
ডিজিটাল স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের পথে হাঁটল কানাডা। দেশটির ফেডারেল সম্প্রচার নিয়ন্ত্রক সংস্থা কানাডিয়ান রেডিও-টেলিভিশন অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশনস কমিশন (সিআরটিসি) ঘোষণা করেছে, নেটফ্লিক্স, ডিজনি+, অ্যামাজন প্রাইম ভিডিও এবং অ্যাপল টিভির মতো বৃহৎ আন্তর্জাতিক স্ট্রিমিং সেবাগুলোকে কানাডা থেকে অর্জিত রাজস্বের অন্তত ১৫ শতাংশ স্থানীয় কনটেন্ট তৈরিতে ব্যয় করতে হবে। বৃহস্পতিবার ঘোষিত এই সিদ্ধান্তকে কানাডার সাংস্কৃতিক নীতিতে বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ এর মাধ্যমে সরকার স্থানীয় ভাষা, সংস্কৃতি এবং সংবাদভিত্তিক কনটেন্টকে সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক প্রযুক্তি জায়ান্টগুলোর ওপর আর্থিক দায়বদ্ধতা বাড়াচ্ছে।
সিআরটিসির নতুন নির্দেশনায় স্ট্রিমিং প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক অবদান উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি বিদেশি স্ট্রিমিং কোম্পানিগুলোর জন্য ৫ শতাংশ অবদান নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু নতুন সিদ্ধান্তে সেই হার সরাসরি ১৫ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে, যা আগের তুলনায় তিনগুণ বেশি। তবে আগের ৫ শতাংশ অবদানের সিদ্ধান্ত নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। অ্যাপল এবং অ্যামাজনের মতো একাধিক বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে। তাদের অভিযোগ, কানাডা বিদেশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
কানাডা দীর্ঘদিন ধরেই স্থানীয় সংস্কৃতি ও ভাষাকে রক্ষার প্রশ্নে বিশেষভাবে সংবেদনশীল। বিশেষ করে ফরাসি ভাষাভিত্তিক কনটেন্ট সংরক্ষণকে দেশটির সাংস্কৃতিক নীতির অন্যতম প্রধান অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সিআরটিসি জানিয়েছে, নতুন নিয়ম কার্যকর হলে ফরাসি ভাষার অনুষ্ঠান, স্থানীয় সংবাদ এবং কানাডিয়ান প্রযোজনার জন্য গঠিত তহবিলের পরিমাণ প্রায় ২০০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে। এই অর্থের বড় অংশ ব্যয় হবে কানাডিয়ান প্রযোজনা খাতের বিকাশ, স্থানীয় শিল্পীদের সুযোগ বৃদ্ধি এবং সংবাদভিত্তিক কনটেন্ট তৈরিতে। বৈশ্বিক স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোর বিস্তারের ফলে স্থানীয় টেলিভিশন ও প্রযোজনা শিল্প বড় ধরনের প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে। ফলে সরকার এখন ডিজিটাল যুগে স্থানীয় কনটেন্টকে টিকিয়ে রাখতে সরাসরি অর্থনৈতিক নীতি প্রয়োগ করছে।
শুধু অনলাইন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম নয়, কানাডার প্রচলিত টেলিভিশন ব্রডকাস্টারদের ক্ষেত্রেও নতুন কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। এতদিন দেশটির ঐতিহ্যবাহী সম্প্রচার মাধ্যমগুলোকে তাদের আয়ের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত স্থানীয় কনটেন্টে বিনিয়োগ করতে হতো। নতুন নীতিমালায় সেই হার কমিয়ে ২৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। সিআরটিসির মতে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের উত্থানের কারণে প্রচলিত সম্প্রচার মাধ্যমগুলো আর আগের মতো বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে না। তাই তাদের ওপর আর্থিক চাপ কিছুটা কমিয়ে আনা হয়েছে।
এই আইনকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আলোচনা শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র কানাডার অনলাইন স্ট্রিমিং আইনকে দুই দেশের চলমান বাণিজ্য আলোচনায় “বাণিজ্যিক অস্বস্তি” হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ওয়াশিংটনের উদ্বেগ হলো এই ধরনের নীতি মূলত মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর অতিরিক্ত আর্থিক ও প্রশাসনিক বোঝা চাপাচ্ছে। কারণ নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন, অ্যাপল এবং ডিজনির মতো বড় স্ট্রিমিং প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশই যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক। তবে কানাডা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, এটি কোনো বাণিজ্যিক প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নয়; বরং সাংস্কৃতিক ভারসাম্য রক্ষার প্রয়াস।
বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে সিআরটিসির ভাইস প্রেসিডেন্ট স্কট শর্টলাইফ বলেন, তাদের সংস্থা বাণিজ্য আলোচনার সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় এবং তারা শুধুমাত্র কানাডার আইন বাস্তবায়ন করছে। তার ভাষায়, “আমরা একটি আধা-বিচারিক ট্রাইব্যুনাল। তাই বাণিজ্য আলোচনা নিয়ে সরকারের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। আমরা শুধু কানাডায় কানাডিয়ান আইন প্রয়োগ করছি। আমাদের বিশ্বাস, সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো এই আইনকে সম্মান করবে।” তার এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট, কানাডা বৈশ্বিক চাপ থাকা সত্ত্বেও নিজেদের সাংস্কৃতিক নীতিতে আপস করতে চাইছে না।
সিআরটিসি শুধু অর্থ প্রদানের নির্দেশনাই দেয়নি, সেই অর্থ কোথায় ব্যয় হবে তারও নির্দিষ্ট কাঠামো তৈরি করেছে। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, স্ট্রিমিং কোম্পানিগুলোর আর্থিক অবদানের বড় অংশ সরাসরি কানাডিয়ান কনটেন্ট প্রযোজনা, স্থানীয় প্রযোজনা তহবিল এবং সংবাদভিত্তিক প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে হবে। বিশেষ করে বৃহৎ স্ট্রিমিং প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আরও নির্দিষ্ট নির্দেশনা আরোপ করা হয়েছে, যাতে তারা শুধু আনুষ্ঠানিক অবদান দেখিয়ে দায় এড়াতে না পারে। অর্থাৎ, এই অর্থ প্রকৃতপক্ষে স্থানীয় শিল্প ও সংস্কৃতির বিকাশে ব্যবহার হচ্ছে কি না, সেটিও পর্যবেক্ষণ করবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
বিশ্বব্যাপী স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের বিস্তার বিনোদন জগতের চেহারা বদলে দিয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি ছোট দেশগুলোর স্থানীয় সংস্কৃতি ও ভাষার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে। কানাডার নতুন সিদ্ধান্ত সেই বৈশ্বিক বাস্তবতারই প্রতিফলন। দেশটি বুঝিয়ে দিতে চাইছে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম যত বড়ই হোক না কেন, স্থানীয় সংস্কৃতি ও ভাষার স্বার্থে তাদেরও দায়িত্ব নিতে হবে। ভবিষ্যতে ইউরোপসহ আরও অনেক দেশ একই ধরনের নীতি অনুসরণ করতে পারে। কারণ আন্তর্জাতিক স্ট্রিমিং জায়ান্টগুলোর দ্রুত বিস্তার স্থানীয় মিডিয়া শিল্পের অর্থনৈতিক কাঠামোকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে।
