গহীন মনের কাব্য

শিউলি বেগম ও রাজিব হাসানের ছিমছাম সংসারে এমন কোনো অভাব নেই যার প্রয়োজন তারা অনুভব করে

শিউলি বেগম ও রাজিব হাসানের ছিমছাম সংসারে এমন কোনো অভাব নেই যার প্রয়োজন তারা অনুভব করে। তবে সন্তান ও নাতি নাতনিদের অভাব, তাদের কাছে না পাওয়ার বেদনা তাদের  কুড়ে কুড়ে খায়।

তবে ছেলে সজীবকে অফিসের কাজে মাঝে মধ্যে ঢাকা আসতে হয় তখন সে বাসাতেই উঠে, ওটুকুই তাদের সান্ত্বনা। গত সপ্তাহেও সে এসেছিলো।

- Advertisement -

ছেলে যে কয়দিন ছিলো  শিউলি বেগম ছেলেকে তার পছন্দের খাবার রান্না করে খাইয়েছেন ও বউ নাতিদের জন্য বক্স ভরে ডিপ ফ্রিজে রেখে দিয়েছিলেন , ছেলে যাবার সময় সাথে দিয়ে দেন।

সজীবের আব্বার সখ ছাদে বাগান করা, প্রতিদিন বিকালটা স্ত্রীকে নিয়ে ছাদে কাটাতে ভালোবাসেন। ছেলেও আসার সময় বিভিন্ন গাছ নিয়ে আসে,এবারও নিয়ে এসেছিলো হলুদ ড্রাগন ফলের গাছ। বাপ ছেলে মিলে লাগিয়েছে। ছেলের কাজ শেষ হলে শুক্রবার দিনটা থেকে রাতে সে চলে গিয়েছিলো।

তারপরে আবারও বাসাটা একাকীত্বে ভরে উঠে। শুরু হয় কারো আসার প্রতীক্ষায় থাকা। মাঝেমধ্যে  তারা দুজন একটু এদিক-ওদিক বেড়াতে যায় এটুকুই।

শিউলি বেগম খেয়াল করেন বিবাহিত জীবনের এতটা বছর রাজীব সাহেব যতো কথা না বলেছেন রিটারমেন্টর পরের এই তিন বছরে তার চেয়ে বেশী  কথা বলছেন।

এখন তিনি অতীত জীবন নিয়ে বিচরণ করতে বেশী ভালোবাসন।

এর মধ্যে  আরো কয়েক বার রাজিব সাহেব স্ত্রী শিউলিকে তার শৈশব, কৈশোর ও কলেজ লাইফের সম্পর্কের কাহিনী বলার জন্য পিড়াপিড়ি করেছেন। কিন্তু বারবার শিউলি একই কথা বলেছে– দেখো সব বেলাতেই কাউকে না কাউকে দেখে ভালো লেগেছে এটা সত্যি কিন্তু তারা কখনও এটা জানতেও পারেনি।

–এটা ছিলো একান্তই আমার অন্ধ, বোবা ভাললাগা। আজ থেকে কয় যুগ আগে সেই সময়টায় কোনো মেয়েরই নিজের ভালোবাসার কথা প্রকাশ করার সাহস ছিলনা। কিছুদিন সেই অনুভূতিটা মনের মধ্যে থাকতো তারপর আবার মনের মধ্যেই মিলিয়ে যেতো।

–আর আসলে আমি খুব লাজুক ছিলাম , সেই জন্য কারো সাথে সম্পর্কেও কোনদিন জড়াতে পারিনি।

তারপর নিজের প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য শিউলি বলে –বাদ দাও তো আমার কথা,তুমি বরং আজ তোমার দ্বিতীয় ব্যার্থ প্রেমের কাহিনীটা বর্ণনা করো।

রাজিব সাহেবও স্ত্রীর  আগ্রহ দেখে হাসি মুখে তার দ্বিতীয় ব্যর্থ প্রেমের কাহিনী বর্ণনা শুরু করলেন।

–জানো শিউলি, হাই স্কুলে উঠেও  আমি আমাদের নিজ বাড়ি থেকে দুই মাইল দূরের স্কুলে গিয়ে লেখাপড়া করেছি। সেই ‘আলী আহাম্মদ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকেই আমি কৃতিত্বের সাথে মেট্রিক পাশ করেছি।

আমাদের মফস্বল টাউনে তখনও আলাদা করে মেয়েদের জন্য স্কুল গড়ে উঠেনি । সব ক্লাসেই পাঁচ ভাগের চার ভাগ ছেলে ও একভাগ মেয়ে থাকতো।

আস্তে আস্তে নবম-দশম শ্রেণীতে উঠার পর সেটা আরও কমে যেত। হয় মেয়েদের পড়া বন্ধ করে দেওয়া হতো নয় বিয়ে দিয়ে দেওয়া হতো।

পাকিস্তান আমলের ১৯৬৯ সাল। আমি তখন নবম শ্রেণীর ছাত্র। আমাদের ক্লাসে মাত্র আটজন মেয়ে পড়তো। এদের বসার জায়গাটা ছিল আমাদের টিচারদের টেবিলের  একপাশে।

পরপর দুটি  হাই বেঞ্চ ও দুটি লো বেঞ্চ নিয়ে ছিল মেয়েদের সীমানা, ওখানেই তারা বসতো।

আমাদের সব ছেলেদের কৌতুহল ছিলো তাদেরকে ঘিরে কিন্তু তাদের সাথে কথা বলার আমাদের কোনো সুযোগ ছিলো না। আমরা শুধু বারবার তাকিয়ে দেখতাম তারা কি করে।

তারা ক্লাশে চাপা কন্ঠে গল্প, হাসি ঠাট্টা করলেও আমাদের মন কৌতুহলী হয়ে উঠতো। কিন্তু তাদের গল্পে, হাসিঠাট্টায় যুক্ত হওয়ার কোনো সুযোগই আমাদের ছিলো না।

একটা ক্লাস শেষ হওয়ার পরে আরেকজন স্যার না আসা পর্যন্ত স্যার ক্লাসে থাকতেন অথবা দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেন। পরের ক্লাসের স্যার এসে ক্লাশরুমে ঢুকলে তিনি চলে যেতেন।

কখনো হঠাৎ যদি পরের স্যার আসতে দেরি করতেন অথবা অনুপস্থিত থাকতেন তখন স্যার মেয়েদেরকে সাথে নিয়ে চলে যেতেন। মেয়েরা স্যারদের অফিস কক্ষের পাশে তাদের কমন রুমে চলে যেতো।

আমরা তখন তাদের সম্বন্ধে নানান মন্তব্য করতাম, দুই একটা দুষ্টু ছেলে শ্রেণিকক্ষের মঞ্চে উঠে মেয়েদের নাম ধরে তাদের সৌন্দর্য, সাজগোজ, আচরণের আলাদা আলাদা বর্ণনা দিতো।

আমরা সব সময় মেয়েদের সাথে একটু সুযোগ পেলেই কথা বলার চেষ্টা করতাম, যদিও স্যারদের সতর্ক দৃষ্টির জন্য এটা খুব কমই সম্ভব হতো। তবে মাঝে মাঝে স্কুলে আসা যাওয়ার পথে রাস্তায় তাদের সাথে দেখা হলে আমরা কথা বলতাম, তখন কি যে ভালো লাগতো!

-আমাদের ক্লাসে রেহানা নামে একটা মেয়ে ছিল। তাকে আমার অন্য মেয়েদের চাইতে আলাদা মনে হতো। আমি সবসময় খেয়াল করতাম তার কথা,আচার ব্যবহার  অন্যদের চেয়ে বেশ ডিফারেন্ট। আর এই ধরনের মেয়েদের প্রতি আমি নিজের অজান্তেই আকৃষ্ট হয়ে যেতাম।

-আমাদের স্কুলের ছেলে মেয়েদের নির্দিষ্ট স্কুলের ড্রেস ছিলো, সবাই তাই পরে স্কুলে আসতো কিন্তু কোনো অনুষ্ঠান হলে তখন সবাই নিজের পছন্দ মত পোশাক পরে আসতো । তখনই বোঝা যেত কে কি ধরনের পোশাক পরে বা কতটুকু আধুনিক।

রেহানা ছিল স্মার্ট একটা মেয়ে। সে তখনকার চলিত আধুনিক পোশাক ঘারারা, চোস্ত পাজামা পরতো, তার সাথে মানানসই কামিজ, জামা পড়তো আবার সুন্দর সুন্দর জর্জেট, লাইলেনের উড়না পড়তো।

অন্য মেয়েরা অনুষ্ঠানে শাড়ি পরে আসলেও রেহানা কখনো পড়তো না। রেহানা অনুষ্ঠানের দিন খুব সুন্দর করে বিভিন্ন স্টাইলে চুল বাঁধতো আর তা আমাদের ছেলেদের গবেষণার বস্তু হতো।

–তখন আমরা কোন মেয়ে কি রকম পোশাক পড়েছে ,কে কিভাবে চুল বেঁধেছে, কে কিভাবে সেজেছে, কাকে কতটুকু মানিয়েছে এসব নিয়ে রীতিমতো আলাপের পাহাড় জমিয়ে ফেলতাম। তখন বলতে গেলে এটা আমাদের এক ধরনের বিনোদনই ছিলো।

এতোক্ষণ আমি মুগ্ধ স্রোতের মতো রাজিবের স্কুল জীবনের কাহিনী শুনছিলাম কিন্তু এবার আর চুপ করে থাকতে পারলো না। –আশ্চর্য তো! সেই সময় মেয়েদের সাজ পোশাক নিয়ে তোমাদের এতো গবেষনা ছিলো? কই আমাকে তো কোনোদিন বলোনি এই রকম করে সাজলে তোমাকে ভালো লাগে,বা আজকের সাজে তোমাকে অনেক সুন্দর লাগছে। তুমি তো মহা পাজি একজন মানুষ!

রাজীব সাহেব হাসতে হাসতে বল্ল–পাজি বলো আর যাই বলো, আমি সত্য কথাই বলি, তুমি তো সব গোপন করে রেখেছ। তুমি কি মনে করো আমি  তোমার কথা বিশ্বাস করেছি?

আমি বলেছিলাম– ঠিক আছে, তাহলে আর জিজ্ঞেস করো না।

এরপর রাজিব সাহেব বলতে থাকে–তবে জানো শিউলি, বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার পর থেকে আর কখনো কোন মেয়ের প্রতি প্রেমে পড়ার ভাবই আমার আসেনি। চাকরি কাজকর্ম নিয়েই ব্যস্ত থেকেছি।

রাজিব একটু হেসে বললো –হয়তো বার বার  প্রেমে ব্যর্থ হয়ে ক্লান্তি এসে গিয়েছিলো।

বিয়ের কনে দেখার ব্যাপারটাও আমি আব্বা-আম্মা ভাই বোনের উপরে ছেড়ে দিয়েছিলাম। বলতে গেলে তাদের পছন্দেই আমাদের বিয়ে । তবে দাম্পত্য জীবনের পদে পদে বুঝেছি  আমি একটুও ঠকিনি।

–জান শিউলি, বিয়ের পর থেকে তোমার উপরই আমার যতো মুগ্ধতা, বিশ্বাস, ভালোলাগা। সত্যি বলছি আমার কাছে তোমাকে সাজলেও ভালো লাগে, না সাজলেও ভালো লাগে। তুমি তোমার স্বাভাবিক সাজ, চালচলন দিয়েই আমাকে মুগ্ধ করে রেখেছো, আর কোনো দিকে তাকাবার ইচ্ছে মনেও আসেনি।

শিউলি রাজিবের এতো বছরের আচরনে এই কথাটা বিশ্বাস করে তবুও বলে–আচ্ছা হয়েছে, হয়েছে সাজগোজ করতে চাইলে তো অনেক কিছু কিনে দিতে হতো, এতে তোমার অনেক খরচ হতো তাই কিছু বলো না। আমি তোমার চালাকি সবই বুঝি!

যাক, এবার বলো ছ্যাকাটা কখন খেলে?

রাজিব তার স্বভাবসুলভ হাসে তারপর আবার বলতে শুরু করে–

রেহানার আব্বা সরকারি চাকরি করতেন, খোঁজ নিয়ে জেনেছিলাম তাদের  বাড়ি সিলেট। কিন্তু রেহানার কথায় কখনো সিলেটি আঞ্চলিক উচ্চারণ শুনিনি। সুন্দর শুদ্ধ উচ্চারণে সে কথা বলতো। রেহানা ছাত্রী হিসেবেও তুখোড় ছিলো। বিজ্ঞান শাখায় সে বরাবরই ফাস্ট সেকেন্ড হতো।

মনে পড়ে আমাদের ক্লাসে স্যার একবার জিজ্ঞেস করেছিলেন– ভবিষ্যতে কে কি হতে চাও? তখন রেহানা বলেছিলো,সে ডাক্তার হতে চায়।

সেদিন স্যার কয়েকজনকে জিজ্ঞাস করার পর আমাকেও জিজ্ঞেস করেছিলেন– রাজিব তুই কি হতে চাস?

