যবস্থার আবেদনগুলো পৃথকভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে এবং ধাপে ধাপে সিদ্ধান্ত জানানো হচ্ছে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আরও হাজারো কর্মীকে সিদ্ধান্ত জানানো হতে পারে। ওপিএসইইউ-এর ওপিএস ইউনিফায়েড সেন্ট্রাল এমপ্লয়ি রিলেশন্স কমিটির চেয়ার ক্রিস একার্ট জানিয়েছেন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে কর্মীদের আবেদন খারিজের চিঠি পাঠানো হচ্ছে বলে তারা জানতে পারছেন। যদিও ঠিক কোন কোন মন্ত্রণালয় সবচেয়ে বেশি আবেদন প্রত্যাখ্যান করছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে অন্তত দুটি মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে কর্মীদের কাছে প্রত্যাখ্যানপত্র পাঠিয়েছে বলে জানা গেছে।
সরকারি কর্মীদের আবেদনের মধ্যে ছিল কয়েক ধরনের বিকল্প কর্মব্যবস্থার প্রস্তাব। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল পুরোপুরি দূর থেকে বা বাড়িতে বসে কাজ করার অনুমতি, অফিসের বদলে অন্য সরকারি লোকেশন থেকে কাজ করার সুযোগ, কর্মঘণ্টা পুনর্বিন্যাস বা নমনীয় সময়সূচি এবং সপ্তাহে নির্দিষ্ট কিছুদিন অফিসে উপস্থিতির প্রস্তাব। কিছু ক্ষেত্রে আংশিক অনুমোদন দেওয়া হলেও অধিকাংশ আবেদনই প্রত্যাখ্যাত হয়েছে বলে জানিয়েছে ইউনিয়ন।
চলতি বছরের শুরুতে অন্টারিও সরকার সরকারি কর্মীদের পূর্ণকালীনভাবে অফিসে ফেরার নির্দেশ দেয়। এর আগে কোভিড-১৯ মহামারির সময় থেকে বহু সরকারি কর্মী আংশিক বা পুরোপুরি বাড়ি থেকে কাজ করছিলেন। মহামারির পরও অনেক বিভাগে হাইব্রিড ব্যবস্থা কার্যকর ছিল। কর্মীদের দাবি, এতে কাজের উৎপাদনশীলতা কমেনি বরং যাতায়াতের সময় ও খরচ কমেছে। পাশাপাশি পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য রক্ষা করাও সহজ হয়েছে। কিন্তু নতুন নির্দেশনার ফলে বহু কর্মীকে আবার নিয়মিত অফিসে ফিরতে হচ্ছে। আর সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেই বিকল্প ব্যবস্থার আবেদন করেছিলেন প্রায় ১০ হাজার কর্মী।
ওপিএসইইউ বলছে, সরকার কর্মীদের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিচ্ছে না। বিশেষ করে বড় শহরগুলোতে দীর্ঘ যাতায়াত, পরিবহন ব্যয় এবং কাজের মানসিক চাপ অনেক বেড়ে গেছে। ইউনিয়নের মতে, প্রযুক্তিগতভাবে যখন দূর থেকে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করা সম্ভব, তখন কর্মীদের জোর করে অফিসে ফিরিয়ে আনা অযৌক্তিক। তারা আরও বলছে, কর্মীদের অনেকে মহামারির পর জীবনযাত্রা ও পারিবারিক পরিকল্পনা নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য করে নিয়েছিলেন। হঠাৎ নীতিগত পরিবর্তনে তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। বিশ্বকাপ ফুটবলের সময় অন্তত নমনীয় কর্মঘণ্টা বা বাড়ি থেকে কাজের সুযোগ দেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছে ইউনিয়ন। তাদের মতে, এতে কর্মীদের মনোবল ও উৎপাদনশীলতা দুই-ই বাড়তে পারে।
অন্টারিও সরকার এখন পর্যন্ত পূর্ণকালীন অফিসভিত্তিক কাজের নীতিতেই অটল রয়েছে। সরকারের যুক্তি, অফিসে উপস্থিতি বাড়ালে দলগত সমন্বয়, সেবা প্রদান এবং প্রশাসনিক কার্যকারিতা উন্নত হয়। তবে কর্মীদের আবেদনের ক্ষেত্রে ‘ব্যক্তিগত পরিস্থিতি’ বিবেচনা করা হচ্ছে বলেও দাবি করেছে কর্তৃপক্ষ। যদিও ইউনিয়নের অভিযোগ, বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আবেদন সরাসরি বাতিল করা হচ্ছে।
বর্তমানে অন্টারিও সরকারের প্রায় দুই লাখ কর্মীর প্রতিনিধিত্ব করছে ওপিএসইইউ। তাই এই ইস্যু ভবিষ্যতে বড় শ্রমিক-সরকার দ্বন্দ্বে রূপ নিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোভিড-পরবর্তী বিশ্বে কর্মপরিবেশের ধারণাই বদলে গেছে। অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এখনো হাইব্রিড বা দূরবর্তী কাজের মডেল বজায় রেখেছে। ফলে সরকারি খাতের কর্মীদের মধ্যেও একই ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। অন্যদিকে সরকার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও কার্যকারিতার যুক্তি সামনে রেখে অফিসে উপস্থিতিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এই দুই অবস্থানের সংঘাত আগামী দিনগুলোতে আরও তীব্র হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রেজাউল হক : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার
