
কানাডার শিল্পবাজারে সম্প্রতি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে ৩৬১ বছরের পুরোনো একটি রহস্যময় পোর্ট্রেট। ব্রিটিশ রাজপুত্র ও হাডসন’স বে কোম্পানির প্রথম গভর্নর প্রিন্স রুপার্টের সেই ঐতিহাসিক পেইন্টিং নিলামে বিক্রি হয়েছে ২ লাখ ১৭ হাজার ২৫০ মার্কিন ডলারে। টরন্টোর অভিজাত রিটজি ইয়র্কভিল নেবারহুডে আয়োজিত এক বিশেষ নিলামে এই শিল্পকর্মটি বিক্রি হয়।
পেইন্টিংটির মালিক ছিল কানাডার ঐতিহ্যবাহী কিন্তু বর্তমানে বিলুপ্ত ডিপার্টমেন্ট স্টোর প্রতিষ্ঠান হাডসন’স বে কোম্পানি (এইচবিসি)। প্রতিষ্ঠানটি তাদের সংগ্রহে থাকা প্রায় ৪ হাজার ৪০০ শিল্পকর্ম ও ঐতিহাসিক পুরাতত্ত্ব বিক্রির জন্য দায়িত্ব দেয় বিখ্যাত হেফেল ফাইন আর্ট অকশন হাউজকে। সেই বিশাল সংগ্রহের মধ্যেই ছিল প্রিন্স রুপার্টের এই বিরল প্রতিকৃতি।
প্রথমদিকে ধারণা করা হয়েছিল, পোর্ট্রেটটি সম্ভবত বিখ্যাত ফ্লেমিশ শিল্পী অ্যান্থনি ভ্যান ডাইকের কোনো সহকারীর আঁকা। কারণ, প্রিন্স রুপার্টের জীবনের বিভিন্ন সময়ের প্রতিকৃতি সাধারণত ভ্যান ডাইকই এঁকেছিলেন। তবে গত নভেম্বরে নিলামের প্রস্তুতির সময় হেফেলের বিশেষজ্ঞরা ছবিটির সূক্ষ্ম শিল্পগুণ এবং অস্বাভাবিক কারুকাজ দেখে সন্দিহান হয়ে ওঠেন। তাদের মনে প্রশ্ন জাগে এত নিখুঁত ও শক্তিশালী শিল্পকর্ম কেবল কোনো সহকারীর পক্ষে আঁকা সম্ভব কি না।
এরপরই নিলাম থেকে সাময়িকভাবে সরিয়ে নেওয়া হয় পেইন্টিংটি। রহস্য উন্মোচনে কানাডা ও ইউরোপের কয়েকজন খ্যাতিমান শিল্প-ইতিহাসবিদ এবং গবেষকের সহায়তা নেয় হেফেল কর্তৃপক্ষ। দীর্ঘ অনুসন্ধান, রঙ বিশ্লেষণ, তুলির আঁচড়ের ধরন এবং ঐতিহাসিক দলিল যাচাইয়ের পর তারা নিশ্চিত হন যে শিল্পকর্মটির প্রকৃত শিল্পী ডাচ পোর্ট্রেটিস্ট পিটার লিরি।
এই আবিষ্কার শুধু পেইন্টিংটির ঐতিহাসিক মূল্যই বাড়ায়নি, বরং ইউরোপীয় পোর্ট্রেট শিল্পের ইতিহাসেও নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে ভুল পরিচয়ে থাকা একটি শিল্পকর্মের প্রকৃত শিল্পীকে শনাক্ত করা শিল্পবিশ্বে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
হেফেল ফাইন আর্ট অকশন হাউজ ক্রেতার পরিচয় প্রকাশ করেনি। তবে তারা জানিয়েছে, পেইন্টিংটির “হ্যামার মূল্য” ছিল ১ লাখ ৮০ হাজার ডলার। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ক্রেতার প্রিমিয়াম, যা হ্যামার মূল্যের ২৫ শতাংশ। সব মিলিয়ে চূড়ান্ত বিক্রয়মূল্য দাঁড়ায় ২ লাখ ১৭ হাজার ২৫০ ডলার।
শুধু এই পোর্ট্রেটই নয়, ওই নিলামে কানাডার বিখ্যাত শিল্পী জাঁ পল রিওপেলে, এমিলি কার এবং “গ্রুপ অব সেভেন”-এর সদস্যদের একাধিক শিল্পকর্মও তোলা হয়েছিল। ফলে নিলামটি উত্তর আমেরিকার শিল্পসংগ্রাহকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।
শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, প্রিন্স রুপার্টের এই প্রতিকৃতির বিক্রি প্রমাণ করে যে ঐতিহাসিক শিল্পকর্মের প্রতি সংগ্রাহকদের আগ্রহ এখনও অত্যন্ত শক্তিশালী। বিশেষ করে, যখন কোনো শিল্পকর্মের পেছনে থাকে রহস্য, পুনরাবিষ্কার এবং ইতিহাসের অজানা অধ্যায় তখন তার মূল্য আরও বহুগুণ বেড়ে যায়।
রেজাউল হক : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার
