
আমার জীবনসঙ্গী একজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। দুর্গম প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষকতা করেন। শহুরে আরাম-আয়েশ ছেড়ে দুর্গম অঞ্চলে কষ্ট করে কেউ শিক্ষকতা করতে চায় না। সবাই দুই-তিন মাস না যেতেই বদলির তদবির করে শহরে চলে আসেন। সেখানে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর শিক্ষকতা করা অনেক কঠিন। তাঁর পক্ষে এটা সম্ভব হয়েছে শিক্ষকতার প্রতি নিষ্ঠা ও ভালোবাসার জন্য। আমি মুগ্ধ।
তাঁর চাকরিজীবনের শুরুতে বলেছিলাম, প্রতিদিন ক্লাসে পাঠদানের বাইরেও শিক্ষার্থীদের গল্পে গল্পে জীবন-জগৎ সম্পর্কে ধারণা দিতে। তাঁর গানের কণ্ঠ মন্দ নয়। বলেছিলাম, মাঝে মাঝে ক্লাস শেষে বাচ্চাদের দেশের গান ও রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে শোনাতে। শিক্ষিকার দেখাদেখি ওরা যেন গানের প্রতি উৎসাহিত হয়। সম্ভব হলে গানের সাথে নাচের কিছু মুদ্রা দেখাতে, যেন তা দেখে ওরা নিজেরাই মনের আনন্দে নাচবে ও গাইবে।
উনি সবসময় চেষ্টা করেন শিশুদের আনন্দের সাথে পাঠদান করতে এবং পড়ার প্রতি শিশুদের আগ্রহ তৈরি করতে। সীমান্তবর্তী দুর্গম অঞ্চলে অভাব-অনটনের কারণে পরিবারগুলো বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাতে আগ্রহী হয় না। সেখানে শিশুরা বাবা-মাকে কৃষিকাজসহ নানান কাজে সাহায্য করে। এমন একটি অঞ্চলে স্কুল টিকিয়ে রাখাই মুশকিল। ক্লাস ওয়ান থেকে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত ছাত্রছাত্রী খুব একটা নেই। কোনো কোনো ক্লাসে ১৫ থেকে ২০ জন, তাও আবার নিয়মিত উপস্থিতির হার খুবই নগণ্য। এরকম একটি অঞ্চলের স্কুলে বাচ্চারা নাকি ক্লাসে উপস্থিত হয় তাদের প্রিয় আপা বা প্রিয় মাস্টারনির জন্য। আমি যতদূর শুনেছি, এটা সম্ভব হয়েছে নিয়মিত পাঠ্যক্রমের বাইরে ম্যাডামের এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজের (দেশ-বিদেশের গল্প বলা, গান, আবৃত্তি ও খেলা) জন্য। ম্যাডাম যেদিন স্কুলে উপস্থিত থাকেন সেদিন সব শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতির হার অনেক বেশি হয়।
সারা দেশের প্রাইমারি বিদ্যালয়গুলোতে শুধু পাঠদান কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের স্কুলে উপস্থিতির হার বৃদ্ধি করবে না। তাদের জন্য নানান এক্সট্রা অ্যাক্টিভিটিজ নিশ্চিত করতে পারলে প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধ করা সম্ভব হবে।
শিশুদের পাঠদান হোক আনন্দের।
