স্থাপত্যে হার্ডরক গিটার ফ্লোরিডা

স্থাপত্যের নান্দনিক সৌন্দর্য যতো বাড়তে থাকে প্রকৌশলগত অবকাঠামো এবং অন্যান্য ডিজাইন ততো কঠিন হতে থাকে

হোটেল কর্তৃপক্ষ বানিজ্যে বিশ্বাসী। ব্যবসায় মুনাফা কতো এলো সেটিই তাঁদের বিবেচ্য। তাই আর্কিটেক্ট সাহেবদের সাফ জানিয়ে দিলেন, হার্ডরক গিটারের আদলে ভবন বানাতে হবে, তবে অবশ্যই তিনটি বানিজ্যিক চিন্তা মাথায় রেখে। বাজেট, সংক্ষিপ্ত নির্মানকাল এবং নির্ধারিত সংখ্যক হোটেল কক্ষ। এই তিনে হাত দেয়া যাবেনা।

ব্যাপারটি এমন যে পেছনমুড়ে দুহাত বেঁধে বলা হলো, ভাই একটু চমৎকার আর্টিস্টিক মুডে সিগারেট ধরান! সিগারেট ধরানো দূরে থাক, প্যাকেট খোলাইতো সম্ভব নয়! তাই বলে বানিজ্যের কাছে হেরে যাবে শিল্প? না, আর্কিটেক্ট সাহেবরা হারতে চাননা। একটা চ্যালেঞ্জ গ্রহন করলেন। প্রকৌশলীদের মেধা আর দক্ষতাকে যদি কাজে লাগানো যায় তবে এই চ্যালেঞ্জ অবশ্যই জেতা যাবে।

- Advertisement -

স্থাপত্যের নান্দনিক সৌন্দর্য যতো বাড়তে থাকে, প্রকৌশলগত অবকাঠামো এবং অন্যান্য ডিজাইন ততো কঠিন হতে থাকে। সিভিল, মেকানিক্যাল এবং ইলেক্ট্রিক্যাল ডিজাইন জটিল হলে ইঞ্জিনিয়ারিং ফি আনুপাতিক ঘন্টাহারে বাড়তে থাকে। সমানুপাতিক মাত্রায় বাড়ে নির্মাণ খরচ। তাহলে বাজেট এবং নির্মাণের মেয়াদকাল পুরোটাই নির্ভর করছে প্রকৌশলীদের উপর। কেবল হোটেল কক্ষের আকাঙ্খিত সংখ্যাটি আর্কিটেক্ট হিসাব করে নির্ধারণ করতে পারবেন।

চুলচেরা বিশ্লেষণের পর মালিক পক্ষের সাথে উপর্যুপরি মিটিং হলো। শিল্প, নান্দনিকতা, কক্ষ সংখ্যা, নির্মাণ সামগ্রী সংগ্রহ, নির্দিষ্ট মেয়াদকাল, দরদাম ইত্যাদি নিয়ে বাকবিতন্ডা। অবশেষে বানিজ্যিক উদ্দেশ্য এবং বাহ্যিক শৈল্পিক কাঠামো ঠিক রেখে প্রকল্পের চূড়ান্ত পরিকল্পনা গৃহীত হলো।

ডিজাইন ফেজে শুরুতেই হোঁচট খেলো স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়াররা। কয়েকবার ট্রায়াল এন্ড এরোর মেথডে পরীক্ষার পর নতুন সিদ্ধান্ত হলো। খরচ এবং সুবিধা বিবেচনা করে রেক্টাংগল ভবনে গিটারের খোলস না লাগিয়ে পুরো বিল্ডিং গিটারের আদলে গড়ে তোলা।

আর্কিটেক্টের জন্য এবার নতুন সমস্যা হয়ে গেলো কক্ষের সংখ্যা ঠিক রাখা! কারণ গিটারের কোথাও সরু কোথাও চ্যাপ্টা। চ্যাপ্টা জায়গায় কক্ষ সংখ্যা ঠিক থাকলেও সরু এলাকায় কমে যাচ্ছে। এখন কক্ষ সংখ্যা ঠিক রাখার একমাত্র উপায় ভবনের উচ্চতা বাড়ানো। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ বলে দিয়েছে ৪৫০ ফুটের উপর এক সুতাও বরদাস্ত করা হবেনা। কারণ বাড়ির পাশে এয়ারপোর্ট!

কক্ষ সংখ্যার হিসাব মেলানো ভার হলো স্থপতিগণের। তাহলে উপায়? উপায় একটি আছে। প্রতি তলার কংক্রীটের স্ল্যাবের পুরুত্ব কমানো। সেটি হিসাব করার দায়িত্ব প্রকৌশলীদের। অতিরিক্ত দায়িত্ব নিয়ে প্রকৌশলীরা নতুন অংক কষতে শুরু করলেন। লোড ক্যালকুলেশন করে ফ্লোরের ওজন আর কমানো যাচ্ছেনা! তাহলে পুরুত্ব কমবে কি করে? শেষতক ডেসিমন কমসাল্টিংএর প্রকৌশলীরা সিদ্ধান্ত নিলেন প্রি-টেনশনের পরিবর্তে পোস্ট-টেনশনড স্ল্যাব ব্যবহার করবেন। এতে স্ল্যাবের পুরুত্ব ৯ থেকে ১২ ইঞ্চির ভেতরে রাখা সম্ভব হবে। সরু চ্যাপ্টা বক্রতাগুলোয় ব্যবহার করা হবে ৪০ ডিগ্রি হেলানো কলাম।

অনেক চড়াই উৎড়াইয়ের ভেতর দিয়ে শেষ হলো ৪৭০ কক্ষের ৩৬ তলা হোটেলের আর্কিটেকচারাল এবং ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইন পর্ব। সামনে এবার নির্মানের চ্যালেঞ্জ। একাবিংশ শতকের একেবারে গোড়ায় পুর্ণোদ্যমে চলতে লাগলো নির্মান কাজ। নির্মানে ব্যবহৃত হলো প্রায় ১০ লক্ষ ৮০ হাজার সিএফটি (৩০ হাজার ৫’শ ঘন মিটার) কংক্রীট। বিশ্বখ্যাত সিমেন্ট প্রতিষ্ঠান সিমেক্স গিটার ভবন নির্মানে কংক্রীট সরবরাহ করে।

ভবনের আর্কিটেকচারাল ডিজাইনের মহান দায়িত্ব পালন করে “ক্লেই জুবা ওয়াল্ড” নামের একটি স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান। জন ক্লেই, ড্যান জুবা এবং জন ওয়াল্ড নামের তিন খ্যাতিমান আর্কিটেক্টের সম্মিলিত উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত আর্কিটেকচারাল ফার্ম “ক্লেই জুবা ওয়াল্ড”। বিশ্ব ক্যাসিনো রাজধানী লাস ভেগাসে এর অবস্থান। ওহো… বলতে ভুলে গেছি, গিটার হোটেলের সাথেই রয়েছে বিশাল ক্যাসিনো। সাকুল্যে ১ লক্ষ ৪০ হাজার স্কয়্যার ফুটের গেমিং জোন। জুয়ার নেশায় চেপে বসলে বিমানে লাস ভেগাস যাবার দরকার নেই। ড্রাইভ করে টরন্টো থেকে মিয়ামি গেলেই হবে। যদিও তেইশ ঘন্টা স্টিয়ারিং ধরে বসে থাকতে হবে।

হাইরাইজ ভবনগুলি সাধারনত ইঞ্জিনিয়ার্স ডমিনেটেড হয়। আর্কিটেক্টকে ইঞ্জিনিয়ারের পরামর্শ সহকারে ভবনের প্ল্যান তৈরী করতে হয়। এই ভবনের পরামর্শক প্রকৌশলী ছিলো যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্ম ডেসিমন কনসাল্টিং ইঞ্জিনিয়ার্স। তাঁদের স্ট্রাকচারাল ডিজাইন অনুযায়ী ভবনটি আজকে ফ্লোরিডার হলিউডে ঠাঁই দাঁড়িয়ে। এই হলিউড কিন্তু ক্যালিফোর্নিয়ার সিনেজগৎ নয়। এই হলিউড ফ্লোরিডার মিয়ামি শহর থেকে সামান্য উত্তরে একটি স্বতন্ত্র এলাকা। অতল আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ে।

মহামারি কোভিড দূর হোক। একবার ঘুরে আসুন সপরিবারে। কাছেই মিয়ামি বীচ। ডিজনিল্যান্ডও বহুদূরে নয় এখান থেকে। এক টিকেটে তিন ছবি! এমন সুযোগ ছাড়ে কে?

 

টরন্টো, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent