
সময়কাল ১৯৮২।
ভালোবাসার মেয়েটিকে বিয়ে করার অপরাধে বাড়ি থেকে বিতাড়িত হলাম। কোথায় যাই মেয়েটাকে নিয়ে? মহাখালিতে খোকন নামের এক বন্ধুর বাড়িতে স্ত্রী শার্লিকে রেখে আমি নেমে পড়লাম নিরাপদ একটা আশ্রয়ের খোঁজে। খোকনের তিনচারটে বোন ছিলো নানান বয়েসী। একজন ছাড়া সবাই আমাদের সিনিয়র। সুতরাং শার্লির সেখানে কয়েকটা দিন ভালোভাবেই কেটে যাবে। আমাকে একটা বাড়ি ভাড়া করতে হবে। এমন একটা বাড়ি যে বাড়িতে বিয়ে করা নতুন বউটা আমার নিরাপদে থাকবে। সবচে ভালো হয় কোনো পরিবারে সাবলেট হলে। কারণ সারাদিন হয়তো আমি বাড়িতে থাকবো না। তখন একা একা মেয়েটা যেনো ভয় না পায়। এমন একটা পরিবারে আমি থাকতে চাই যে পরিবারে বাচ্চা-কাচ্চা আছে। তাহলে শার্লির সময়টাও চমৎকার কাটবে। একা একা বোরড হবে না সে। কোথায় যাই? কার কাছে যাই? নানানজনের কথা মনে পড়লো কিন্তু ব্যাটে-বলে হচ্ছিলো না। মনে পড়লো সিরাজ ভাইয়ের কথা। সিরাজুল ফরিদ। ছড়াকার। (‘লাগাম টেনে ধর’ নামের ছড়ার বইয়ের লেখক।)
চলে গেলাম তাঁর অফিসে। তিনি তখন বিদ্যুৎ বিভাগে চাকরি করেন। আমার সঙ্গে সিরাজুল ফরিদের সম্পর্কটা চমৎকার। আমাকে তিনি খুবই পছন্দ করেন। আমার কাছে সবকিছু শুনে তাঁর বাড়িতেই উঠতে বললেন। যাত্রাবাড়িতে সদ্যনির্মিত নতুন একটা সরকারী কলোনিতে থাকেন তিনি। বললেন, একটা কক্ষ তিনি ছেড়ে দেবেন আমাদের জন্যে। আমাকে খাট-চৌকি ইত্যাদি কিনতে হবে। বললেন, রান্নাবান্নায় খানিকটা অসুবিধে হবে। মাত্র একটা ডাবলবার্ণার গ্যাসের চুলা, সময় ভাগ করে রান্না করতে হবে।
সিরাজ ভাই তাঁর স্ত্রী সম্পর্কেও প্রয়োজনীয় তথ্য দিলেন যাতে শার্লির সঙ্গে বা আমার সঙ্গে কোনো রকম ঝামেলা না হয়। এই একটি বিষয়ে খানিকটা চিন্তিত হওয়া ছাড়া সিরাজ ভাইকে দেখলাম মহা খুশি। কারণ আমি তাঁর সঙ্গে একই বাড়িতে একসঙ্গে থাকবো। মহা উচ্ছ্বাসের সঙ্গে তিনি তাঁর বাড়ির ঠিকানা লোকেশন সবকিছু আমাকে বুঝিয়ে দিলেন।
একদিন পর নির্ধারিত সময়ে যাত্রাবাড়িতে তাঁর কলোনিতে আমাদের গৃহপ্রবেশ হলো। সিরাজ ভাইয়ের খুদে দুই কন্যা আর অতিখুদে একপুত্রের সঙ্গে আমাদের খুবই খাতির হয়ে গেলো। শুরু হলো আমার আর শার্লির সাবলেট জীবন। সিরাজ ভাই খুব খুশি। আগে আমাকে পেতেন অনেক দিন পর পর। আর এখন প্রতিদিন তিনি অটোসিস্টেমেই পেয়ে যান আমাকে। সকালে এবং রাতে, বিশেষ করে রাতের বেলাটায় লম্বা সময়ের জন্যে। আর ছুটির দিনগুলোয় সারাদিনমান।
আমার সাবলেট জীবনের এই সময়টায় অন্য এক সিরাজুল ফরিদকে আবিস্কার করেছি আমি। একেবারেই শাদামাটা খুবই নিরিহ অনুচ্চকণ্ঠ সৎ একজন মানুষ। আমার ব্যাপারে অসম্ভব কেয়ারিং। আমার সম্মান ও মর্যাদা যাতে বিন্দু পরিমানেও বিনষ্ট বা ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে বিষয়ে সদা জাগ্রত তিনি।
একই ঘরের পাশাপাশি কক্ষে থেকেও কোনো কোনো ছুটির দুপুরে তাঁর বাড়িতে দাওয়াত খাই আমরা। সে এক মহা ইন্টারেস্টিং জীবন আমার! তাঁর একটা মেয়ে শার্লির একটা শাড়ি পড়ে শার্লির লিপস্টিকে ঠোঁট রাঙিয়ে কপালে টিপ সেঁটে সাজুগুজু হয়ে বসে থাকে। আরেক মেয়ে শার্লির পেছন পেছন ঘোরে—ওকেও শাড়ি পড়িয়ে দিতে হবে। সাজিয়েও দিতে হবে। আর সিরাজ ভাইয়ের হাসিখুশি পিচ্চি ছেলেটা, শওকত যার নাম, কাকা কাকা করে অস্থির। কিশোরগঞ্জের আঞ্চলিক ডায়ালেক্টে কী একটা ছড়ার দুটি লাইন প্রায়ই শোনাতো সে আমাকে। প্রথম লাইনটা না বুঝলেও দ্বিতীয় লাইনটা আমার মনে ধরেছিলো—‘কাকায় খাইব মাছের ঝুল’!!
