
বাংলা মোটর মোড়ের পেট্রোলপাম্প লাগোয়া সরু গলিটার মুখেই একটা সাইনবোর্ড। সেই সাইনবোর্ডে হালকা ইয়েলো অকার রঙে ফ্রি হ্যান্ডে লেখা ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র’।
লেখার শুরুতে একটা লোগো। সেই লোগোতে একটা বই এবং আলোর একটা শিখা। ফ্রি হ্যান্ড লেটারিংটা আমার খুব পরিচিত। এটা শিল্পী হাশেম খানের করা। বাংলাদেশের প্রখ্যাত শিল্পী হাশেম খান।
একধরণের নিস্তরঙ্গ শুনশান মফস্বলগন্ধী সেই গলিতে প্রবেশ করে খানিকটা এগোলেই হাতের ডান দিকে বৃক্ষ এবং পাতার ঘনসবুজ আর গাঢ়খয়েরি আলো-আঁধারিতে কী বিপুল গৌরব আর অনিঃশেষ মমতা নিয়ে দাঁড়িয়ে দেড়তলা সাইজের দোতলা একটি ছোট্ট বাড়ি। বাড়ির মূল ফটক পেরোনো মাত্র ডানপাশের লন-এর সবুজ দুর্বাঘাসের মখমল কার্পেট স্বাগত জানাবে নিঃশব্দে। অতঃপর অজস্র আমেরমুকুলের মাতালকরা গন্ধ কিংবা বেলীফুলের উদাস করা সুবাস অথবা কামিনী ফুলের সুতীব্র ঘ্রাণ এসে জড়িয়ে ধরবে—এসো বন্ধু এসো। এই বাড়িটিকে কেন্দ্র করেই আমাদের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। এই বাড়িটিতে একজন ‘স্বপ্নের ফেরিঅলা’ থাকেন। এখানে বসেই তিনি স্বপ্ন বিক্রি করেন। তাঁর ক্রেতারা সবাই বয়েসে নবীন। এরা তরুণ কিন্তু সংযত। ক্ষীণদেহী কিন্তু বলিষ্ঠ। একটা বিস্ফোরণ ঘটাতে টগবগ করছে সারাক্ষণ, কিন্তু উদ্ধত নয় এদের কেউই। এই তরুণদের সামনে মামুলি শাদা পাজামা আর খদ্দরের সাধারণ পাঞ্জাবি পরা অসম্ভব দ্যুতিময় চোখ আর মুগ্ধতায় ভাসিয়ে নেয়া হিরণ্ময় কণ্ঠস্বরের একজন ফেরিঅলা অনর্গল বলে চলেছেন তাঁর স্বপ্নের কথা। তিনি আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। আমাদের বইপ্রেমী তরুণদের একালের সক্রেটিস। তরুণদের মস্তিষ্কে তিনি বিরামহীন অক্লান্ত রোপন করে চলেন সেই সম্মোহনী মন্ত্র—‘মানুষ তার আশার সমান বড়’।
আলোকিত মানুষ আর সম্পন্ন মানুষের স্বপ্ন বুকে ধারণ করে তিলতিল যত্নে গড়ে তুলেছেন তিনি দেশের একমাত্র আলোর ইশকুল—বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র।
আমাদের চারপাশে যখন ভণ্ড-প্রতারক-লোভী-আত্মকেন্দ্রিক-মূর্খ একটি লুটেরা শ্রেণী বিকশিত হচ্ছিলো আবিশ্বাস্য দ্রুততায়, এবং কূপমণ্ডুক রাজনৈতিক নেতৃত্ব যখন তাদের অন্ধ অনুসারীদের বিপুল সমর্থন নিয়ে নিজেদের সর্বগ্রাসী তমসাচ্ছন্ন থাবাটির বিস্তার ঘটিয়ে যাচ্ছিলো নির্বিঘ্নে, তখন একজন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এগিয়ে আসেন অতিশয় ক্ষুদ্র একটি আলোকশিখা হাতে। শিল্পী হাশেম খান কেন্দ্রের লোগোতে সেই ক্ষুদ্র কিন্তু অবিনাশী আলোক শিখাটিকেই মূর্ত করে তুলেছেন।
বাংলা মোটরের ছোট্ট সেই বাড়ির লবিতে-সিঁড়িতে-অডিটোরিয়ামে-লাইব্রেরিতে-ছাদে সর্বত্র একদল কিশোর-কিশোরী আর তরুণ-তরুণীর অস্থির চঞ্চল পদক্ষেপ আর তাদের অফুরন্ত কলকাকলি সারাক্ষণ একটা প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর ঝলমলে আবহ তৈরি করে রাখতো। এইখানে এলে চরম নৈরাশ্যবাদীরও চিত্তচাঞ্চল্য ঘটতো। সবকিছুতে হতাশ সেই নৈরাশ্যবাদীটি নিতান্ত অনিচ্ছায় অনুভব করতে বাধ্য হতো যে—কিছু একটা হচ্ছে এখানে। একটা কিছু ঘটছে এখানে। কিন্তু কী সেটা?
