
পার্কিং ও রেড লাইট ক্যামেরার জরিমানা পর্যালোচনার ক্ষেত্রে টরন্টো সিটি প্রশাসনের ধীরগতির কারণে নজিরবিহীন জট তৈরি হয়েছে। সিটি হলের অডিট কমিটির সর্বশেষ বৈঠকে উঠে এসেছে, ২০২৫ সালে একটি পার্কিং জরিমানার পর্যালোচনার আবেদন নিষ্পত্তি করতে গড়ে ২৫২ দিন, অর্থাৎ আট মাসেরও বেশি সময় লেগেছে। এর ফলে মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে অনিষ্পন্ন পর্যালোচনার আবেদন দশগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। অডিট কমিটির আলোচনায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, প্রশাসনিক এই বিলম্ব শুধু আবেদনকারীদের ভোগান্তিই বাড়াচ্ছে না, বরং কোটি কোটি ডলারের জরিমানাও বছরের পর বছর আদায়হীন অবস্থায় পড়ে থাকছে। একই সঙ্গে এটি সিটির প্রশাসনিক জরিমানা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে।
অডিট প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২২ সালে একটি আবেদন নিষ্পত্তি করতে গড়ে ৯৪ দিন সময় লাগলেও ২০২৫ সালে সেই সময় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫২ দিনে। অর্থাৎ মাত্র তিন বছরের মধ্যে অপেক্ষার সময় প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে অনিষ্পন্ন আবেদনের সংখ্যায়। ২০২২ সালে যেখানে অপেক্ষমাণ আবেদন ছিল ২৩ হাজার ৯৬১টি, সেখানে বর্তমানে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৫১৪টিতে। অর্থাৎ অল্প কয়েক বছরের মধ্যে আবেদন জমে থাকার পরিমাণ প্রায় দশগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এত দীর্ঘ সময় ধরে আবেদন ঝুলে থাকলে জরিমানা ব্যবস্থার প্রতি নাগরিকদের আস্থা কমে যাওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনিক দক্ষতাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
শুধু পার্কিং নয়, রেড লাইট ক্যামেরা থেকে দেওয়া জরিমানার ক্ষেত্রেও একই ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি এই জরিমানাগুলোকেও প্রশাসনিক জরিমানা ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছে। সিটি কর্তৃপক্ষ রেড লাইট ক্যামেরা থেকে ২ কোটি ৫৪ লাখ ডলার রাজস্ব সংগ্রহ করলেও, ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত ১ লাখ ৩২ হাজার টিকিট এখনো অনিষ্পন্ন অবস্থায় রয়েছে। এসব টিকিটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থের পরিমাণ প্রায় ১ কোটি ৭৭ লাখ ডলার, যা এখনও আদায় বা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
অডিট প্রতিবেদনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পার্কিং জরিমানা ও সংশ্লিষ্ট ফি বাবদ মোট ৬৫ কোটি ৯৫ লাখ ডলার ইস্যু করা হয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ২১ কোটি ৫৮ লাখ ডলার, অর্থাৎ মোট অর্থের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ, এখনও অনাদায়ী রয়েছে। একই সময়ে প্রায় ২২ লাখ পার্কিং ও রেড লাইট ক্যামেরা জরিমানা প্রক্রিয়াকরণ করা হলেও আবেদন পর্যালোচনায় দীর্ঘসূত্রতার কারণে পুরো ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সিটি হল এখন প্রশাসনিক জরিমানা ব্যবস্থায় পরিবর্তনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। অডিট কমিটির চেয়ারম্যান কাউন্সিলর স্টিফেন হলিডে একই ধরনের আইন বারবার লঙ্ঘনকারী ব্যক্তিদের জন্য স্তরভিত্তিক বা ক্রমবর্ধমান জরিমানা কাঠামো চালুর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন। এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে টরন্টোর অডিটর জেনারেল টারা অ্যান্ডারসনের সুপারিশের ভিত্তিতে।
টারা অ্যান্ডারসন তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, গ্রেটার টরন্টো এলাকার ব্র্যাম্পটন ও মার্খামসহ কয়েকটি পৌরসভায় একই অপরাধ বারবার করলে ধাপে ধাপে জরিমানার পরিমাণ বাড়ানো হয়। তার মতে, এমন ব্যবস্থা চালু করলে নিয়মিত আইন ভঙ্গকারীদের নিরুৎসাহিত করা সম্ভব হবে এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর চাপও কমতে পারে।
বর্তমানে টরন্টোর প্রশাসনিক জরিমানা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ধীরগতির পর্যালোচনা প্রক্রিয়া। একটি আবেদন নিষ্পত্তি হতে যদি আট মাসের বেশি সময় লাগে, তাহলে নতুন আবেদন জমা হওয়ার হার পুরোনো আবেদন নিষ্পত্তির চেয়ে দ্রুত হয়ে পড়ে। ফলে প্রতি বছরই অনিষ্পন্ন আবেদনের সংখ্যা বাড়তে থাকে। অন্যদিকে, কোটি কোটি ডলারের জরিমানা দীর্ঘ সময় আদায় না হলে তা সিটির রাজস্ব ব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করে। একই সঙ্গে আইন ভঙ্গকারীদের মধ্যে এমন ধারণাও তৈরি হতে পারে যে, জরিমানার বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তি না হওয়ায় এর বাস্তব প্রয়োগ দুর্বল হয়ে পড়ছে।
অডিট কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, যদি পুনরাবৃত্ত অপরাধীদের জন্য কঠোর ও ধাপভিত্তিক জরিমানা চালু করা হয় এবং আবেদন নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া আরও দ্রুত করা যায়, তাহলে অনিষ্পন্ন আবেদনের সংখ্যা কমানো সম্ভব হতে পারে। তবে প্রশাসনিক সংস্কার, জনবল বৃদ্ধি, প্রযুক্তিনির্ভর প্রক্রিয়া এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ছাড়া বর্তমান জট নিরসন সহজ হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এখন সিটি কাউন্সিলের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে টরন্টোর প্রশাসনিক জরিমানা ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয়।
রেজাউল হক : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার
