আড়াল

আড়াল

ঢাকায় থাকতে সপ্তাহে দুই-তিনদিন দেখা না করে থাকতে পারত না আবির। একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে দুই বছর হলো জয়েন করেছে। লাবনীর সাথে ওর পরিচয় হয় একটা বিয়ে বাড়িতে। আম্মুর মামাতো ভাইয়ের মেয়ের বিয়ে ছিল সেদিন। কনের পাশে সোনালি লেহেংগা পরা লাবনীকে প্রথম দেখাতেই ভালোবেসে ফেলেছিল। তারপর নানান কায়দা কসরত করে ওর মোবাইল নম্বরটা যোগাড় করতে পারে সে। কথা হয়, দেখা করে। আর তারপর আট মাস ধরে প্রেম।

“পাক্কা দুই সপ্তাহ পরে আমাকে দেখতে এলে। কথায় আছে না, চোখের আড়াল হলেই মনের আড়াল হয়ে যায়। তুমি তো পরে দেখা যাবে, আমাকে ভুলেই গেছো।“

- Advertisement -

লাবনীর কথায় আহত চোখে তাকালো আবির। প্রেমিকার কিনে দেওয়া নীল টি শার্ট পরে আছে সে। চশমাটা খুলে কাচ মুছতে মুছতে উত্তর দেওয়ার প্রস্তুতি নিলো বেশ খানিক্ষণ ধরে।

“চোখের আড়াল হওয়ার ব্যবস্থাটা আমি করেছি না কি তুমি করেছো, বলো তো?”

“বা রে! তো আমাকে কি ডাক্তার হতে হবে না?”

“ডাক্তার তো হবেই। কিন্তু তুমিই সিদ্ধান্ত নিয়েছো, ডাক্তার হতে হলে আমাকে ছেড়ে দূরদেশে এসে থাকতে হবে। অফিস ফাঁকি দিয়ে ফরিদপুরে আসার উপায় আছে?”

“তোমার অফিসটাই বা এমন অদ্ভুত কেন? রবিবার ছুটি। আর যেদিন ছুটি সেদিন তো অন্তত আসতে পারো। ঢাকা থেকে ফরিদপুর আসতে কতক্ষণই বা লাগে?”

“তাই? তুমি জানো, আমি লঞ্চে চড়তে ভয় পাই। সাঁতার জানি না। ফেরী ঘাটের বিশাল জ্যাম পাড়ি দিয়ে আসতে আর যেতে অনেকটা সময় চলে যায় লাবনী। আর রবিবার অনেক পেন্ডিং কাজও সেরে রাখতে হয়। আমি তো তাও মাসে দুইবার আসার চেষ্টা করছি, তাই না?”
এভাবেই খুনসুটি করতে করতে দুপুর গড়িয়ে যায়। মেডিকেল কলেজের পাশেই মামার হোটেলের গরুর মাংস বেশ বিখ্যাত। সেখানে লাঞ্চ করে ওরা চলে গেল তেঁতুলতলায় রসগোল্লা খেতে। তেঁতুলতলা আর বাঘাটের মিষ্টি ফরিদপুরে খুব নামকরা।

সন্ধ্যেবেলা লাবনীকে হোস্টেলে নামিয়ে দিতে এলো আবির।

“আবার কবে আসবে?” হুট করেই বুকের ভেতর কেমন শুন্য অনুভব হলো লাবনীর।

“খুব শীগগির আসব। তুমি পড়াশোনায় মনোযোগ দাও”।

আধো অন্ধকারেই প্রেমিকার হাতটা খুঁজে নিজের মুঠোয় পুরে নিয়ে বলল আবির।

লাবনী আবেগ সামলাতে পারল না। আচমকা প্রেমিককে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে ফেলল।

“আহ! লাবনী! এটা তোমার হোস্টেল। কেউ দেখে ফেলবে। চোখ মোছো তো।“

লাবনীর কানের কাছে ফিসফিস করল আবির। বলল বটে, কিন্তু নিজেই আর নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারল না। প্রেমিকার কানের লতিতে হালকা কামড় দিয়ে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে রইল কিছুক্ষণ।

কয়েক মুহূর্ত পর সম্বিত ফিরতেই নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো লাবনী। ভয়ে ভয়ে আশেপাশে তাকালো; কেউ দেখে ফেলল না তো আবার?

একটু দূরে দারোয়ান চাচার ঘরে আলো জ্বলছে। বাইরের ঘন অন্ধকারে আর কাউকে দেখতে পেল না ওরা।

“আচ্ছা, আমি আসি এখন। ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করো”।

আবিরের চোখও ছলছল করছে।

নাহ, বাসায় যেভাবেই হোক, এবার লাবনীর ব্যাপারে জানাতেই হবে। পরের বার বিয়ের দিন, তারিখ ঠিক করে তবেই আসবে ফরিদপুরে।
*****
২০৭ নম্বর রুমে রাজ হোটেল থেকে চারটা খিচুড়ির বাক্স এসেছে। পঁচিশ টাকা করে দাম। স্পন্সর করেছে আবির। হোস্টেলের মেয়েরা ফোন দিলেই রাজ হোটেল থেকে খাবার চলে আসে। রাতে তাই বাইরে যাওয়ার ভয় নেই।

সকালেই আবিরের সাথে দেখা হয়েছিল সিনথিয়া, মিতু আর জেরিনের। তখনই খাওয়ানোর আবদার করেছিল। কিন্তু ফিজিওলজি আইটেম থাকায় টিউটোরিয়াল ক্লাসে চলে যেতে হয় ওদের। আজ অবশ্য লাবনী আইটেম মিস করেছে। ডিসেকশন ক্লাসের পরপরই আবিরের সাথে বের হয়ে গিয়েছিল সে।

ডিনার প্রায় শেষ, ঠিক ঐ সময় দরজায় নক করে মাথা বাড়িয়ে উঁকি দিলো ক্লাস ক্যাপ্টেন সানজানা।

“ডাইনিং এ মিটিং ডেকেছে সিনিয়র

আপুরা। পনের মিনিটের মধ্যে সবাই নিচে যাবি”।

সানজানাকে কিছু জিজ্ঞেস করতে যাওয়ার আগেই সে যেরকম হুট করে উঁকি মেরেছিল ঠিক সেভাবেই আচমকা গায়েব হয়ে গেল।

“কে, কী আকাম করল আবার; এই এত রাতে মিটিং ডেকেছে? গত সপ্তাহেই না র্যা গ দিলো ওনারা? আশ্চর্য!” আংগুল চেটে আচার খেতে খেতে বলল জেরিন।

“উফ, আর ভালো লাগে না। কালকে লাংস আইটেম আছে। কিচ্ছু পড়িনি আমি! এখন এই মিটিং শুরু হলে সারা রাত পার করে দেবে তো!” আতংকিত কণ্ঠে বলল সিনথিয়া।

লাবনী উঠে গিয়ে প্লেট ধুয়ে এলো। কালকের লাংস আইটেমও মনে হয় তার দেওয়া হবে না। আবিরের জন্য মন কান্না করছে।

পনের মিনিটের মধ্যে ফার্স্ট ইয়ারের ৪৮ জন মেয়ে হোস্টেলের ডাইনিং হলে জড়ো হলো। ওখানে আগে থেকেই সিনিয়ররা এসে বসে আছে। তাদের সবার চোখেমুখে বিরাট কাঠিন্য ফুটে আছে। ফার্স্ট ইয়ারদের অবশ্য দাঁড়িয়েই থাকতে হবে পুরো মিটিং এ।
“সানজানা, সবাই এসেছো তোমরা?”

গমগমে কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন মাহিন আপু।

“জি আপু।“ দুই হাত পেছনে রেখে সানজানা এমনভাবে মিনমিন করল যেন সে ফাঁসির আসামী!

“যাই হোক, ভণিতা না করে বলেই ফেলি। তোমাদের মতো মেয়েদের জন্য বেশিক্ষণ সময় নষ্ট করতে পারব না।“

মাছি তাড়ানোর মতো ভংগি করলেন মাহিন আপু।

“তোমাদের কাছে হাত জোড় করে মিনতি করছি, আমাদের

কে মানুষের সামনে বেইজ্জতি করো না। তোমাদের মধ্যে একজন আজ যা করলে; সেটা দেখে লজ্জায় আমরা মুখের ভাষা হারিয়ে ফেলেছি!”

মাহিন আপুর কথা শুনে দাঁড়িয়ে থাকা কিশোরীদের মধ্যে গুণগুন শব্দ শুরু হয়ে গেল। এ ওর দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাতে লাগলো। কে, আবার কী করল?

“এই চুপ! লজ্জা-শরম নেই, আবার কথা বলছে!”

ডান পাশ থেকে চিৎকার করে উঠলেন রূম্পা আপু………… মাহিন আপুর রুমমেট। লাবনীর মনে পড়ল, এই আপুই তার কাছ থেকে নেটার’স এটলাস টেক্সট বইটা ধার নিয়েছিল গত সপ্তাহে। এখনো ফেরত দেননি।

“সঙ্গত কারণেই আমরা নাম প্রকাশ করছি না। তবে কাজটা যে করেছো, সে এখানেই আছো এবং তাকেই বলছি, ফারদার এমনকিছু যদি হোস্টেল কিংবা কলেজের আশেপাশেও করতে দেখি, ওই মেয়ের গার্জিয়ান এবং প্রিন্সিপাল স্যারকে জানাতে বাধ্য হব আমরা”।

চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন রাফা আপু। র্যা গ দেওয়ার সময় ঘুরেফিরে এই তিন-চারজনই বকা দেন। বাকি আপুরা এমনভাবে জুনিয়রদের দিকে তাকিয়ে থাকেন; মনে হয় যেন চোখের আগুনে ঝলসে দেবেন যেকোনো মুহূর্তে!

আচমকা ডাইনিং হলে নেমে এসেছে পিনপতন নীরবতা।

“আজ সন্ধ্যায় ছাদ থেকে হোস্টেলের পেছনের গেটে, ফার্স্ট ইয়ারের একজনের সাথে তার বয় ফ্রেন্ডকে অপ্রীতিকর অবস্থায় দেখে ফেলেছি আমরা! প্রেমিকের সাথে তোমার যা ইচ্ছে করতে মন চায়; হোটেলে রুম ভাড়া নিয়ে করলেই পারো! হোস্টেলের পাশে দাঁড়িয়ে কেন, বাপু! ছি ছি ছি! এটাই লাস্ট ওয়ার্নিং। আর যেন কখনো এমনটা না দেখি।“

মাহিন আপুর কথায় যেন পুরো রুমে বোমা ফাটল! সিনথিয়া, মিতু আর জেরিন তো বটেই; ক্লাসের আরো অনেকেই জানে, আজ ঢাকা থেকে লাবনীর বয়ফ্রেন্ড এসেছিল। উনি যে ওকে হোস্টেল পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে গেছেন; তা-ও আবার সন্ধ্যেবেলায়; এটাও দেখেছে কেউ কেউ।
ওদের কারো আর বুঝতে বাকি রইল না। আপুরা লাবনীর সাথে আবিরকেই দেখেছে অপ্রীতিকর অবস্থায়।

হলরুমের সবার দৃষ্টি নিজের উপর নিবদ্ধ হতে দেখে টনক নড়ল লাবনীর। আচমকা এক রাশ লজ্জার চাদর যেন আষ্টেপৃষ্ঠে ঢেকে দিলো তার চারপাশ। চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসছে ক্রমশ।

ঘরভর্তি মানুষের সামনে থেকে এক ছুটে চলে এলো সে সিঁড়ি ঘরে। এ ঘটনার সাথে জড়িত কে; যারা সেটা জানত না………… লাবনীর চলে যাওয়া দেখে তারাও বুঝে ফেলল সবকিছু।

এক একবারে দুই-তিন ধাপ পাড়ি দিয়ে সে ফিরে এলো দোতলায় নিজেদের ২০৭ নম্বর রুমে। সব মেয়ে জেনে ফেলেছে আজ। ছেলেদের হোস্টেলেও এই রসালো সংবাদ পৌঁছাতে খুব বেশিক্ষণ লাগবে না আর, জানে সে। হয়তো এরপর কলেজের শিক্ষকদের মাঝেও ছড়িয়ে যাবে এ কথাগুলো।

লজ্জার সাথে আতংক জেঁকে ধরল তাকে। বাবা-মা থেকে অনেক দূরে এই বিদেশ বিভূঁইয়ে ভয়ে থরথর করে কেঁপে উঠল সে। সবকিছু দেখে ফেলেছে ওরা। হাতে হাত রাখা, জড়িয়ে ধরা, চুমু খাওয়া! আগামী দিনগুলোর কথা চিন্তা করতে করতে দরজা লক করে দিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল লাবনী।

- Advertisement -

Read More

Recent