এই প্রশ্নের উত্তরটা বেশ বিমূর্ত। খালি চোখে দেখা যায় না। কিন্তু অনুভব করা যায় যে একটা কিছু ঘটছে। ঘটেই চলেছে। সেই একটা কিছুর প্রভাবে দেশের নানান প্রান্তে নানান সেক্টরে আমরা কিছু আলোকিত মানুষ পাচ্ছি। সম্পন্ন মানুষ পাচ্ছি। যাঁদের সম্মিলিত জাদুর পরশে একদিন ফুটে উঠবে আলো। ঘুচে যাবে অন্ধকার। পালটে যাবে দেশ। পাল্টাবে দেশের মানুষের নিয়তি।
আমি, আমরা আমাদের যৌবনের সবচে উজ্জ্বল সময়টা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রকে দিয়েছিলাম। রবীন্দ্রনাথ থেকে ধার করে বলি—‘আমি তোমারই সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ।’ হ্যাঁ, আমাদের প্রাণ বাঁধাই ছিলো বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সঙ্গে। কোনো শুক্র-শনি ছিলো না। ঝড়-বৃষ্টি-পিচগলা খরতাপ-বরফঠান্ডা শৈত্যপ্রবাহ-অসহ্য লোডশেডিং কিছুই আটকাতে পারতো না আমাদের। একটা সময় ছিলো যখন আমার, আমাদের কতিপয় তরুণের জীবনটাই ছিলো কেন্দ্র কেন্দ্রিক। কিন্তু কেনো? কিসের টানে আমরা প্রতিদিন ছুটে গেছি বাংলা মোটরের সেই ছোট্ট বাড়িটাতে? অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সম্মোহনী আকর্ষণ ছাড়াও আরো কিছু একটা ছিলো সেখানে। উজ্জ্বল উচ্ছ্বল প্রাণবন্ত একদল মুক্তোখচিত চকচকে ঝকঝকে ছেলেমেয়ে ছাড়াও কিছু একটা ছিলো সেখানে। সারা পৃথিবীর সেরা বইগুলোর সুবিপুল সমাহার ছাড়াও কিছু একটা ছিলো সেখানে।
সেই কিছু একটার আকর্ষণে এখন, বর্তমানের স্বপ্নবান তরুণরাও ছুটছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পানেই। আমি জানি আগামীতেও ছুটবে আরেকটিদল। প্রজন্মের এই রিলে রেস–চলতে থাকুক অনিঃশেষ।
দুই
এই মুহূর্তে আমার কাছে সবচে আনন্দের সংবাদটি হচ্ছে—আমাদের স্বপ্নের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তার যৌবনদীপ্ত পঁয়ত্রিশ বছর পূর্ণ করতে চলেছে! আহা প্রিয় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তুমি বড় হচ্ছো! তোমার হাত ধরে ধরে আমরাও তো বড় হচ্ছি! বলা উচিৎ আমরা বুড়ো হচ্ছি আর তুমি দিন দিন নতুন যৌবনের সঞ্জীবনী সুধায় দীপ্র-ক্ষিপ্র আর অপরূপ হয়ে উঠছো! তোমাকে অভিবাদন।
তিন
আমাদের স্বপ্নের সেই বাড়িটা এখন আর আগের চেহারায় নেই। স্মৃতির শ্যাওলাজমা দেড়তলা সাইজের দোতলা সেই বাড়িটা এখন অতি আধুনিক মহাজাঁকজমকপূর্ণ বহুতল ভবন হিশেবে আকাশ ছুঁতে চাইছে। কেন্দ্রের সেই আমগাছটি এখন আর সহস্রমুকুলের গন্ধে কাউকে মাতাল করে তোলে না। ইস্ফেন্দিয়ার জাহেদ হাসান মিলনায়তনটিও নেই আর। অতিউঁচু ভবনের আড়ালে চাপা পড়ে গেছে আটপৌরে আন্তরিকতায় পরিপূর্ণ কেন্দ্রের সেই পলেস্তারা খসেপরা পুরনো হার্দিক উন্মুক্ত ছাদটিও। কেন্দ্রের মূল ফটকে প্রবেশমুখের সবুজ দুর্বাঘাসের কার্পেটটিও উধাও হয়েছে। কামিনী ফুলের তীব্র ঘ্রাণের বদলে কেন্দ্রে আসা অতিথিকে জড়িয়ে ধরে বেলজিয়ামের মূল্যবান কাঁচের চাকচিক্যময় অচেনা এক রৌদ্রের প্রতিচ্ছায়া।
পরিবর্তনকে আমি অস্বীকার করি না। আধুনিকতাকে আমি ভয়ও পাই না। কিন্তু বাংলা মোটরের সেই জাদুমাখা গলির ভেতরে প্রবেশ করলেই আমি কেমন নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হই। আমার বুকটা হুহু করে ওঠে। চোখ দুটো জলে ভরে যায়। অইতো আমার প্রিয় আঙিনা। আমার যৌবনের বহু আনন্দ-বেদনার ছায়াসঙ্গী। আমার সৃজনশীলতার অপরূপ ক্যানভাস।
জয়তু বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র—হে বন্ধু আমার…
জয়তু আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ—ও বন্ধু আমার…
অটোয়া, কানাডা
