টরন্টোর বাঙালি সমাজে মহাদেব চক্রবর্তী : যে পথে আমি যে গেছি বারবার….

বার্ধক্যের যন্ত্রণা ছাড়াও একাকীত্বের একটি যন্ত্রণাও তো আছে

ড. মহাদেব চক্রবর্তী দেহত্যাগ করেছেন। যন্ত্রণা থেকে তিনি মুক্ত হয়েছেন। বার্ধক্যের যন্ত্রণা ছাড়াও একাকীত্বের একটি যন্ত্রণাও তো আছে! মহাদেব দা তাঁর স্ত্রীকে অনেক ভালোবাসতেন। সেই মধুর স্মৃতি তাঁকে উজ্জীবিত রেখেছিল, আবার বিরহের মধুর যন্ত্রণাও দান করেছিল।

তার আগে মহাদেবদার আজকে চলে যাওয়ার খবর শোনার সঙ্গে সঙ্গে আমার আরেকজন মহাপ্রাণ মানুষের মুখচ্ছবিটি ভেসে ওঠলো। তিনি ড. অমর মুখার্জি। বহুবছর আগে টরন্টোয় কোন বাঙালিদের [ উভয় বাংলার ] কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজনে দর্শকদের কাছে গিয়ে অমর দা ও মহাদেবদা একটা কৌটা, বৈয়ম অথবা নক্সা করা কোন বেতের পাত্র হাতে টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা পাঠদান কার্যক্রমের সাহায্যের জন্যে জনে জনে অর্থ চাইতেন৷ অমর দা ও তাঁর স্ত্রী রুবী মুখার্জি ফি বছর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজনও করতেন এই লক্ষে। অমর দা গত হয়েছেন বেশ কিছু বছর হয়ে গেল। আজ চলে গেলেন মহাদেব দা৷ আশা করি তাঁর কষ্ট কম হয়েছে। অথবা শেষ পর্যন্ত তিনি মৃত্যু যন্ত্রণার কষ্ট থেকে মুক্তি পেয়েছেন।

- Advertisement -

চার-পাঁচ মাস আগে এক অশীতিপর চপলালক্ষ্মী পোলিশ তরুণীর সঙ্গে কথা হচ্ছিল পথে যেতে যেতে। উননব্বই বছরের তরুণী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মর্মস্পর্শী স্মৃতি উত্থাপন করে বলছিলেন, তাঁর ও তাঁর স্বামীর পরিবারের কত মানুষকে হিটলার বাহিনী হত্যা করেছিল। তাঁর স্বামীর কথা উঠতেই আমি জিজ্ঞাসা করলাম এখন কি তিনি চারপাশের কোথাও আছেন? তরুণী বললেন – তিন মাস আগে তিনি মৃত্যুবরণ করতে পেরেছেন! [ Three months ago he was able to Die! He was Very sick, and it was very Painful for him! ]

যন্ত্রণাদগ্ধ অসুস্থ প্রিয়জনের মৃত্যু ভাবনা নিয়ে উননব্বই বছরের তরুণীর কথা শুনে আমার আরেকটি দৃষ্টি খুলে গিয়েছিল। মহাদেবদার মৃত্যুকেও আমি যন্ত্রণা থেকে মুক্তি বলেই বিবেচনা করি।

২.

মহাদেবদার শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবন নিয়ে কিঞ্চিৎ আলোকপাত করেছেন অনেকেই। আমি সেদিকে না গিয়ে, তাঁর নামটি যে আমার কাছে অন্য এক ভালো লাগার, সে কথাটিই একটু বলি।

মহাদেব চক্রবর্তী নামটির সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় কবি হিসেবে। অনেক পরে আবিষ্কার করেছি তাঁর দানশীল মহানুভবতার কথা, পদার্থবিদ্যার অধ্যাপনার কথা। মহাদেব চক্রবর্তীর কবিতাও পড়েছি আমি এই শহরের পত্রপত্রিকায়। অসাধারণ ঠাসবুনটে সনেট লিখতেন মহাদেব দা। সারা বছরে হয়তো দু ‘ তিনটি কবিতা। পরে বছরে একটাও না। এমন সচেতন শব্দবোদ্ধা ছন্দযোদ্ধা প্রকরণ ও শৈলীশিল্পীর কবিতার কবিকে আমি খুঁজে পেলাম। তাঁর লেখা সনেট পাঠ প্রতিক্রিয়ায় আমি যে মুগ্ধতা প্রকাশ করি, প্রকারান্তরে তিনি আমাকেই তা ফিরিয়ে দেন!

৩.

পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক মহাদেব চক্রবর্তীর কবিতা পড়ে আমার মনে একটি আলাদা রকম ভাবনার উদ্ভব হয়। বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় পাঠ গ্রহণ করে যারা সৃজনশীলতার বিভিন্ন শাখায় চর্চায় মনোনিবেশ করেছেন, প্রায়শই তারা অনন্য উচ্চতায় নিজেদের স্থাপন করেছেন শুদ্ধ শিল্পের নিরিখেই। বাঙালির অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রাবন্ধিক প্রফুল্লচন্দ্র রায়কে তো পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কিছু নেই বাঙালিদের কাছে। এই সাধক বিশ্বখ্যাত রসায়নবিদই কাজী নজরুল ইসলামকে দেওয়া বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে সংবর্ধনা সভার সভাপতিত্ব করেছিলেন কলকাতায়। স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুর বিশ্বখ্যাত উদ্ভিদবিজ্ঞানীর পরিচয় না হয় একটু ভুলেই গেলাম। কোন আলোকের উদার মন্ত্রবলে তিনি রবীন্দ্রনাথের প্রিয়তম বন্ধুদের একজন হয়েছিলেন, সে কথা ভুলি কী করে! ইঞ্জিনিয়ারের তুখোড় ছাত্র বাঙালির প্রিয়তম কণ্ঠশিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে যে সলিল চৌধুরী ঈশ্বরের কণ্ঠস্বর অভিধায় অবিহিত করেছেন সেটাও না হয় বাদ দিলাম, গল্পকার হিসেবে যে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ‘দেশ’ পত্রিকার পাঠক মহলে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন এটা ভুলি কী করে! মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাশ করা ডাক্তার সুরকার নচিকেতা ঘোষের হৃদয়ে লেখা নামের সুর সৃষ্টি নিয়ে ভাবলে তো মাথা নষ্ট হয়ে যায়!

সারা ভারত বর্ষের সেরা বিজ্ঞানের ছাত্র বিনয় মজুমদার না হয় প্রেমের উন্মাদনায় আবেগের বানভাসি শব্দের ঝংকার তুলতে কার্পণ্য করেননি; কিন্তু, হাবীবুল্লাহ সিরাজী বুয়েটের মেধাবী ছাত্র হিসেবে অসামান্য সব শব্দের আঁচড় কেটে কেটে কবিতার বিদ্যুদ্দীপ্ত চিত্রকে এঁকে রাখতেন কীভাবে! স্থপতির পদবীকে মাটিচাপা দিয়ে সমকালের অন্যতম কবি হিসেবে রবিউল হোসাইনকে কি ভুলে থাকা যাবে! মাথা ঘুরে যাওয়ার মতো এই ভাবনা আমাকে ক্রমশ উন্মনা করে তুললো মহাদেবদার আরো কাছে গিয়ে!

৪.

আমরা পরস্পরের সনেটে মুগ্ধ, সেই প্রাগৈতিহাসিককালে মহাদেবদা প্রায়শই বলেন, ‘বাসায় এসো। গল্প করে দু’জনে খাবো।’

আমি সত্যিই এক দুপুরে মহাদেবদার বাসায় গেলাম। আমাদেরই বাঙালি পাড়ায় এক রুচিসম্মত অট্টালিকায় তাঁর ফ্ল্যাট। পুরনো বইয়ের সম্ভারে দেওয়াল ভর্তি তাক। একটি অতি পুরনো কাঠের ফ্রেমের রেডিওতে এফএম বেণ্ডে সারাক্ষণ একই স্টেশনে [ ৯৬.৩ এফ,এম ] বিঠোভেন, মোজার্ট, চাইকোভস্কি, ভার্দি, বাখ বেজেই চলেছে। এতো নিচুস্বরে যে, মনোনিবেশ না করলে কোলাহলের আড়ালে আলাদাভাবে কেউ শুনতেই পারবেন না। প্রথমদিন এক পশলা গল্প আড্ডা দিয়ে আমি একাকী বসে বসে পুরনো বইয়ের পাতা নাড়লাম।

অনেকদিন কোন হাতের আঙ্গুলের স্পর্শ না পেয়ে কোন কোন বইয়ের পাতার অগ্রভাগে যে ধুলোর মায়াময় আস্তরণ বাসা বাঁধে, সেরকম একটি বইয়ের পাতায় ফু দিয়ে নীরবতার মধ্যে ধুলোর আস্তরণকে সরিয়ে বইয়ের পাতায় একটি সঙ্গ দিলাম যেন। রেডিওতে ভেসে এলো ইহুদি মেনুহীনের বেহালা। ঠিক তখনই আমার মনে এরকম একটি ভাবনার উদয় হয়েছিল যে, সেই মুহূর্তটিকে হয়তো মহাদেবদার কারণেই একদিন স্মরণ করতে হবে!

মহাদেবদার ফ্ল্যাটের অট্টালিকার পাশ দিয়েই আমার নিত্য আসা যাওয়া। আমি জানি যখনই সেই পথ দিয়ে যাবো, রবীন্দ্রনাথের গানটির কথা মনে পড়ে যাবে, ‘এ পথে আমি যে গেছি বারবার……..’

 

টরন্টো, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent