প্রসঙ্গ : সাম্প্রতিক টরন্টো

রাজনৈতিক আদর্শ বিশ্বাস অনুসারী দল মতে ভিন্নতা ছিল আছে থাকবে

রাজনৈতিক আদর্শ-বিশ্বাস-অনুসারী-দল-মতে ভিন্নতা ছিল, আছে, থাকবে। যেমন ভিন্ন ধর্মের, বর্ণের, জাতের, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মানুষ ছিল, আছে, থাকবে। এসবের সম্মিলনেই মানবজাতির সৌন্দর্য ও ঐকতান। কানাডা এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।

আমাদের এই টরন্টো শহরে বাংলাদেশী কমিউনিটিতেও এর উজ্জ্বল চর্চার যাত্রা শুরু হয়েছিল। এই ছোট্ট কমিউনিটিতেও বিষবাষ্প ছড়ানো হাতে গোনা জনাকয়েক ছাড়া মোটামুটি একটা ঐক্যসূত্র সবসময়ই ছিল। অথচ, এখন দেখছি এর সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। ভিন্ন মতের কাউকে যেন টেনে হিঁচড়ে ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত করার এক পৈশাচিক উন্মত্ততার লাগামহীন প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।

- Advertisement -

গত সাত আট মাস থেকে এসব দেখে নিজেই নিজের কাছে লজ্জিত বোধ করছি৷ নিজেও আকারে ইঙ্গিতে আক্রমণের শিকার হয়েছি। তবুও নিজের কাছে যেমন এক সান্ত্বনা ছিল – এরকম টালমাটাল অস্থির সময়ে কারো হৃদয়-মনই স্থির নেই। শান্তি নেই। থাকার কথাও নয়। অতএব, এই অস্থির সময় শেষ হলে সবই স্বাভাবিক হবে। আবার সম্পর্কের শীতলতা দূর হয়ে উষ্ণ ভালোবাসার বন্ধন-মালা গাঁথা হবে।

কিন্তু না, আমার ধারণা ভুল। কল্পনায় প্রতিপক্ষ ভেবে আরেকজনকে কেন অপদস্ত করবো! কাউকে অপদস্ত হতে দেখলে কেন আমাদের মধ্যে কষ্ট ও বিব্রত হওয়ার পরিবর্তে বিকৃত সুখ ও পুলক জাগাবে! কতজনকে কতভাবে কত অনুনয় অনুরোধ করলাম একটু স্থির হও। শান্ত হও। এমনকি অসহ্যকর বিচ্ছেদকেও নিজের কাছে রাখো৷ পাঁচকান করে বলো না, দীর্ঘ বছরের সম্পর্ক ও পথচলার ইতি!

অবাক হয়ে যা দেখলাম, যাদের দ্বারা হতে দেখলাম, যে ভাষা ও ভাষ্য শুনলাম তার আর পুনরাবৃত্তি করতে চাইনা৷ এই কমিউনিটি তো আমাদেরই। আমার মৃতদেহ তো বহন করবেন এই কমিউনিটিরই আমাদের ভাই।

এই শহরে দীর্ঘ বছর থেকে বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক সংগঠনের অনুসারী আছেন। এমনকি সাংগঠনিকভাবেও তারা ভিন্ন দলের মতের চর্চা অব্যাহত রেখেছেন৷ কিন্তু আজ পর্যন্ত ভিন্ন রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মধ্যে সামান্যতম অশ্রদ্ধার কিছু চোখে লাগেনি৷ অথচ, যাদের কাছে মানুষ সহনশীলতা আশা করেন সাংস্কৃতিক কর্মী পরিচয়ধারী অনেকের আচরণ ও ফেইসবুক যুদ্ধ এমন এক পর্যায়ে এই শহরকে নিয়ে গেল যে, তা শুধু অরুচিকর অসংস্কৃতই নয়, বরং তা হিংস্র ও অমানবিকও।

যা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে তার বিবরণ দিয়ে ব্যথাতুর ক্ষতে আরো জোরে ঘা দিতে চাইনা। কিন্তু আমি স্পষ্ট ভাষায় বলি এগুলো আমাদেরকে মানায় না। এসব করে দেশপ্রেম প্রকাশ হয় না। আঁকা ছবিতে হোক, কথায় হোক, ব্যক্তি আক্রমণ মানুষকে কুঁকড়ে দেয়। বিব্রত হয়ে, লজ্জায় অস্বস্তিতে মাটির সঙ্গে মিশে যায়। লজ্জায় ক্ষোভে দুঃখে আমি নিজেই স্তব্ধ হয়ে গেছি। ফেইসবুকে এইসব ব্যক্তিগত ঝগড়ায় কারো পক্ষে বিপক্ষে কোন কথা বা মন্তব্যে আমি জড়াইনি। তাই বলে মানুষকে অপদস্তকারী, সে যেই হোক, যত বড় শিল্পীই হোক, সেটা কণ্ঠের শিল্পী, উচ্চারণের শিল্পী কিংবা তুলির শিল্পী কোন শিল্পীরই এহেন আচরণকে আমি সমর্থন করি না। কেউ বলতে পারবেন না, কোনদিন তা করেছি। আমার একান্ত অনুরোধ আমরা আরেকটু সহনশীল হই। এই শহর সাংস্কৃতিক জাগরণের শহর৷ শিল্পের নানান শাখায় এই অব্যাহত চর্চা মানুষকে উদ্বুদ্ধ করছে পৃথিবীব্যাপী। এই অর্জনকে ধূলিসাৎ করবেন না৷ ইতিহাসের অমোঘ সত্য আমাদের কারণে মিথ্যা হয়ে যাবে না।

এই শহর বহু বহু সংস্কৃতিবান মানুষের দীর্ঘ শ্রম ও সাধনায় গড়ে ওঠা একটি ঐক্যের সুতোর মালা। এই শহরের অধিকাংশ বাঙালি পাড়ায় হেঁটে চলেছেন বাংলাদেশের অগ্রগণ্য মনীষীরা। তাদের পরামর্শ মেনে, তাদের আদর্শকে মান্য করে এই শহর সম্মানিত হয়েছে। কমিউনিটিও সম্মান অর্জন করেছে অপরাপর বাঙালি অধ্যুষিত বড় বড় শহরের কাছে। আর আজ নিজেদের মধ্যে ব্যক্তি আক্রমণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেদেরকেই ক্ষতবিক্ষত করছেন! পেছনের কথা কাহিনী বা কোন প্রসঙ্গে না গিয়ে, সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজি। শুদ্ধ সাংস্কৃতিক চর্চার একটি স্থির আবহে অবগাহন করি।

আপনাদের প্রতি আমার অনুরোধ, এসব বন্ধ করুন। একটু স্থির হোন। একবার ভাবুন, যাকে আপনি বিব্রত ও অপদস্ত করছেন, তার হৃদয়ের রক্তক্ষরণের যন্ত্রণা! এও ভাবুন, আরেকবার ভাবুন, যন্ত্রণায় দগ্ধ হতে হতে সহ্য করতে না পেরে মানুষ কী না করতে পারে!

 

টরন্টো, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent