ব্যাড টাচ্

ব্যাড টাচ্

স্নেহা অনেকক্ষন ধরে লোকটার দিকে অপলক তাকিয়ে ছিলো, কতোক্ষন ঠিক মনে নেই ,পঞ্চাশ উৰ্ধ্ব একটু থলথলে কালচে শ্যামবৰ্ণ লোকটা, মুখে কাঁচা-পাকা দাড়ি, বাম গালের উপরে একটা তেছড়া কাটা দাগ, মুখে বসন্তের দাগ, মাথার চুশগুলো বেশ রক্ষু, লোকটা একটা চৌকির উপরে পা ঝুলিয়ে বসে আছে, স্নেহা ওর সামনে দাড়িয়ে আছে,ওর বেশ উজ্জল বৰ্ণ গায়ের রং,মাথার চুলগুলো ঝলমলে কালো, কিছুটা গালের দুপাশে এসে পড়ছে পেছনে বাঁধা পনিটেলে নাগাল না পেয়ে, মুখে কোন প্ৰশাধনী নেই, চোখে কাজল দেয়া, এই গরমে এই ঘরের গুমোট পরিবেশে কিছুটা থ্যাবরে গেছে, তাতে করে ওর সারামুখে কেমন যেন এক মায়াময় দূত্যি ছড়াচ্ছে, তাছাড়া ওর মুখটা এমন মায়াময় কেউ দু’বার না তাকিয়ে পারে না ,এতে করে স্নেহার অস্বস্তি বেড়ে যায়।খুব সাধারণ একটা সুতির সাদা রংয়ের শালোয়ার কামিজ পড়ছে, একটা শিফনের উড়না বুকের বামপাশে ঝুলানো ,এতে করে ডান কাঁধের ভেতরে সাদা কামিজের ভেতরে ওর কালো রংয়ের ব্ৰা দেখা যাচ্ছে, লোকটা কিছুক্ষন সেখানে তাকিয়ে এবার স্নেহার দিকে চোখ ফেরালো, ঘরে এই সময়ে কেউ নেই , টিনের চাল ,চারিদিকে পাকা দেয়াল, কিন্তু এখানে সেখানে পলেস্তরা খসা, এখানে আদৌ যে কোন রং ছিলো সেটা বলা মুস্কিল। দরজাটা আধা ভেজানো, স্নেহা আধো খোলা দরজার দিকে তাকিয়ে থেকেও বুঝতে পারছে লোকটার ওর শরীরের প্ৰতিটি আনাচে কানাচে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে, এবার স্নেহার দিকে চোখে চোখ পড়তেই বললো, ” এইবার কাজের কথায় আহেন ?”

স্নেহা এবার খুব গভীর ভাবে লোকটার দিকে আপাদমস্তক তাকিয়ে বললো,” আমাকে কি চেনা চেনা লাগছে?”

- Advertisement -

লোকটা ঠিক বুঝতে না পেরে বললো, ” আপনারে চেনার লগে কামের কি সম্পৰ্ক, কাম করমু পয়সা দিবেন ।”

স্নেহা এবার লোকটার কাছে ঝুকে এসে বললো,

” তিরিশ বছর আগের কোন গল্প মনে পড়ে তোমার?

তুমি তখন সদ্য যুবক , মনে পড়ে কিছু? ”

—” আরে কি কইবার লাগছেন, আমার কাজের লগে এই তিরিশ বছর আগের গল্পের মানে কি ? আপনারে এর আগে দেখছি বইল্যা তো মনে হয় না?”

—” তিরিশ বছর আগে আমি তো এমন ছিলাম না, ছিলাম এক বালিকা, এবার মনে পড়ছে কিছু, ঐ যে বিকেল বেলা মোড়ের দোকান থেকে চটপটি নিয়ে ফিরছিলাম, মনে পড়ে ?

এবার লোকটাকে কিছুটা বিভ্ৰান্ত মনে হলো, স্মৃতির গলিতে হয়তো হাড়িয়ে যাচ্ছে কিছু স্মৃতি খোঁজার জন্য,হাতড়ে বেড়াচ্ছে ….বেড়াক, স্নেহার এখন কিছুটা সময় দরকার, কিছুটা, যাতে করে লোকটার মস্তিষ্কের সাথে খেলাটা জমে উঠে, অনেক, অনেক দিনের কষ্ট স্নেহা বুকের ভেতরে পুষে রেখেছে, আজকে সেইদিন সামনে, শুধু একটা কঠিন প্ৰতিশোধের অপেক্ষায়, সেদিনের সেই বালিকা শুধু ভয়ে কুকড়ে গিয়েছিলো, আজকের স্নেহা এক পরিপূৰ্ণা নারী, যদিও দেখতে সদ্য যুবতীর মতো লাগছে ।

এবার স্নেহা ধমকের সুরে বল্লো, ” কি হ’লো তিরিশ বছর আগের কোন গল্পই মনে নেই? মনে নেই যখন তখন ব্যস্তভাবে হাটার অভিনয় করতে যেয়ে ছোট্ট ছোট্ট মেয়েগুলোকে কি বিশ্ৰীভাবে ছুয়ে দিতি ? মনে নেই কিছু তোর? ক’তো গুলো বাচ্চাকে এভাবে ছুয়েছিলি যে মনে করতে পারছিস না ? ”

এতটুকু কথা বলে স্নেহা কাঁপছে,কখন যে তুমি থেকে তুই এ নেমে এসেছে ও নিজেই জানে না, ওর গালে ঘামের সাথে একটা লালচে আভা এসে ছূঁয়েছে, সেই আভায় স্নেহা চলে যায় ওর ন’বছর বয়সে, এটা এমন একটা বয়স কিছু বুঝে না, জানে না, কোনটা নোংরা, কোনটা কুৎসিত বুঝতে পারে না, জীবন সম্পৰ্কে উপলব্ধি বোধ জাগ্ৰত হবার বয়স না ,চারপাশে যা দেখে সব সুন্দর, পৃথিবীর মানুষেরা এতো খারাপ হয় তা জানে না, মানুষের মন এতোটা নীচু হয় তা জানে না , কোন নারীর শরীর দেখলে পুরুষের বিশ্ৰী কামবোধ জাগ্ৰত হয় সেসব সম্পৰ্কে কোন ধারনা নেই, বাড়ীতে মা -বাবা,ভাই-বোনদের সাথে সম্পৰ্কগুলোকে যেমন নিবির মনে হতো বাইরের পৃথিবীর মানুষের সাথেও বুঝি তেম্নি সম্পৰ্ক, আসলে তা নয়, সেই প্ৰথম এই নিস্পাপ বালিকা বুঝতে পারে বাড়ীর বাইরের পৃথিবীটা ভীষন বিপদজনক।

সেবার গ্ৰীষ্মের ছুটিতে মা আর দু’ভাই বোনের সাথে দাদু বাড়ীতে বেড়াতে এসেছিলো, বাবা বলেছে , ছুটি শেষের আগে এসে নিয়ে যাবে। স্কুল বন্ধ তাই দাদু বাড়ীর মজাই আলাদা, বড় চাচ্চুর দু মেয়ে নীলি আর ঝিলি আপু ,নীলি আপু মোটে কলেজে যাচ্ছে, ঝিলি আপু এবার নাইনে উঠবে, আর অপুভাই মোটে এইটে পড়ে, একটু হালকা গোঁফ উঠছে ঠোঁটের উপরে, চুলের কাটে একটু ষ্টাইল মারে, আগের মতো ঝগড়া হলে স্নেহার চুল টেনে ধরে না । ছোট চাচ্চু এবার মাৰ্স্টাস দিবে, রাতের দিকে বাড়ী ফেরে , দু ‘ ফুপুর বিয়ে হয়ে গেছে বনেদী পরিবারে।

স্নেহার দাদুর বাড়ীটা পুরানো ঢাকার টিপুসুলতান রোডে, বিশাল দোতলা বাড়ী, বাইরে থেকে বুঝা যায় না , মোড় থেকে সোজা গলিতে এসে গেট দিয়ে ঢুকলে বিশাল লোহার গেট, গেট খুললেই সামনে পাকা উঠোন, তার পাশে রান্না ঘর, তার পাশে বিশাল দশ চেয়ারের ডাইনিং টেবিল, যখন ফুপুরা আসে ঈদে কিংবা কোন অনুষ্ঠানে তখন আরেকটা টেবিল জোড়া লাগিয়ে সবাই মিলে গল্পে গল্পে খাওয়া আর শেষ হয়না, নীচে বিশাল বৈঠকখানা, সবাই মিলে একসাথে টিভি দেখা, উপরে ছিলো চারটা বিশাল শোবার ঘর, আর চিলেকোঠার ঘরটাতে ছোট কাকু থাকতো। বিকলে নীলি- ঝিলি আপুর সাথে ছাদে উঠতো, আশে পাশের বাসার ছাদে কিছু ছেলে ঘুড়ি উড়াতে উঠতো, একবার একটা ছেলে চিঠি ছুঁড়ে ছিলো স্নেহার গায়ে, স্নেহা উঠে তাকাতেই হাত দিয়ে দেখালো নীলি আপাকে দেবার জন্য ।

নীলি আপা পড়ে বলেছিলো, কেউ কিছু দিলে কক্ষনো নিবি না, স্নেহা শুধু দুবেনী ঝুলিয়ে মাথা নেড়েছিলো।

তো সেদিন হলো কি ? স্নেহা আপুদের সাথে ছাদে, ওদের বিশাল গোলাপ বাগান ছিলো পুরো ছাদ জুড়ে, নীচে মা চাচী দিদার ঘরে গল্প করছে, ছোট্ট বোন রিম্পি মায়ের আশে পাশে ঘুরঘুর করছে। ও মোটে চার বছরের তাই ছাদে আসা বারন, ভাই রিংন্কু গেছে অপুভাইয়ের সাথে সামনের মাঠে বল খেলতে। এমন সময় নীচে চটপটি ওয়ালা তার ভ্যান নিয়ে যাচ্ছে , নীলি আপু বললো, “কে কে খাবি?”

স্নেহা আর ঝিলি আপু সমস্বরে বলে উঠে, “আমরাও খাবো?”

কিন্তু কথা হলো কে যেয়ে চটপটি নিয়ে আসবে, আপুদের যাওয়া বারন, মতির মা দুপুরে খেয়ে তার মেয়ের বাড়ীতে গেছে, মা আসায় আজকের রাতের জন্য ছুটি পেয়েছে দিদার কাছ থেকে, বাতেন কাকু বাড়ীর অনেক পুরানো মানুষ,সেই দাদুর বিয়ের পর থেকে এ বাড়ীতে আছে, একদম নিজের মানুষের মতো, দাদু ওকে নিয়ে গেছে বাজারে খাসির গোশত কিনতে আজ রাতে মা বিরিয়ানী বানাবে কারন সন্ধ্যায় ছোট ফুপি আসবে ফুপাকে নিয়ে, মায়ের হাতের বিরিয়ানী এ বাড়ীর সবার বেশ প্ৰিয়।

যাইহোক কাউকে না পেয়ে নীলি আপু বল্লো, এই স্নেহা ঐ দেখ চটপঠিওয়ালা চলে যাচ্ছে, আমি উপর থেকে ডেকে থামাচ্ছি, তুই আমার ব্যাগ থেকে টাকা নিয়ে বড় একটা বাটি নিয়ে আমাদের জন্য একটু চটপটি নিয়ে আয় না রে সোনা ।

স্নেহা এন্মিতেই লাজুক প্ৰকৃতির ,আজ আবার কি মনে করে ঝিনি আপুর পুরানো একটা ছোট বেলার কামিজ আর শালোয়ার পড়ছে, হাল্কা কলাপাতা সবুজের মধ্যে প্ৰিন্টের কামিজ আর সাদা শালোয়ার।কি যে সুন্দর লাগছিল স্নেহাকে দেখতে, আপুর কথায় স্নেহা বললো,”কিন্তু বাবা যে বলেছে একা একা গেটের বাইরে না যেতে।”

নীলি আপু বললো,”এমা একা কোথায়, আমরা তো উপরে থাকছিই, তুই যাবি আর আসবি শুধু।”

স্নেহা নীচে এসে আপুর ব্যাগ থেকে দুটো দশটাকার নোট নিয়ে রান্নাঘরে এলো একটা টিফিন বাটি নিতে।

তারপর গেটের বাইরে এদিক ; ওদিক তাকিয়ে চটপটি ওয়ালার গাড়ী দেখতে না পেয়ে অসহায়ের মতো ডাইনে বায়ে তাকাতে লাগলো, একবার ছাদেও তাকালো কিন্তু দু বোনের কোন বোনকেই দেখতে না পেয়ে হতাশ হয়ে আবার গেটে ঢুকতে যাবে তখন শুনলো, টচপটি,এই চটপটি লাগবেবেবেবে…

ততক্ষনে গাড়ী গলির মোড়ে, স্নেহা ছোট্ট পা চালিয়ে মোড় পৰ্যন্ত আসলো, সন্ধ্যা হয় হয়, আবছা আধারে দিনের আলোকে ঢেকে দিচ্ছে রাতের আকাশ,আশেপাশের দোকানে বাংলা ,হিন্দী গান বেজে চলছে উচ্চ স্বরে, নানান রকমের মানুষের ভীড় রাস্তায়, স্নেহার একটু ভয়ও হতে লাগলো, অপু ভাইয়ার সাথে মাঝে মাঝে এসে আইসক্রিম, চকলেট, চিপস্ কিনে নিয়ে যায় যখন, তখন কিন্তু এতোটা ভয় করেনা , কিন্তু এখন কেমন যেন ভয় করছে। তবুও সাহস নিয়ে চটপটিওয়ালার ভ্যানের সামনে দাড়িয়ে বাটিটা বাড়িয়ে দিয়ে বল্লো, ” বিশ টাকার চটপটি চাই।” চটপটি ওয়ালা ওর ভদ্ৰ পোষাক এবং ব্যাবহারে খুব যত্ন করে বাটি ভরে দেয় সাথে একটা পলিথিনে আরো কয়েকটি ফুচকা দিয়ে দিলো যখন শুনলো স্নেহা আব্দুল বাসেতের নাত্নী। চটপটির লাইনে দাড়িয়ে থাকার সময় খেয়াল করলো ভ্যানের অন্য পাশে একটা আঠারো উনিশ বছরের যুবক কেমন যেন বিশ্ৰী ভাবে তাকিয়ে আছে ওর দিকে, বা গালে একটা কাঁটা দাগ, এই সন্ধ্যার আলো আধারীতেও মুখে স্পষ্ট বসন্তের দাগ দেখা যাচ্ছে, স্নেহার ভালো লাগছে না এই তাকানো, এই প্ৰথম মনে হলো ও নীলি-ঝিনি আপুর মতো বড় হয়ে গিয়েছে, ওর ছোট্ট শরীরের একটু আধটু মেয়েটিপনা টের পাচ্ছে, মনে হলো একটা উড়না থাকলে বেশ হতো, কেন যে আজকে কামিজ-শালোয়ার পড়তে গেল! ভীষন কান্না পাচ্ছে ছোট্ট স্নেহার।

চটপটি ওয়ালার কথায় সন্বিৎ ফিরে এলো, “এই যে খুকুমনি এই নাও তোমার বাটি।” স্নেহা বাটি হাতে জলদি মোড়টাকে পাশ কাটিয়ে গলির মুখে পা বাড়ালো, ততোক্ষনে মসজিদ থেকে মাগরিবের আজান ভেসে আসছে, গলির মুখে মানুষের ভীড়, কেউ অহেতুক দাড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছে, পানের পিক ছুড়ে মারছে দেওয়ালের গায়ে, ড্ৰেন, কাঁদায় পা বাচিয়ে স্নেহা হেঁটে চলছে, ঐ যে বাড়ীর গেট দেখা যাচ্ছে, এমন সময় মনে হলো কে যেন ওর বুকে খুব তাড়াহূড়ো করে হাত দিয়ে ব্যস্ত ভংগীতে হেঁটে গেল পাশ কাটিয়ে,প্ৰচণ্ড ব্যাথায় স্নেহা কুকড়ে উঠলো, হাত থেকে ফুচকার প্যাকেটটা নীচে পড়ে গেল, ওটা তুলতে যাবে তখন দেখলো ঐ গালকাটা ছেলেটা পেছনে ফিরে বিশ্ৰীভাবে হেসে একটা শিষ বাজিয়ে কোথায় যেন মিলিয়ে গেল।

বাসায় এসে কোনোমতে বাটিটা টেবিলে রেখে স্নেহা দিদার ঘরে যেয়ে ফুপিয়ে কান্না, কেউ দেখছেনা ওকে, নীচ থেকে আপুরা চটপটি খাবার জন্য ডাকছে, স্নেহার মনে হ’লো ওর ন’বছরের শরীরে এক লহমায় কেউ নোংরা লাগিয়ে অপবিত্র করে দিয়ে গেল, কিছুক্ষনের ব্যবধানে স্নেহা যেন এক কিশোরী হয়ে গেল, কাকে বলবে? কি করে বলবে? কেমন করে বলবে ? এতো লজ্জা আর এই শরীরটা নিয়ে ওর কষ্ট এবং শংকা হতে থাকলো, কি করে এই সমাজ শিশু মেয়ে থেকে একটা মহিলা এইসব নোংরা পুরুষের হাত থেকে বাঁচতে শিখবে, এসব ভাবতে ভাবতে আর লজ্জা এবং কষ্টে কেঁদে কেঁদে সেই বালিকা ঘুমিয়ে গেছে সে রাতে। কেউ জানলো না এই বাড়ীর এই বালিকার সাথে আজকের সন্ধ্যার ঘটনা।

তারপর সেবারের গ্ৰীষ্মের ছুটি শেষ, হঠাৎ করেই যেন চপলা বালিকা শান্ত হয়ে গেল, ছাদে উঠলেই ওর চোখ শুধু একটা চোখ খুঁজে, যদি দেখা মেলে আবারো!

সেবার কি হলো শবে বরাতের সময় দিদা পাড়ার এ বাড়ী সে বাড়ীতে হালুয়া-রুটি পাঠাচ্ছে, অপুভাই গেলো রিংকুকে নিয়ে মসজিদে খাবার দিতে, মতির মায়ের সাথে ঝিনি আর স্নেহা গেল কাছের কিছু বাড়ী আর আপুদের পাড়াতো বান্ধবীদের কে খাবার দিতে।হঠাৎ করে ঐ গাল কাটাকে দেখলো তুলি ফুপিদের বাড়ী থেকে শিষ দিয়ে বেড়িয়ে যেতে, ভয়ে স্নেহা কুকড়ে গেল, তুলি ফুপিরা এ পাড়ার স্থানীয়, তুলির ছোট্ট বোন টুম্পা স্নেহার বয়সী, স্নেহা টুম্পাকে গেটে দেখে বললো, “আচ্ছা টুম্পা, এই যে একটু আগে একটা ছেলে বের হয়ে গেল,দেখে তো মনে হয় না তোমাদের কোন আত্মীয়, কেমন যেন বাজে টাইপের।”

টুম্পা বললো, “আরে ঐটা তো আমাদের বাড়ীতে যে রহিমা খালা কাজ করেন, উনার বোনের ছেলে বাদশা, বোনটা দু’বছর হলো মারা গেছে , এ ছেলে এবং আরো একটা ছেলে রেখে, এদের বাবা আরেকটা বিয়ে করেছে, ছোট ভাইটা কে রহিমা খালা নিয়ে এসেছে,স্কুলে ভৰ্তি করিয়েছে,কিন্তু এটা বখাটে হয়ে গেছে, মাঝে মধ্যে আসে খালার থেকে টাকা নিতে।”

সেই সন্ধ্যায় চপলা বালিকার মাথার মধ্যে বাদশা নামের একটা বাজে ছেলের নাম আটকে গেল সেই সাথে মুখটাওকে বালিকা স্নেহা একটা ফ্ৰেমে আটকিয়ে রেখে দিলো—

মাঝে মাঝে মনে হতো সেই কালো সন্ধ্যার কথা, দাদু বাড়ীতে বেড়াতে এলে ছাদে গেলে আশে পাশে চোখ জোড়া ঘুরতো বাদশা নামের লম্পটটার দিকে, আরো একবার একটু ক্ষনের জন্য দেখেছিলো গলির মোড়ে যখন ওরা সন্ধ্যায় শিশুপাৰ্কের থেকে ছোট ফুপির গাড়ী করে দাদুর বাড়ীতে ফিরছিলো, পথে জ্যামের মধ্যে বসে ছিলো, তখন দেখলো একটা ব্যস্ত গাৰ্মেন্টস্ ফেরতা কিশোরীর বুকে হাত দিয়ে ভিড়ের মধ্যে ছিটকে যেতে!

তারপর অনেক বছর চলে গিয়েছে, দাদু মারা যাবার পরে চাচারা এ বাড়ী বিক্রি করে গুলশানে এপাৰ্টমেন্ট কিনে চলে এসেছে, বড় চাচুও বৃদ্ধা এখন, দীদা বছর পাঁচেক আগে ইন্তেকাল করেছেন, অপু ভাইয়া বিয়ে করে তিন বাচ্চার বাবা, নীলি-ঝিনি আপু কানাডায় স্যাটেল ,সবাই আছে কিন্তু সেদিনের কিছুই আর নেই যেন এই বৰ্তমানের জীবনে। স্নেহাও বিয়ে করে তিন বাচ্চার মা ,স্বামীর সাথে অষ্ট্ৰেলিয়ায় সেটেল,ভালো চাকরী, সাজানো জীবনে,জাফরের সাথে প্ৰেম করে বিয়ে, জাফর মেলৰ্বোনের একটা বিশ্বাবিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে, দুটো মেয়ে একটা ছেলে ,তবুও কখনো কখনো সেই স্মৃতির গলিতে অবচেতন মন চলে যায় ।এবার ডিসেম্বরে সামারের ছুটিতে বাচ্চাদের নিয়ে দেশে এসেছে। বাচ্চারা নানু/দাদীর বাড়ী বেড়াচ্ছে।

স্নেহার অনেক দিনের পুরানো একটা হোম ওৰ্য়াক রয়ে গেছে, টুম্পার সাথে যোগাযোগ আছে, কথায় কথায় জেনে নিয়েছে রহিমা খালার কি অবস্থা? এখন অনেক বৃদ্ধা হয়ে গেছে, চোখে দেখেনা ঠিকমতো, বোনের ছোট ছেলেটা একটা গ্যারাজে কাজ করে ,খালাকে ওর কাছেই রাখে,বড়টা মাস্তানী আর আজেবাজে কাজ করে বেশ ক’বার জেল খেটেছে, এখনো ভাড়াটে গুন্ডা হিসাবে কাজ করে, চোরাই মদ বিক্রি করে। দুটো বৌ চলে গেছে এখন নাকি আরেকটাকে (গাৰ্মেন্টসে কাজ করে )ভাগিয়ে এনেছে। টুম্পাকে শুধু বলেছে ওর পরিচিত একজনকে সাহায্য করবে খুজে পেতে তাই বাদশার ঠিকানা দরকার । আজ সকালেই পাৰ্থ কে নিয়ে চলে এসেছে টুম্পার কাছে জেনে নেয়া ঠিকানা অনুযায়ী ।পাৰ্থ ওর বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু, ছোটবেলায় একই স্কুল ছিলো কিন্তু হাইস্কুলে উঠে পাৰ্থরা চলে গেল যশোরে বাবার চাকরী বদলির কারনে কিন্তু আবারো বিশ্ববিদ্যালয়ে যেয়ে দেখা, তারপর কেউ কারো কে আর হারিয়ে যেতে দেয়নি। দেশে এলেই পাৰ্থের সাথে দেখা হয়, পুরানো দিনগুলোতে ফিরে যায়, কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের আশে পাশে ঘুরে আসে, গতরাতে শুধু বলেছিলো আজ সকালে দেখা করতে দুজনে এক জায়গায় যাবে, এখানে আসতে আসতে পাৰ্থ বলেছিলো, “ঢাকা শহরে এতো জায়গা থাকতে এখানে কেন এনেছিস?”

স্নেহা বলেছিলো, ” কোন প্ৰশ্ন কিংবা শৰ্ত করা যাবে না,যা বলবো তাই করবি, আমি ভেতরে গেলে তুই বাড়ীর দরজার কাছে দাড়িয়ে থাকবি, মোড়ে অটোওয়ালা দাড়িয়ে থাকবে ,কাজ শেষে ঐ অটোতে ফিরবো।”

যথারীতি ওরা এলো, একটু ড্ৰেন ,অলি গলি পেরিয়ে একটা পুরানো দোতলা বাড়ীর নীচ তলায় এসে দাড়ালো, বাড়ীর নম্বর মিলে গেছে, এখানে সেখানে পলেস্তরা খসে খসে ইট দেখা যাচ্ছে, দরজা আধো ভেজা, একটা কড়া ঝুলছে অন্যটা ভাংগা, সেখানে বড় একটা ফুটো, একটা তেলচিটচিটে প্ৰিন্টের পৰ্দা ঝুলছে।পাশে ঘুরানো সিড়ি উপরে যাবার, একটা বারো, তের বছরের ছেলে ঐ ভাংগা দোতলা থেকে মুখ বাড়ালো,” কাকে চান”?

“এখানে কি বাদশা থাকে ?”

” নীচের দরজায় টোকা মারেন —” এই বলে ছেলেটি উধাও।

এমন সময় ভেতরে থেকে কে যেন খেকিয়ে উঠলো,

” আবে এই সক্কাল সক্কাল ঘুমাইতে দিবি না ,না দরজা খটখটাবি?”

বাইরে থেকে স্নেহা বললো, “এখানে কি বাদশা থাকে, একটু দরকার ছিলো ।”

“আয়া পরেন ,দরজা খোলাই।”

ভেতরে যেয়ে দেখে ঘুম থেকে মোটে উঠেছে, চুলগুলো উস্কোখুস্ক, সেই চেহারা, নষ্ট চাহনী, এবার স্নেহার মোটেই ভয় করলো না আর, মনে হ’লো স্নেহা একলাফেই সময়ের সাঁকোটা পেরিয়ে এখানে চলে এসেছে ।এখন শুধু অপেক্ষা একটু সময়ের ….

স্নেহার ভদ্ৰস্ত চেহারা, কথা- বাৰ্তা শুনে বাদশা বললো,”এহানে কি কাম?”

স্নেহা মিথ্যা করে বললো,”একটা মেয়েকে কিছু দিনের জন্য লুকিয়ে রেখে ভয় দেখাতে হবে,আমার স্বামীর সাথে সম্পৰ্কে জড়িয়েছে , ক’তো লাগবে? কাজটা কিন্তু নিখুত এবং গোপনীয়তা রক্ষা করে করতে হবে।”

লোকটা স্নেহার দিকে আপাদ মস্তক তাকিয়ে বললো,

” লাখ দুয়েক হ’লেই সই।আধা এডভান্স আধা কাজ শেষে ।”

“কি হইলো টাকা দিয়া ঠিকানা আর আপনের ফোন নাম্বার দিয়া কাইটা পরেন, মাইয়াডার ছবি আমার ফোনে পাঠাইয়া দেন।”

এবার স্নেহার চোয়াল আরো শক্ত হলো, একটা হাত ব্যাগের ভেতরে , যদি কিছু করে তাহ’লে মুখে পেপার স্প্ৰে ছড়িয়ে দিয়ে চলে আসবে কিন্তু তার আগে বাদশার মগজে একটু নাড়াচাড়া দেয়া দরকার ।

” কি তিরিশ বছর আগের কোন কথাই তোর মনে নেই?”

এবার বাদশা একটু থতমত খেয়ে ঢোক গিললো,

“মনে নেই তোর ? অল্প বয়সী মেয়ে দেখলে কোন বাহানা করে ছূঁয়ে দিতি , হিসাব নেই, না ? মনে পড়ে বাসেত সাহেবের তিনতলা বাড়ীটার কথা? সেই সন্ধ্যায় তুই আমাকে ভীষন নোংরাভাবে ছুয়ে ছিলি, আমি ভুলিনি, তোর নোংরা চেহারাটা আমি ভুলিনি, এই বলে স্নেহা ওর সমস্ত শক্তি দিয়ে নোংরা বাদশার গালে একটা থাপ্পর দিয়ে থুতু ছিটিয়ে দিলো, বাদশা কিছু বুঝে উঠার আগেই পায়ের জুতো খুলে দুগালে আরো দুটো।”

বাদশা উঠে দাড়িয়েছে এবার স্নেহাকে ছোবার জন্য, এরমধ্যে স্নেহা বাদশার মুখে পেপার স্প্ৰে দিয়ে ঘর হতে বের হতে হতে বললো, ” তোর মতো নোংরা কীটগুলোর পৃথিবীতে বেচেঁ থাকার কোন দরকার নেই,কিন্তু সৃষ্টিকৰ্তা তোদের আরো ভয়ংকর মৃত্যু দেবে বলেই বাঁচিয়ে রেখেছেন।”

- Advertisement -

Read More

Recent