
উত্তম কুমারের ‘অমানুষ’ ছবিটি যাঁরা দেখেছেন তাঁরা জানেন, একটি বাঁধ রক্ষার কারণে সমাজের মাতাল কলংকিত মানুষটি কিভাবে রাতারাতি দেবতা বনে যায়। বাঁধ ভেঙে গেলে তলিয়ে যাবে পুরো গ্রাম। গৃহহারা হবে হাজার হাজার মানুষ। আতঙ্কে দুচোখে ঘুম নেই গ্রামবাসীর।
এরি মধ্যে প্রবল বৃষ্টি। বানের জোয়ারে বাড়ছে পানি। যেকোনো মুহূর্তে মাটিতে ধ্বস নামতে পারে। ফাটল ধরতে পারে বাঁধে। গ্রামের একমাত্র বাঁধ বিশেষজ্ঞ মহানায়ক উত্তম কুমার। নিদারণ অভিমানে মুখ ফিরিয়ে রেখেছেন তিনি। ভেঙে যাক বাঁধ। ভেসে যাক গ্রাম। আমার তাতে কি? আমিতো অমানুষ।
বাংলা ছবির মিক্স ডিজাইন ফরমুলা অনুযায়ী তিনি অমানুষ হয়েছেন যথাবিহিত নায়িকার অবহেলায়। নায়িকা চরিত্রে পাতৌদি জায়া শর্মিলা ঠাকুর। বাঁধ বিশেষজ্ঞ নায়কের মান ভাঙাতে সরল গ্রামজনতা শর্মিলা ঠাকুরের দ্বারস্ত হয়। প্রেমিকার অনুরোধ কি প্রেমিক ফেলে দিতে পারে? ঝড়ো হাওয়া আর প্রবল বৃষ্টি মাথায় নিয়ে শর্মিলা দৌড়াতে থাকেন। পুরোনো আমলের বাংলা ছবি। শাড়ি পেঁচিয়েই তাঁকে দৌড়োতে হয়। একালের মুভি হলে না হয় জিন্স টি শার্টে চালিয়ে দেয়া যেতো। দৌড়োতে দৌড়োতে শর্মিলা হাজির হলেন উত্তম কুমারের পর্ণ কুটীরে। বাকিটা সিনেমা। আপনারা না হয় দেখে নেবেন। এবার গল্পের বাঁধের গল্পটা বলা যাক।
গল্পের পটভূমি কানাডার সর্ব পশ্চিমা প্রদেশ ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার রকি মাউন্টেইন রেঞ্জে। সিনে গ্ল্যামার উত্তম কুমার এখানে ছিলেন না। থাকার কথা নয়। এটা কোনো ফিকশন গল্প নয়। নন-ফিকশনের নায়ক হন রাজনীতিবিদ, ক্রীড়াবিদ, সমাজসেবী আর বিজ্ঞানীরা। এ গল্পের মহানায়ক একজন রাজনীতিবিদ। ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার জনপ্রিয়তম প্রিমিয়ার (মুখ্যমন্ত্রী) উইলিয়াম এন্ড্রু সেসিল বেনেট। সংক্ষেপে ডব্লিউএসি বেনেট।
ভালোবেসে লোকে তাঁকে ডাকতো ওয়েকি বেনেট বলে। ১৯৫২ থেকে ১৯৭২ টানা বিশ বছর প্রিমিয়ারগিরি করেছেন বিপুল জনপ্রিয়তায়। কনজারভেটিভ পার্টির এ নেতার নেতৃত্বে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ানরা অসাধ্য সাধন করেছিলো। দূর্গম গিরি রকি মাউন্টেইনের কোলে জলবিদ্যুত উৎপাদনে বাঁধ নির্মাণ করেছিলো। পরবর্ত্তীতে স্বীকৃতি স্বরূপ বাঁধের নামকরণ তাঁরই নামে হয়। মাটির বাঁধ হিসাবে এটিই কানাডার বৃহত্তম বাঁধ। এবং বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মাটির বাঁধ।
রকি পর্বতমালা যুক্তরাষ্ট্র থেকে কানাডা প্রবেশ করে গড় উচ্চতা কমিয়ে ফেলেছে। আশেপাশে ছড়িয়েছে অনেক উপপর্বত। কানাডা রকি’র উচ্চতম শৃঙ্গ মাউন্ট রবসন। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ১৩ হাজার ফুট উঁচুতে। মাউন্ট রবসন থেকে উত্তরে ৬২২ কিলোমিটার হাঁটলেই ডব্লিউএসি বেনেট বাঁধ।
হাঁটার কথায় ভয় পেলেন? উপায় নাই। এখনো গাড়ি চলাচল উপযুক্ত রাস্তা তৈরী হয়নি মাউন্ট রবসন থেকে। ভয়ঙ্কর দুর্গম স্টিপ হিলস সাইকেল ট্র্যাক আছে। দুঃসাহসী অভিযাত্রিকেরা হাঁটাপথ বা সাইকেলে আনন্দ পান। কেউ চাইলে আলবার্টার ট্যুরিস্ট প্লেস জেসপার থেকে গাড়ি নিয়ে বাঁধ অব্দি পৌঁছাতে পারেন।
প্রকৃতি এখানে ভূস্বর্গ কাশ্মীর। নেটিভ জনগণের বসবাস। মাতৃ ও পৈত্রিক নিবাস কানাডিয়ান আদি বাসিন্দাদের। এঁদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়লেন ওয়েকি বেনেট। খুউব স্পর্শকাতর বিষয়। স্বেচ্ছায় পুনর্বাসিত হতে না চাইলে এঁদের জোরাজুরি করে ওঠানো যাবেনা। আবার বাঁধ বানাতেই হবে। বিদ্যুত চাহিদা পূরণে সেমূহুর্তে বিকল্প একটাই! জলবিদ্যুত কেন্দ্র।
সরকার মানবিক হতে চেয়েছিলো। ১৬ মিলিয়ন ডলারের সেটেলমেন্ট খরচ এবং মূদ্রাস্ফিতির কারণে আরো ১.৬ মিলিয়ন ডলার বিতরন করা হয়। এতেও সন্তষ্ট হতে পারেনি আদিবাসিরা। বাপ দাদার ভিটা কি টাকার বিনিময় বেঁচা যায়? সরকার নির্মাণ কাজের পুরো পাঁচ বছর তাঁদের সংসার খরচ চালায়। প্রতি পরিবারকে নির্ধারিত পরিমানের ৩০০ শতাংশ বেশি ওয়েলফেয়ার ভাতা প্রদান করা হয়।
প্রায় পাঁচ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ রকি পর্বতমালা যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো থেকে উত্তরদিকে দৌড়াতে দৌড়াতে আলবার্টার ভেতর দিয়ে কানাডায় ইমিগ্রেশন নিয়েছে। পথে তৈরী করেছে অসংখ্য পাহাড়ি ঝরনা। সুপেয় মিঠা পানির শান্ত লেক বা হ্রদ। নামের মর্যাদা রেখে বিভিন্ন রঙের রক বা পাথরে শরীর সাজিয়েছে। অনেক জায়গাতে তাই সবুজের অভাব। কিন্তু ঈশ্বরে অবিশ্বাসীদের বোঝাতে বাপ্পী লাহিড়ীর গানের সাথে সুর মিলিয়ে বলেছে, “ওদের বুঝিয়ে দাও সেই তুমি, পাথরে ফুল যে ফোটাও…মঙ্গল দীপ জ্বেলে।” রকি পর্বতের পাথুরে চামড়ায় অসংখ্য ফুলের সমারোহ।
ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার উত্তর পূর্ব দিকে রকি মাউন্টেইনের দুটো বেসিন। বেসিন জলে উৎপন্ন নামবিহীন হ্রদের পরে নাম দেয়া হয় উইলিস্টন লেক। বেনেট মন্ত্রীসভায় রে উইলিস্টন ছিলেন ভূমি ও জল মন্ত্রী। তাঁর সম্মানে লেকের নামকরণ। লেক থেকে জন্ম দুটো নদীর। ‘কলাম্বিয়া’ রিভার এবং ‘পিস’ রিভার। ১৯৫৭ সালে বারোটি লোকেশন নির্ধারণ করা হয় দুই বেসিনে। উপযুক্ত স্থানে বাঁধ বানাতে এখান থেকে একটি লোকেশন বের করার দায়িত্ত্ব দেয়া হয় বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের। এর নেতৃত্বে ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার একজন পদার্থ বিজ্ঞানী (অধ্যাপক)। পানির উচ্চতা, চাপ, গতিপ্রবাহ সহ হাইড্রোলজি এবং হাইড্রোলিকসের সকল এনালাইসিস শেষ করে তিনি সিদ্ধান্ত দিলেন পিস রিভার মুখেই বাঁধ নির্মাণ করা হবে।
প্রিমিয়ার ওয়েকি বেনেট এবং তাঁর জনগণ শুনেই যেনো শান্তি পেলেন। আহ.. পিস রিভার। কী শান্তি! কী শান্তির নদী!
পিস নদীর পাড়ে শান্ত বুনো ঝোপ। ছোট সেইজব্রাশ গাছের ঝোপ। তার ওপারে পাইন আর সেডারের সারি। ফাঁকা জায়গায় হোয়াইট স্প্রুস ছড়িয়ে। আছে উইলো, কটনউড, এ্যাসপেন আর ডগলাস ফার। বাঞ্চবেরির ফুল ফুটে আছে এখানে সেখানে। নিসর্গের মাঝে জলবিদ্যুত উৎপাদনে নির্মিত হবে বাঁধ। “আ ড্যাম অন দ্য রিভার পিস।”
শুরুতে প্রকল্পের নাম দেয়া হলো পোরতাজ মাউন্টেইন ড্যাম। ষাটের দশকের গোড়ায় বিজ্ঞানীদের রেখে যাওয়া ডাটার ভিত্তিতে প্রকৌশলীরা ড্যাম ডিজাইন শুরু করলেন। জলের গতি, ভিসকোসিটি, সারফেস টেনশন, স্রোত, চাপ ইত্যাদি বিবেচনায় কংক্রীটের ড্যাম নাকি মাটির ড্যাম করবেন সে হিসেব কষতে লাগলেন। দেখলেন মাটি দিয়েই এখানে পর্যাপ্ত শক্তিশালী ড্যাম কাঠামো করা যাবে। সাশ্রয় হবে মিলিয়নস অব ডলার। উৎপাদিত হবে ২,৭৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুত যা বছরে সর্বমোট ১৩.৩০ টেরাওয়াট-আওয়ার।
হাইড্রোলিক হেড (উচ্চতা), প্রশার (চাপ) এবং অন্যান্য সকল প্যারামিটার ক্যালকুলেশনের পর ড্যামের ডিজাইন উচ্চতা দাঁড়ালো ১৮৭ মিটার, প্রশস্ততা ৮০০ মিটার। দৈর্ঘ্য ২০০০ মিটার। প্রয়োজনীয় মাটির একটি আনুমানিক হিসাব বের করা যাক। মাটির স্লোপ আপস্ট্রিম ১ঃ২.৫ ডাউনস্ট্রিম ১ঃ১.৭। বাংলাদেশের ৫ টন লেখা ট্রাকগুলো গড়ে ১৬০ থেকে ১৭০ সিএফটি দোঁআশ আলগা কাদামাটি বহন করে। কম্প্যাক্টেড সয়েল বিবেচনায় বাংলাদেশী ট্রাক মাপে সাড়ে চার কোটির বেশি ট্রাক মাটি এ প্রকল্পে ব্যবহার করা হয়েছে।
সবচে কঠিন চ্যালেঞ্জ এবার সামনে। কাগজের বাঁধ বাস্তবে নির্মাণ। দূর্গম এলাকার কন্স্ট্রাকশন কতোটা কঠিন আমি তা জানি। সাধারণ মানুষের কল্পনায় আনা কঠিন। এখানে জলে হাঙর কুমিরের ভয় নেই, কিন্তু ডাঙায় নির্ভয়ে ঘুরে বেড়ায় নেকড়ে আর ভালুক। শ্বেত ভালুক। সাথে মাউন্টেইন লায়ন, কানাডিয়ান বুনো মহিষ (moose)। গরমের দিন পা বাড়ালেই বিষধর র্যাটলস্নেক। এরি ভেতর হাজার হাজার প্রকৌশলী, ফোরম্যান, টেকনিশিয়ান এবং দক্ষ-অদক্ষ শ্রমিক। ১৯৬১ সালে ক্যাম্প পোঁতা হলো জঙ্গলে। তেষট্টি সালে পূর্ণোদ্যমে কাজ শুরু। ক্যাম্প গোটানো হলো ১৯৬৮ সালে।
কাজ শেষে এই প্রকল্পে কতোজন প্রকৌশলী বা নির্মাণকর্মী ফিরে আসতে পারনেনি অর্থাৎ জীবন দিয়েছেন, সেই তথ্য অনেক অনুসন্ধান করেও পাইনি। মানুষ খেকো প্রকল্পগুলোয় অনেক প্রকৌশলীকে হারিয়ে ফেলি আমরা। সে খবর কেউ জানেনা। কিংবা রাখেনা।
বাঁধ নির্মাণে প্রকৃতির জলের সাথে আমাদের মতো নগন্য প্রকৌশলীদের আত্মিক সম্পর্ক। সাধারণ মানুষ তা বোঝেনা। তাঁরা কেবল যন্ত্রের ঘড়ঘড় শব্দ, বিদ্যুতের ট্রান্সফর্মার, ইস্পাত, কংক্রীটের ঢালাই দেখে। ভেতরের মাটি আর জল দেখেনা।
টরন্টো, কানাডা
