একদিন সারাদিন শহর থেকে দূরে

হাতে৷ গাড়ি চলেছে রাজপথ পেরিয়ে ঘন সবুজের বুক চিরে গ্রামের পরিচ্ছন্ন রাস্তার সাথে সাথে

এক.

আজ ৩ জুন, মঙ্গলবার। আমাদের অগ্রজ বন্ধু শেখ শাহনওয়াজ, বন্ধু সাহিদুল আলম টুকু, বন্ধু মনিস রফিক ও আমি রওয়ানা দিলাম অজানার উদ্দেশ্যে। আমরা অজানার উদ্দেশ্যে বললে কী হবে, কবি বন্ধু সাহিদুল আলম টুকু ঠিকই জানেন, জিপিএস ছাড়াই কীভাবে পিকটন শহরের পানির কাছে যেতে হয়।

- Advertisement -

স্টিয়ারিং কবি বন্ধু টুকুর হাতে৷ গাড়ি চলেছে রাজপথ পেরিয়ে ঘন সবুজের বুক চিরে গ্রামের পরিচ্ছন্ন রাস্তার সাথে সাথে। আসলে রাস্তার সাথে সাথে আমরা যাই, নাকি রাস্তাকেই আমরা সঙ্গে নিয়ে যাই! কী জানি! বড় গোলমেলে বিষয় এই জগতের নিয়ম। কেন গোলমেলে মনে হয়? বলছি।

পথিমধ্যে কফি বিরতির পর আমরা প্রিন্স এডওয়ার্ড কাউন্টিতে ঢুকে পড়লাম। বন্ধু টুকু আমাদেরকে সুপরিকল্পিতভাবে বিন্যস্ত ও দীর্ঘ বিস্তৃতিতে প্রবাহিত একটি খালের তীরে এনে নামালেন৷ নেমে দেখি যতদূর চোখ যায়, এই খালের দীর্ঘ প্রবাহের ধারা৷ ১৮৬৬ সালে স্যার ম্যাকডোনাল্ড সরকারের সহায়তায় এই খালটি দুটি বিপুল বিশাল হ্রদের দূরত্বকে দূর করে একীভূত করেছে।

এই সুবিন্যস্ত ও সুপরিকল্পিতভাবে প্রবাহিত খালের তীর ধরে আমরা হাঁটছিলাম আর পরস্পর আলাপ করছিলাম, স্যার ম্যাকডোনাল্ড মানুষের দূরত্বকে গুছানোর জন্য দূর্গম বনজঙ্গল কেটে খাল খনন করেন। অথচ, যিনি আমাদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র নির্মাণের জন্য সকল পথ ও বাঁধা অতিক্রম করে স্বাধীনতা এনে দিলেন তাঁর ও তাঁর সংগ্রামী সহযোদ্ধাদের অস্বীকার করে আজকের ‘বিশ্বখ্যাত’ শাসক! সংস্কারের নাম ভাঙিয়ে সময় ক্ষেপণ করে কর মওকুফের আইন জারি করে নোবেল পুরষ্কারের অর্থমূল্যে! ভাবা যায়!

দুই.

না। আমরা এদের এই হাস্যকর বিষয় নিয়ে মেতে থাকিনি। বরং এক বিশাল জলরাশীর তীরে বসে চোখ বন্ধ করে নিঃশ্বাস নিয়েছি। ইয়াসনায়া পলিয়ানার রাজার কুমার লেভ তলস্তয়ের সৃষ্ট আন্না নয়, পিকটনের আন্নার আপ্যায়নে মুগ্ধ হয়েছি। ১৮৪০ সালে নির্মিত কারুকার্যময় বাড়ির কাঠের দরজার দিকে চেয়ে  বিস্মিত হয়েছি। না জানি কোন এক অতি সুন্দরীর কোমল হাতের স্পর্শ পেয়ে এই দরজার কপাট খুলে খুলে গিয়েছে এক বাঁধভাঙা আবেগের প্রেমিকের আগমনের সাড়া পেয়ে!

তিন.

কানাডা দেশটি এতো বিশাল বিপুল যে, এর একটি প্রভিন্স ওন্টারিওতেই প্রকৃতির লীলাভূমির শেষ নেই যেন! শহর থেকে যে কোন তিন দিকে সামান্য ঘন্টা দুই গেলেই বিশাল হ্রদের সমাহার। উঁচুনিচু ভূমির প্রকৃতিলগ্ন সৌন্দর্য। অবারিত সবুজের সমারোহে বিশাল বিশাল ক্ষেতখামার। স্বচ্ছপানির পরিচ্ছন্ন বিস্তৃতি। যে দিকে চোখ যায়, নীরবতায় মগ্ন শান্ত সমাহিত প্রকৃতির নিঃশব্দ আপন কল্লোল! যেন নীরবতার সুরে সটান বৃক্ষরাজির কথায় গানে গানে পাশাপাশি বেড়ে ওঠা পরস্পরের চিরকালীন বন্ধনের সখ্য রূপ।

জীবনানন্দ দাশ কি এই নীরব প্রকৃতির কথাই অনুবাদ করে লিখেছিলেন :

‘কেউ যাহা জানে নাই – কোন এক বাণী

আমি বহে আনি!’

কী জানি, সব গোলমেলে ঠেকে! এইটুকু অন্তত বুঝা যায়, প্রকৃতি হাতছানি দিয়ে ডেকে নিয়ে বলছেন, ‘কাছে এসে নীরব হয়ে, নিমগ্ন হয়ে বসে শোনো, নিঃশব্দের সুরে সুরে আমার প্রলয়ঙ্কারী গান!’

বুঝতে পারছি, নীরব হলেও নিঃশব্দের প্রলয়ঙ্কারী গান রচিত হচ্ছে দূরের কোন দেশের প্রকৃতিলগ্ন মানুষের মনে মনেও!

 

টরন্টো, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent