
অটোয়া সম্প্রতি এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে। কানাডার আন্তঃপ্রাদেশিক বাণিজ্য চুক্তি বা কানাডিয়ান ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট (সিএফটিএ)-এর অধীনে বিদ্যমান ফেডারেল ব্যতিক্রমগুলোর এক-তৃতীয়াংশ বাতিল করার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধু ব্যবসার পরিবেশকে আরও সহজ করবে না, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও নতুন গতি আনবে।
কানাডা বরাবরই বৈশ্বিক মুক্ত বাণিজ্যের প্রবল সমর্থক। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে একাধিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি রয়েছে তাদের। তবু নিজেদের ভেতরে, অর্থাৎ এক প্রদেশ থেকে আরেক প্রদেশে ব্যবসা করতে গিয়ে উদ্যোক্তাদের নানা নিয়মকানুন ও জটিল সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে হতো।
নির্মাণ খাত থেকে শুরু করে কৃষি, পরিবহন, জ্বালানি এবং সরকারি টেন্ডার প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই ছিল প্রশাসনিক বাঁধা।
এর ফলে কানাডার অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য প্রতিবছর প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থনৈতিক কার্যক্রম জড়িত থাকা সত্ত্বেও পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারছিল না।
টরন্টো বাংলা টাউনকে একজন অর্থনীতিবিদ জানান, দীর্ঘদিনের অভিমত যদি এসব প্রতিবন্ধকতা পুরোপুরি দূর করা যায়, তবে কানাডার জিডিপি দীর্ঘমেয়াদে ১ থেকে ২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।
অটোয়ার ঘোষণার ফলে শত শত কোটি ডলারের সরকারি প্রকল্প এখন দেশজুড়ে ব্যবসায়ীদের জন্য উন্মুক্ত হলো। আগে যেখানে নির্দিষ্ট কিছু প্রদেশভিত্তিক কোম্পানি অগ্রাধিকার পেত, এখন প্রতিযোগিতা হবে আরও সমান ভিত্তিতে। উদাহরণস্বরূপ, অন্টারিওর একটি নির্মাণ কোম্পানি সহজেই ব্রিটিশ কলাম্বিয়া বা আলবার্টার সরকারি টেন্ডারে অংশ নিতে পারবে। কুইবেকের কোনো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান সাসকাচুয়ান বা ম্যানিটোবার প্রকল্পেও সমানভাবে প্রতিযোগিতা করতে পারবে। এতে ব্যবসায়ীরা যেমন নতুন বাজার পাবেন, তেমনি প্রাদেশিক প্রকল্পগুলোর মান উন্নত হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়বে, কারণ প্রতিযোগিতা হবে আরও স্বচ্ছ ও বিস্তৃত।
কানাডিয়ান চেম্বার অব কমার্স এ সিদ্ধান্তকে “এক নতুন দিগন্ত” আখ্যা দিয়েছে। তাদের ভাষায় “আগে প্রাদেশিক সীমানা যেন অদৃশ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়াতো, এখন সেটি অনেকটাই দুর্বল হলো। ব্যবসার জন্য এর চেয়ে সুখবর আর কিছু হতে পারে না।” বেসরকারি খাতের অনেক উদ্যোক্তাও মনে করছেন, এই সংস্কার তাদেরকে নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনায় উৎসাহিত করবে।
তবে সব দিক থেকেই এই পরিবর্তন ইতিবাচক হবে এমনটা বলছেন না সবাই। সমালোচকরা সতর্ক করেছেন, এখনও বহু ব্যতিক্রম বহাল আছে। বিশেষ করে প্রাদেশিক সরকারগুলো তাদের নিজস্ব নীতি ও স্থানীয় শিল্প রক্ষার কৌশল বজায় রেখেছে, যা ব্যবসার স্বাধীনতাকে পুরোপুরি মুক্ত করতে পারছে না। অর্থাৎ, শুধু ফেডারেল স্তরে নয়, প্রাদেশিক স্তরেও একই ধরনের সংস্কার প্রয়োজন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পদক্ষেপ কানাডার অভ্যন্তরীণ বাজারকে শুধু সক্রিয় করবে না, বরং জাতীয় ঐক্যকেও শক্তিশালী করবে। যখন অন্টারিও থেকে আলবার্টা কিংবা কুইবেক থেকে ম্যানিটোবা পর্যন্ত ব্যবসার প্রবাহ স্বচ্ছন্দ হবে, তখন অর্থনৈতিক সংহতি রাজনৈতিক ও সামাজিক সংহতিকেও প্রভাবিত করবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, অটোয়ার এই সিদ্ধান্ত কানাডার অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এটি দেখিয়ে দিলো দেশটি শুধু বৈশ্বিক বাজারেই নয়, নিজেদের ঘরোয়া বাজারকেও এখন সমান গুরুত্ব দিচ্ছে। যদিও পথ এখনও দীর্ঘ, তবে প্রথম ধাপটি নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক।
