
কানাডার কুইবেক প্রদেশের লানোদিয়ের অঞ্চলে একটি পোকেমন কার্ডের স্টোরে সংঘটিত সশস্ত্র ডাকাতির ঘটনা স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি সংগ্রাহক মহলেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ, সাধারণ দোকান ডাকাতির মতো নগদ অর্থ লুট নয় ডাকাতের মূল লক্ষ্য ছিল বিরল ও উচ্চমূল্যের পোকেমন সংগ্রহ। আরও অবাক করার বিষয়, অস্ত্রের মুখে ডাকাতি চালানোর পর স্টোর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় অভিযুক্ত ব্যক্তি শান্তভাবে “ধন্যবাদ, শুভ রাত্রি” বলে বিদায় নেয়। ঘটনাটি ঘটে গত ১৮ জুন, মন্ট্রিয়ল থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত সেইন্ট-অ্যালেক্সিস এলাকার মিসিংনো স্টোরে। দোকানটি মূলত পোকেমন কার্ডসহ বিভিন্ন সংগ্রহযোগ্য গেমিং সামগ্রী বিক্রির জন্য পরিচিত।
স্টোরের নিরাপত্তা ক্যামেরার ভিডিওতে দেখা যায়, এক ব্যক্তি দোকানের ভেতরে ঢুকে স্বাভাবিকভাবে চারপাশে ঘুরে দেখছেন। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি হাতে থাকা আগ্নেয়াস্ত্র বের করেন এবং স্টোরের সহ-মালিক ও উপস্থিত ক্রেতাদের ভয় দেখিয়ে সবাইকে দাঁড়িয়ে থাকতে নির্দেশ দেন। সহ-মালিক জঁ-ফ্রাসোয়াঁ হেতু ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন এটি একজন সাধারণ ক্রেতা। তিনি এগিয়ে গিয়ে সাহায্যের প্রস্তাব দিতেই লোকটি অস্ত্র বের করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়। তার ভাষায়, ডাকাতের উদ্দেশ্য শুরু থেকেই পরিষ্কার ছিল। তিনি নগদ টাকা বা ক্যাশ কাউন্টারের দিকে একবারও নজর দেননি। বরং সরাসরি মূল্যবান ও বিরল সংগ্রহযোগ্য পোকেমন কার্ড খুঁজতে শুরু করেন।
ডাকাত একটি বড় হকি ব্যাগ সঙ্গে করে এনেছিল। দোকানের তাক থেকে একের পর এক মূল্যবান সংগ্রহ সেই ব্যাগে ভরতে থাকে। স্টোর কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৩০ হাজার কানাডিয়ান ডলার মূল্যের পণ্য নিয়ে সে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। সবচেয়ে বিস্ময়কর মুহূর্তটি আসে দোকান ছাড়ার ঠিক আগে। অস্ত্র হাতে রেখেই দরজার দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় সে উপস্থিত সবাইকে উদ্দেশ করে বলে, “ধন্যবাদ। শুভ রাত্রি।” এই অস্বাভাবিক আচরণ পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
অনেকেই হয়তো এমন পরিস্থিতিতে জীবন বাঁচাতেই ব্যস্ত থাকতেন। কিন্তু ডাকাত বেরিয়ে যাওয়ার পর স্টোরের দুই মালিক জঁ-ফ্রাসোয়াঁ হেতু এবং চার্লস ব্রুল্ট-পারিসো অভিযুক্তকে পুরোপুরি পালিয়ে যেতে দেননি। দুজনই বেজবল ব্যাট হাতে দোকান থেকে বেরিয়ে ডাকাতের গাড়ির দিকে ছুটে যান। তারা গাড়ির পেছনের লালবাতি এবং যাত্রীর পাশের জানালা ভেঙে দেন। চার্লস ব্রুল্ট-পারিসো পরে জানান, তাদের উদ্দেশ্য ডাকাতকে আক্রমণ করা ছিল না। বরং গাড়িটিতে এমন দৃশ্যমান ক্ষতি করা, যাতে পুলিশ সহজেই সেটিকে শনাক্ত করতে পারে। তার এই কৌশল শেষ পর্যন্ত অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়।
স্টোর মালিকদের দেওয়া তথ্য এবং ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ির বর্ণনার ভিত্তিতে পুলিশ দ্রুত অভিযান শুরু করে। ঘটনার মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যেই ড্যানি এল-আওয়ার নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে এই সশস্ত্র ডাকাতির ঘটনায় তিনটি পৃথক অভিযোগ আনা হয়েছে। এছাড়া তদন্তে জানা গেছে, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে সংঘটিত আরও কয়েকটি ডাকাতির ঘটনার সঙ্গেও তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পোকেমন কার্ডের আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কয়েক গুণ বেড়েছে। বিরল সংস্করণের কিছু কার্ড নিলামে হাজার হাজার এমনকি লাখো ডলারে বিক্রি হচ্ছে। ফলে এই ধরনের সংগ্রহ এখন শুধু শখের বস্তু নয়, বরং উচ্চমূল্যের বিনিয়োগ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। এ কারণেই সংগ্রহযোগ্য কার্ডের দোকানগুলো ক্রমেই অপরাধীদের নজরে আসছে। নগদ অর্থের বদলে সহজে বহনযোগ্য এবং দ্রুত বিক্রিযোগ্য এসব সংগ্রহ এখন সংঘবদ্ধ অপরাধীদের নতুন লক্ষ্য হয়ে উঠছে।
এই ঘটনার পর কুইবেকের বিভিন্ন সংগ্রহযোগ্য সামগ্রীর দোকানের মালিকরা নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করার বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছেন। অনেকেই উন্নতমানের নজরদারি ক্যামেরা, অতিরিক্ত নিরাপত্তাকর্মী এবং মূল্যবান সংগ্রহের জন্য পৃথক সুরক্ষিত প্রদর্শনী ব্যবহারের পরিকল্পনা করছেন। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও ব্যবসায়ীদের সতর্ক থাকার এবং সন্দেহজনক আচরণ দেখলে দ্রুত পুলিশকে জানানোর আহ্বান জানিয়েছে। পোকেমন কার্ডের মতো সংগ্রহযোগ্য সামগ্রীর জনপ্রিয়তা যত বাড়ছে, ততই এসব ব্যবসাকে ঘিরে নিরাপত্তা ঝুঁকিও বাড়ছে। সেই প্রেক্ষাপটে সেইন্ট-অ্যালেক্সিসের এই ঘটনা শুধু একটি ডাকাতির খবর নয়; বরং সংগ্রহযোগ্য সামগ্রীর বাজারে ক্রমবর্ধমান অপরাধপ্রবণতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে।