আমি হেসে গড়িয়ে পড়তাম। আর সেটা দেখে আনন্দে ডগোমগো হতো গোলগোল্লা টাইপের ছেলেটা। সেই শওকত এখন, শুনেছি ওর বাবার কর্মক্ষেত্র বিদ্যুৎ বিভাগেই চাকরি করছে পড়াশুনার পাঠ শেষ করে। আরো অবাক করা খবর হচ্ছে বিয়ে-টিয়ে করে রীতিমতো সংসারজীবনও যাপন করছে সেই মাছের ঝুল কাকাটা! আর সিরাজ ভাইয়ের খুদে দুই কন্যাও ঘরকন্নায় ব্যস্ত। দুইমেয়ে একছেলের সংসারে একাধিক নাতিনাতনি নিয়ে মহাসুখের অবসর জীবন তাঁর। তিল তিল করে জমানো টাকার সঙ্গে সারাজীবনের চাকরির প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা যোগ করে নিজের একটা বাড়ি বানিয়েছেন যাত্রাবাড়ি নারায়গঞ্জের মাঝামাঝি কোনো এক জায়গায়। নিজের বাড়ির ব্যাকইয়ার্ডে সবজির বাগানও নাকি করেছেন। টেলিফোনে একদিন আমাকে নিমন্ত্রণও জানিয়েছেন সিরাজ ভাই
—‘‘রিটন তুমি আসো আমার বাগানের টাটকা সবজি খাইয়া যাও। দোতালার কর্ণারের একটা রুম তোমারে ছাইড়া দিমু। দুইদিন থাইক্যা যাও। তুমি মুগ্ধ হইবা। জানালা দিয়া গাছ দেখা যায়। অসংখ্য গাছ আর অসংখ্য পাতা আর অনেক পাখি। তোমার ভালো লাগবো। শার্লিরে লইয়া আসো। দুইদিন থাকো আমার সাথে। আমার মনটায় খুব শান্তি হইবো। কতো কষ্ট কইরা থাকছো তুমি আমার ছোট্ট কলোনির বাড়িতে। আমি চাই এখন আমার নিজের বাড়িতে আইসা কয়টা দিন থাকবা তুমি। তোমার পছন্দের পাঙ্গাশ মাছ দিয়া ভাত খাওয়ামু…কথা কওনা ক্যান মিয়া, আমার দাওয়াত তুমি নিবা কিনা কও….’’
অতিমাত্রায় সহজ সরল সিরাজ ভাই বুঝতেই পারেন না যে টেলিফোনের অপর প্রান্তে বাংলাদেশ থেকে বারো হাজার তিনশ কিলোমিটার দূরের বরফাচ্ছাদিত একটা দেশে তাঁর মমতাসিক্ত ছড়াকার বন্ধুটি তখন নিঃশব্দে কাঁদছে। সেই কান্নার নেপথ্যকাহিনি সে কোনোদিন কাউকে বলবে না।
[আলোকচিত্র পরিচিতি/২০০৮ সালে ছড়া একাডেমীর আয়োজনে বাংলা একাডেমী পুরস্কারপ্রাপ্ত হাফডজন ছড়াকার সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ডিনারের আগে বিক্ষিপ্ত আড্ডায় আহমাদ মাযহার আর শিরীন বকুলের সঙ্গে ছবি তুলছিলাম। বলা নেই কওয়া নেই ফ্রেমে ইন করলেন শুভ্রকেশ শুভ্রভ্রু সিরাজুল ফরিদ।]