আসলে আমার কোনো লক্ষ্য ছিলো না ,আমি  থতমত খেয়ে  জবাব দিলাম–না স্যার এখনও কিছু ঠিক করিনি। ।

জানো এর উত্তরে স্যার কি বলেছিলেন!

–“গাধারা আগে ভাগে কিছু ঠিক করতে পারে না “।

ক্লাসের সবাই হেসে উঠেছিলো, আমি খুব লজ্জা পেয়েছিলাম।

সেদিনই ঘটেছিল এক আশ্চর্য ঘটনা তারপর আমি একতরফা ভাবে রেহানার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম।

সেদিন স্কুল ছুটির পর আমি অনেকটা একা একা বাসার দিকে রওনা দিয়েছিলাম। আমার বন্ধুবান্ধব আমাকে নিয়ে ছুটির পরও হাসাহাসি করছিলো তাও আবার মেয়েদের সামনে।

ছুটি হওয়াতে ছেলে-মেয়ে সবাই আমরা যার যার বাসার উদ্দেশ্যে একসাথেই রওনা হয়েছিলাম।

আমার কাছের বন্ধুদের টিটকারি ও হাসাহাসিতে আমি মেয়েদের সামনে খুবই অপমানিত বোধ করেছিলাম।

তাই অনেকটা রাগ পুষেই তাদের সাথে না গিয়ে একাই হাঁটতে লাগলাম।

তখন একজন আবার পিছন থেকে টিটকেরি দিয়ে বলে উঠলো– এই গাধা এবার ঘোড়া হয়ে উঠার চেষ্টা করিস!

তখন কাছাকাছি রেহানাও ছিল। এই ব্যাপারটা সম্ভবত সে খেয়াল করেছিলো।

আমি কোনো দিকে না তাকিয়ে হনহন করে বাসার দিকে যাচ্ছিলাম। রেহানাও আরো দুটো মেয়েসহ বাসায় যাচ্ছিলো। হঠাৎ রেহানা আমাকে ডাক দিলো– এ্যই রাজীব শোনো,

আমি ঘাড় ঘুরিয়ে রেহানার দিকে তাকিয়ে শিওর হওয়ার চেষ্টা করছিলাম,আসলে আমাকেই কি ডাকছে?রেহানা আবার ডাকলো, আমি তার কাছে গেলাম।

রেহানা বলল–রাজিব আজকে স্যারের কথায় তুমি লজ্জা পেয়েছো না? তোমার বন্ধুরাও তোমাকে লজ্জা দিয়েছে। বুঝতে পারছি সেজন্য তোমার মন অনেক খারাপ হয়েছে। আরে বাদ দাও এসব কথা ! স্যাররা এভাবে বলেই থাকেন ,আর বন্ধুবান্ধবরাও সুযোগ পেলে একটু মজা করে ।

তারপর রেহানা বলেছিল –স্যার আমাদের জিজ্ঞাসা করলেন আর আমরাও আমাদের ইচ্ছা গুলি বললাম, কিন্তু বাস্তবে সব সময়  কি তা হয়?

আমাদের দেশে এই সমাজে,এই অবস্থায় কয়জনের স্বপ্ন পূরণ হতে দেখেছো? আর মেয়েদের বেলা তো কথাই নেই।

আমার স্বপ্ন ডাক্তার হওয়া, দেখা গেলো  আমি ডাক্তারি পড়তেই পারলাম না।

হয়তো আমার দিন কাটবে অন্য কোন কাজ করে, অথবা সিম্পলি একজনের ঘরনি হয়ে সংসার ধর্ম পালন করে।

আর তুমি এখনো ভাবনি কি হবে, অথচ দেখবে তুমিই বিরাট কিছু হয়ে গেছ।

তারপর সে আমাকে আরো মন দিয়ে পড়ার কথা বলে অন্য রাস্তা দিয়ে হেটে চলে গেল।

আমি রেহানার যাওয়ার পথে তাকিয়ে থাকলাম তারপর  মনের মধ্যে বিরাট এক প্রাপ্তি  নিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকলাম।

আমি সারা পথ স্যারকে ও বন্ধুদেরকে ধন্যবাদ দিতে দিতে আসলাম। কারণ আজকের লজ্জাজনক ঘটনাটা না ঘটলে রেহানার সাথে আমার কথাই হত না।

তারপর থেকে আমি রেহানা  নামের মানবিক মেয়েটার প্রেমে পড়ে গেলাম।

এরপর থেকে যে জিনিসটা হলো রেহানার প্রতি আমার মনে যেমন গভীর ভালবাসা জন্মালো তেমনই তার ” ভাল করে লেখাপড়া করবে”  কথাটা দৈববাণী হয়ে  ধরা দিল।

সত্যি আমি অবাক হলাম সেদিনের পর থেকে আমার পড়ালেখার আগ্রহ খুব বেড়ে গিয়েছিলো। আমার মনে হতে থাকলো রেহানার চাইতে আমাকে ভালো করতেই হবে। রেহানার পাশাপাশি থাকতে হলে আমাকেও ডাক্তারি পড়তে হবে।

দিন দিন ক্লাশে আমার পারফরম্যান্স ভালো হতে লাগলো। যেই জাকির স্যার আমাকে গাধা বলেছিলেন তিনিই আবার একদিন ক্লাশে ছাত্র-ছাত্রীদের বললেন– “তোরা কি একটা জিনিস খেয়াল করেছিস? গাধাটা যে মানুষ হয়ে গেলো রে! রাজিব তো সবাইকে অতিক্রম করে চলে যাচ্ছে। এবার মনে হয় আমাদের স্কুল থেকে রাজিব স্ট্যান্ড করবে “।

এরপর স্যার আবার বলেছিলেন–“এখন তো আমার আরো দু একজনকে গাধা বলতে ইচ্ছে করছে”।

মনে আছে তখন ক্লাশের প্রায় সব ছেলে মেয়েরা চিৎকার দিয়ে বলছিল– স্যার আমাকে বলেন, স্যার আমাকে বলেন।

কিন্তু আমিই শুধু জানতাম কি জাদুমন্ত্রে আমি মধ্যমানের ছাত্র থেকে সেরা ছাত্রে পরিণত হয়েছিলাম। সত্যি আমি মেট্রিক পরীক্ষায কুমিল্লা বোর্ডে মেধা তালিকায় ১৭তম স্থান অধিকার করেছিলাম।

স্কুলের পাট চুকানোর পর অনেকদিন রেহানাকে দেখিনা। রেহানা স্ট্যান্ড না করলেও ভালো রেজাল্ট করেছিলো।

রেহানাকে দেখার জন্যে আমার মন কেমন করছিলো। সত্যি একদিন সাহস করে  রেহানাদের বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। তাদের বাসার সামনে বেশ বড় একটা মাঠ ছিলো, সেখানে কয়েকটা ছেলেমেয়েকে খেলতে দেখলাম।

তাদের একজনকে রেহানার কথা জিজ্ঞেস করতেই বললো– আমার আপু, চলেন আপনাকে বাসায় নিয়ে যাই।

আমি তার নাম জিজ্ঞাসা করতে বললো -তার নাম আজহার।  মনে আছে অনেক জড়তা, ভয় নিয়ে আমি সেদিন তাদের বাসায় ঢুকেছিলাম।

রেহানা আমাকে দেখে খুশি হলো, তাদের ছিমছাম বসার ঘরে বসালো।

ওর আব্বা আম্মা আমার সাথে এসে দেখা করলেন, কথা বললেন। আমার রেজাল্টের প্রশংসা করলেন না। কোন কলেজে ভর্তি হবো, ভবিষ্যৎতে কি পড়তে চাই জানতে চাইলেন। সেদিন আমাকে তারা বিভিন্ন নাস্তা, চা দিয়ে আপ্যায়িত করলো।

বিদায় নিয়ে আসার সময় রেহানা আমার সাথে হাঁটতে হাঁটতে বাউন্ডারি শেষে গেটের কাছ পর্যন্ত আসলো। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম তুমি কোথায় ভর্তি হবে?  তখন রেহানার একটা কথা শুনে আমি বজ্রাহতের মতো হয়ে গেলাম।

সে বলল– রাজিব আমাদের দেশে থাকা হবে না, আমাদের কাগজপত্র প্রায় হয়ে গেছে, আমি আর আমার ছোট ভাই  মাস দুয়েকের মধ্যে লন্ডন চলে যাবো, ওখানে গিয়েই ভর্তি হবো। ওখানে আমার মামারা, খালারা  থাকেন। আমরা আপাতত বড় মামার বাসায় থাকবো।

আমার আব্বা আরো কয়েক বছর চাকরি করবেন তাহলে উনি সরকারি পেনসনের আওতায় আসবেন, তখন উনি আম্মা ও আমার ছোট বোনকে নিয়ে ইংল্যান্ড চলে আসবেন।

আমি কাঙালের মতো বললাম–  রেহানা এরমধ্যে তুমি আর আসবেনা? তোমাকে যে আমার কিছু বলার ছিল!

–রাজিব তুমি যা আমাকে বলতে চাও তা আমি আরো অনেক আগেই বুঝেছি। শুধু অনুমানের উপর ভিত্তি করে তোমাকে কিছু বলা যায় না, আর যোগাযোগের সুবিধা ছিলো না তাই তোমাকে আমি বলতে পারিনি।

কারন এটা সম্ভব না, আমি আসলে আমার এক কাজিনের  বাগদত্তা। উনি লন্ডনেই পড়াশোনা করছেন। আমার দাদী এটা ওয়াদা করিয়ে গেছেন।

তারপর রেহানা বলেছিলো –রাজিব তুমি মন খারাপ করো না, তুমি ভালো ছেলে, আমি জানি তুমি ভালোই থাকবে।

রেহানা চলে গেলো। আমি সেদিন ভাঙা বুক নিয়ে কোনো রকমে ঘরে ফিরে এসেছিলাম।

তারপর অনেকদিন কোন কিছুতেই আর মন বাসতে পারিনি। অবশ্য সময় এক সময় আমাকে আবার স্বাভাবিক করে নিলো।

এবারও শিউলি বেগম তার স্বামীর  দ্বিতীয় ব্যর্থ প্রেমের জন্য  কষ্ট পেলো । আহারে বেচারা!

তাকে কোন রকম খোঁচা না দিয়ে বলল– রেহানার সাথে আর কখনো যোগাযোগ হয়নি?

–না ,তবে বছর দশেক আগে তার ভাই আজহারের সাথে দেখা হয়েছিলো ভিসা অফিসে।

সে ই আমাকে প্রথমে চিনতে পারে, অনেক কথা হয়। তখন কথায় কথায়  জানতে পারলাম রেহানার কাজিনের সাথে তার বিয়ে হয়নি ।

তার সেই কাজিন তার সহপাঠি এক ব্রিটিশ বান্ধবিকে বিয়ে করেছে।

কি কারনে জানি না রেহানার ডাক্তারি পড়াও হয়নি। সে পরিবেশ তত্ত্বের উপর পড়াশোনা করেছে,ভালো চাকরি করে। তার হাজবেন্ড একজন ইঞ্জিনিয়ার, তাদের দুই ছেলেমেয়ে, স্বপরিবারে লন্ডনেই থাকে।

রাজিবের দ্বিতীয় ব্যর্থ প্রেম কাহিনী বলা শেষ হয়েছে। তারপর সে স্বাভাবিক ভাবে হাসে, হাত ধরে বলে — শিউলি এসব এখন শুধুই গল্প! কিছু মনে করছো না তো? সত্যি আমি তোমার সাথে একটা সুখের জীবন কাটিয়েছি, বাকি জীবনটাও এভাবে কাটাতে চাই।

আজ পর্যন্ত কোনো জটিলতা আমাদের সংসার জীবনকে স্পর্শ করেনি, এর চেয়ে ভাল আর কি হতে পারে?

রাজিব কিছুক্ষণ শিউলির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে, তারপর বলে–শিউলি মন থেকেই বলছি ,তোমাকে নিয়ে আমি  একজন পরিপূর্ণ সুখী  মানুষ।

- Advertisement -

Read More

Recent