টরন্টো জীবনে আলাস্কার সুবাতাস

টরন্টো জীবনে আলাস্কার সুবাতাস

আমেরিকার বিখ‍্যাত শিল্পী টেইলর সুইফট এর রোড আইল‍্যান্ডের বাড়ীটি কিনেছিলেন ১৭ মিলিয়ন ডলারে। আর আমেরিকা রাশিয়া থেকে আলাস্কা কিনেছিল মাত্র ৭.২ মিলিয়ন ডলারে। যদিও সেটা ১৮৬৭ সালে কিন্তু তারপরও আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম সেরা ব‍্যবসায়িক এবং রাজনৈতিক চুক্তি ছিল এটা। যেই ভূমি রাশিয়ানদের কাছে ছিল বোঝা, আর আমেরিকানরা নেবার পর ১৮৯০ সালে সোনার খনি থেকে শুরু করে প্রায় সব প্রাকৃতিক সম্পদের খনিই পাওয়া শুরূ হল। আর তারপর থেকেই আমেরিকা-কানাডার অন‍্যান‍্য প্রদেশ থেকে মানুষজন আলাস্কাতে অভিবাসন করতে লাগল। আমরাও যাচ্ছি তবে সোনার খনির খোজে না, যেই রাস্তা দিয়ে সোনার খনি থেকে সোনা আনা নেয়া হত সেই রাস্তাটা দেখতে

প্রথম রাত প্রিন্স জর্জে থাকার পর আজকে আমাদের আরও নর্থে যাবার প্ল‍্যান। হাইওয়ে ১৬ ধরে একটাই রাস্তা একে বেঁকে কখন পাহাড়ের ভিতর দিয়ে আবার কখনও পাশ দিয়ে চলে গেছে। মাঝে মাঝেই নীল পানির লেকের পাশ দিয়ে আবার কখনও পাহাড় থেকে বেয়ে পড়া ঝর্নার ছোঁয়া নিয়ে।

- Advertisement -

একটানা চার ঘণ্টা গাড়ি চালানোর পর আমাদের প্রথম স্টপেজ পাহাড়ের কোলে ছোট্ট শহর “স্মিদারস”। এই শহরটা অনেকটা আশেপাশের ভিতরের গ্রামগুলোর জন‍্য বেজ ক‍্যাম্প এর মত কাজ করে। খাওয়া দাওয়া এবং গাড়ির ট‍্যাংক ফুল করে নেবার জন‍্য ভাল জায়গা এটি। সব বিখ্যাত ফুড চেইনগুলোর একটি করে দোকান আছে। স্মিদারস এর সবচেয়ে বিখ্যাত ঘুরার জায়গা হল “টুইন ফল রিক্রিয়েশন সাইট” । পার্কিং লট থেকে দশ পনের মিনিট হাটলে ঝর্নাটির অনেকটা কাছে যাওয়া যায়। যত কাছে যাচ্ছি ঝর্নাটা আরও সুন্দর লাগছে। একই পাহাড় থেকে দুই পাশে দুটি ঝর্ণা নেমে এসেছে। ডান পাশের ঝর্নাটা ছোট হলেও বা পাশেরটা একেবারে চোখ ধাঁধানো। ঝর্নার সেই পানি আবার ঝিড়ি পথের মত হয়ে আমাদের পাশ দিয়ে চলে গেছে। এখানে বসে কিছু স‍্যান্ডউইচ তৈরি করে তা দিয়েই দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম।

আরও তিন ঘন্টা গাড়ি চালানোর পর আমরা পৌঁছলাম মেজিদিয়ান জাংসনে। এখান থেকে হাইওয়ে ৩৭ দিয়ে ইকুন হয়ে আলাস্কা। বিশাল বড় সাইনবোর্ড দিয়ে জানানো “রোড টু আলাস্কা” । এখানে ট‍্যুর প্ল‍্যানে একটু টুইস্ট করে আরেকটা অসাধারণ জায়গা দেখার প্ল‍্যান করলাম। হাইওয়ে ৩৭ থেকে বের হয়ে ৩৭এ নিলাম, যেটা আমাদেরকে একেবারে নিয়ে যাবে বৃটিশ কলম্বিয়ার বর্ডার সিটি “স্টুয়ার্ট”। এই রাস্তায় ঢোকার সাথে সাথেই মনে হল অন‍্য এক জগতে চলে আসছি।

এ পথের আরেক নাম গ্লেসিয়ার হাইওয়ে । এ রাস্তাটা যেমন সুন্দর তেমনি ভয়ংকর ও হতে পারে। ৬৫ কিমি এ রাস্তায় প্রায় ৭২ টা সক্রিয় ভূমি/তুষার ধ্বস এর জায়গা আছে। এজন‍্য ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা গুলোতে না থেমে অনেক দ্রুত পার হয়ে যেতে হয়। যদিও এখন গরম কাল তারপরও সবগুলো পাহাড়ের চূড়ায় সাদা বরফের আস্তরণ পড়ে আছে। কোথাও পাহাড় বেয়ে ঝর্না নামছে আবার কোথাও পাহাড় বেয়ে বিশাল বিশাল গ্লেসিয়ার /হিমবাহের নেমে আসা। এতটুকো পথেই প্রায় বিশটার মত গ্লেসিয়ার পাড়ি দিতে হয়। একেবারে সবচেয়ে রাস্তার পাশে সবচেয়ে বড় যে হিমবাহ তার নাম “বিয়ার গ্লেসিয়ার”। এই গ্লেসিয়ারের কয়েক বছর আগের ছবি দেখলে বুঝা যায়, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ব‍্যপকতা কতটুকু। চারপাশের পাহাড়ে গ্লেসিয়ার আর ঝর্না দেখতে দেখতে আমরা “স্টুয়ার্ট” শহরে পৌছালাম।

যদিও সন্ধ‍্যা হয়ে গেছে তারপরও যথেষ্ঠ পরিমান দিনের আলো আছে। কোনভাবে হোটেলে চেক-ইন করে আবার বের হয়ে গেলাম। আসলে এই পাশে আসার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বিশাল একটা গ্লেসিয়ার দেখতে যাওয়া। অন্ধকার হবার আগে আগেই পৌঁছাতে হবে। যদিও অল্প রাস্তা কিন্তু একেতো পাহাড়ী উঁচু নিচু তারপর অনেক দূর্গম। ২০ কিমি রাস্তা যেতেই প্রায় ঘন্টা খানেক সময় লাগে। “স্টুয়ার্ট”এর আলাস্কার শহর “হায়দার” এর বর্ডার আছে। যদিও এই গ্লেসিয়ারটি কানাডার ভিতর অবস্থিত কিন্তু যাবার রাস্তাটা আবার আলাস্কার ভিতর দিয়ে গেছে। বর্ডার অতিক্রম করে আলাস্কা ঢুকার পরেই জনপ্রিয় ঘুরার জায়গা “ফিস ক্রিক ওয়াইল্ড কনজারভেশন সাইট”। এখান থেকে ভাল্লুকের স‍্যামন মাছ শিকারের অসাধারণ এক অভিজ্ঞতা নেওয়া যায়। আমরা যখন পৌঁছলাম, ভাল্লুক সাহেব তখন রাতের খাবার খেয়ে চলে গেছেন। তাই আমরা আর দেরি না করে আমাদের গ্লেসিয়ার এর পথে রওনা হয়ে গেলাম।

জন্গলের ভিতর দিয়ে যখন যাচ্ছি তখন টুক করে একটা কালো ভাল্লুক আমাদের একটু দেখা দিয়ে আবার জন্গলে ঢুকে গেল। আমারও আরো সতর্ক ভাবে এদিক ওদিক দেখতে লাগলাম আরও কিছু দেখা যায় কিনা। পাহাড়ের উপরে উঠছি আর দূরে মনে হচ্ছে অনেক উচু থেকে পাহাড়ের গা বেয়ে বিশাল এক বরফের নদী নিচে নেমে আসছে। গাড়ি থেকে নেমে পাহাড়ের ধার ঘেঁষে একটু নিচে নামতেই সামনে ভেসে উঠল এক বিস্তীর্ণ বরফের সমুদ্র- “স‍্যামন গ্লেসিয়ার”। সূর্যের হালকা আলো পড়ে বরফের উপর ছড়িয়ে পড়া নীলচে আভা যেন চোখ ধাঁধিয়ে দিল। প্রথমবার এত বড় গ্লেসিয়ার দেখে আমরা সবাই যেন কথা হারিয়ে ফেললাম।

গ্লেসিয়ারের পেছনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা পর্বতমালা আর সামনের দিকে বরফের জমাট বাঁধা নদীর মতো প্রবাহ—পুরো পরিবেশ যেন নিস্তব্ধ, অথচ প্রাণময়। হালকা শীতল বাতাসে গাছের ডালগুলো মৃদু নড়ছিল, আর বরফের ফাটল থেকে আসা হালকা গর্জন যেন প্রকৃতির নিজস্ব সঙ্গীত।

বরফের উপরিভাগটি সাদা হলেও কোথাও কোথাও তা নীলচে রঙ ধারণ করেছে। ফাটলগুলো এত গভীর যে মনে হয় এক রহস্যময় জগতে প্রবেশ করবে। বরফের ধারালো প্রান্তগুলো যেন ছুরি দিয়ে কেটে রাখা। সন্ধ‍্যার হালকা আলোতেও মনে হচ্ছিল পুরো গ্লেসিয়ারটি যেন চকচক করছে।

গ্লেসিয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে আমার মনে হলো আমি যেন প্রকৃতির বিশালতার সামনে খুবই ক্ষুদ্র। এর নিঃশব্দ গর্জন, হিমশীতল বাতাস আর সীমাহীন বিস্তৃতি আমাকে প্রকৃতির প্রতি নতুনভাবে শ্রদ্ধাশীল করে তুলল।হাজার হাজার বছর ধরে জমে থাকা তুষার স্তরের চাপে এই গ্লেসিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। বরফের চলমান স্রোত পাহাড়ের পাথরগুলো ঘষে চলেছে, এ যেন একটা বরফের জাদুঘর!’ সত্যিই, এমন দৃশ্য আগে কখনো দেখিনি।”

কানাডার পঞ্চম বৃহত্তম এবং পৃথিবীর যেসব গ্লেসিয়ারগুলোতে গাড়ি নিয়ে যাবার সুযোগ আছে তার মধ্যে এটা সবচেয়ে বড়। চারদিকে ধীরে ধীরে অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। আমাদের হোটেলে ফিরতে হবে। সেই উঁচু জায়গায় গ্লেসিয়ার এই স্বর্গীয় দৃশ‍্যকে সামনে রেখে দুটো ক‍্যাম্পিং ভ‍্যানে কিছু লোক ক‍্যাম্পিং করছে। আমার তাদের দেখে অনেক ইর্ষা হচ্ছে। এ ইর্ষা এখানে আরও কিছু সময় থাকতে না পারার, এ ইর্ষা এখানটায় দাঁড়িয়ে ভোরের প্রথম আলো দেখতে না পারার। তবে আমরা ভাগ্যবান, এমন মন্ত্রমুগ্ধকর দৃশ্যের সাক্ষী হতে পেরে……

আলাস্কার পথে (Alaska: The last frontier): পর্ব ২

টরন্টো, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent