খালাম্মা রাবেয়া খাতুন

খালাম্মার জন্মদিনে তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র ফরিদুর রেজা সাগর প্রতি বছর আয়োজন করেন জমকালো একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানের

আমাদের প্রবীনতম কথাশিল্পী রাবেয়া খাতুন ৭৮-এ পা রাখলেন আজ। জন্মদিনে তাঁকে ঘিরে প্রতিবছরের মতো এবারও অনুষ্ঠিত হবে আনন্দসন্ধ্যা। কিন্তু সেই সন্ধ্যায় আমি থাকতে পারছি না। গতকাল কথা হচ্ছিলো তাঁর সঙ্গে, টেলিফোনে। আমার উদ্দেশে তাঁর প্রথম বাক্যটিই ছিলো–তুমি থাকলে ভালো লাগতো।

খালাম্মার জন্মদিনে তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র ফরিদুর রেজা সাগর প্রতি বছর আয়োজন করেন জমকালো একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানের। পারিবারিক হলেও সেই অনুষ্ঠানে দেশের বিখ্যাত মানুষজনের বিশাল উপস্থিতি থাকে। সাগর ভাই চমক দিতে ভালোবাসেন। এটা তাঁর স্বভাবের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। খালাম্মাই আমাকে বলেছেন যে–সাগরের বয়েস যখন নয় বছর, তখন থেকেই ও চমক দিতে পছন্দ করে।

- Advertisement -

দু’বছর আগে খালাম্মার ৭৬ তম জন্মদিনের উৎসব হচ্ছিলো ঢাকার ওয়েস্টিনের বিশাল একটি হলরুমে। সেবার জন্মদিনে সাগর ভাই খালাম্মার জন্যে অন্যরকম একটা চমকের ব্যবস্থা করেছিলেন। আমরা দুতিনজন ছাড়া আর কেউ জানতো না সেই চমকের ব্যাপারটি। পারিবারিক সেই অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করছিলাম আমি। বিভিন্ন টেবিলে থাকা অতিথিদের আমি ডেকে আনছিলাম মাইক্রোফোন স্ট্যান্ডের সামনে। বার্থ ডে উইশ এবং টুকরো টুকরো স্মৃতির বর্ণাঢ্য কথামালায় জমজমাট একটি আবহ। কেউ ফুলের গুচ্ছ নিয়ে এসেছেন কেউ এনেছেন চকচকে রঙিন প্যাকেটে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার প্রতীকি উপহার। অনুষ্ঠানে রাবেয়া খাতুনের দুইকন্যা কেকা ফেরদৌসি আর কাকলী উপস্থিত আছেন তাঁদের স্বামী-পুত্র-কন্যা-নাতিনাতনিসমেত। স্ত্রী কনা রেজা এবং দুই কন্যাসমেত সাগর ভাই আছেন। নেই শুধু প্রবাল। প্রবাল মানে প্রবাল রেজা। খালাম্মার অদ্বিতীয় দ্বিতীয় পুত্র। থাকেন অস্ট্রেলিয়ায়। পেশায় প্রকৌশলী। বিটিভির দর্শকরা তাঁকে চেনেন উপস্থাপক হিশেবে। বিটিভির ‘ছায়াছন্দ’ নামের ফিল্মী গানের মহাজনপ্রিয় অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেছেন টানা অনেকদিন। জন্মদিনের এমন একটা পারিবারিক অনুষ্ঠানে প্রবাল রেজা উপস্থিত থাকলে আয়োজনটি শতভাগ সম্পূর্ণ হতো। কিন্তু সেটি তো হবার নয়। সুতরাং কনিষ্ঠপুত্রের অনুপস্থিতিকে মেনে নিয়েই আমাদের সঙ্গে আনন্দে শামিল হলেন খালাম্মা।

সেবার মায়ের জন্যে অভাবনীয় একটি চমক তৈরি করলেন সাগর ভাই। অনুষ্ঠান চলছে। হলরুমের প্রবেশদ্বারে সাগর ভাই রিসিভ করছিলেন অতিথিদের। খানিকটা দূর থেকেই আমার সঙ্গে সাগর ভাইয়ের কথাবার্তা চলছিলো। ইশারা পদ্ধতিতে একটা সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করে চলছিলাম আমি আর সাগর ভাই। একজন অতিথি কথা বলছিলেন খালাম্মাকে উপলক্ষ্য করে। দূর থেকে সাগর ভাই আমার দিকে তর্জনী উত্তোলন করলেন। মুহূর্তেই আমি অতিথির হাত থেকে মাইক্রোফোনটি নিয়ে ঘোষণা করলাম–এবার ফরিদুর রেজা সাগরের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ উপহার কথাশিল্পী রাবেয়া খাতুনের জন্যে। উপহারটি নিয়ে সাগর ভাই মঞ্চের কাছে আসবেন না। উপহারটি স্বয়ং হেঁটে আসবেন এখানে। আমি দেখতে পাচ্ছি ঢাকা এয়ারপোর্টে কিছুক্ষণ আগে অস্ট্রেলিয়া থেকে ল্যাণ্ড করা প্রবাল রেজা এগিয়ে আসছেন আমার দিকে। আমার সামনে আমার দিকে মুখ করে বসে থাকা খালাম্মা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন দরোজার দিকে। খালাম্মার মুখে ফুটে উঠলো অসাধারণ একটি হাসি। হাস্যোজ্জ্বল প্রবাল রেজা এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি চলে এসেছেন জন্মদিনের আনন্দ উৎসবে। মাকে জড়িয়ে ধরে একটু আদর করে প্রবাল মাইক্রোফোনে অনেক মজা করলেন আমার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। আমি বার বার ফিরে ফিরে শুধু খালাম্মাকে দেখছিলাম। খালাম্মার চোখে খুবই হালকা আনন্দঅশ্রু চিকচিক করছে। সাগর নামের তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্রটি জন্মদিনের সেরা উপহারটি মায়ের জন্যে এনে দিয়েছে!

গতকাল খালাম্মার সঙ্গে কথা বলার সময় ঘটনাটি তাঁকে মনে করিয়ে দিতেই খালাম্মা বললেন–প্রবাল এসেছে কালকে, অস্ট্রেলিয়া থেকে। তুমি এলে ভালো লাগতো। শুনে আমার খানিকটা মন খারাপ তো হলোই। বললাম–কিছুদিনের মধ্যেই তো দেখা হচ্ছে খালাম্মা। প্রসঙ্গ ঘোরাতে জিজ্ঞেস করলাম–কতোয় পড়লেন? বললেন–আটাত্তর। সময় কমে এসেছে। আমি বললাম–কী যে বলেন! সময় কোথায় কমছে! আপনি তো আরো ঝকমকে হচ্ছেন বয়েসকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে। এখনো লিখছেন। বই বেরুচ্ছে।

খালাম্মা হাসলেন। বারো হাজার তিনশো কিলোমিটার দূর থেকেও আমি সেই হাসির শব্দ শুনতে পেলাম। খালাম্মার কাছ থেকেই জানতে পারলাম জন্মদিন উপলক্ষ্যে গতকাল লেখক গবেষক আহমাদ মাযহারের সম্পাদনায় ‘রাবেয়া খাতুন জীবন ও গ্রন্থপঞ্জি’ নামে একটি বই প্রকাশ করেছে অনন্যা। খালাম্মার জন্মভূমি বিক্রমপুরের ষোলঘরে আয়োজন করা হয়েছে ‘রাবেয়া খাতুনের একক বইমেলা’র।

আমি কেমন আছি। আমার স্ত্রী শার্লি কেমন আছে। কন্যা নদী কেমন আছে—সবকিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করলেন। যখনই ফোন করি খালাম্মাকে, শার্লির কথা তিনি জিজ্ঞেস করবেনই করবেন। আমাদের দুজনকে একটা বইও উৎসর্গ করেছেন খালাম্মা। বইটার নাম ‘কৃস্টালের রাজহাঁস’। উৎসর্গপত্রে লিখেছেন—‘ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন ও শার্লি, রোমান্টিক জুটিকে।’

আমার সঙ্গে খালাম্মার সম্পর্কটা খুবই ইন্টারেস্টিং। অধিকাংশ সময়েই আমি তাঁর কাছে ছেলের মতো। কিন্তু কখনো কখনো আমি আমাদের সম্পর্ক আর বয়েসের ব্যবধানটা ঘুচিয়ে ফেলি। হয়ে উঠি দুজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ। আমাদের দুজনের প্রধান কাজ লেখা। অসমবয়েসী আমরা দুজন প্রায়ই সমসাময়িক কালের দুজন লেখক হিশেবে পৃথিবীর যাবতীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা করি দ্বিধাহীন। তখন আমি ভুলে যাই তিনি আমার খালাম্মা। এবং তিনিও ভুলে যান আমি তাঁর পুত্রবৎ। আমাদের আলোচনায় উঠে আসে জীবনের হাসি আনন্দ সুখ দুঃখের নানান উপাখ্যান। উঠে আসে মানব মানবীর জটিল সম্পর্কের নানান মোচড়। উঠে আসে জীবনের প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য গোপন গলিঘুপচির আলো অন্ধকারগুলোও।

আমাকে তিনি প্রশ্ন করে করে আমার মাধ্যমে জেনে নেন তাঁর প্রায় দুই প্রজন্ম আগের একজন পুরুষের জীবনদৃষ্টি। আমার ব্যক্তিজীবন। আমার দাম্পত্য জীবন। আমার প্রেম। আমার অভিমান। আমার সংগ্রাম। আমার জেদ—সব, সবকিছু। শার্লির সঙ্গে আমার একজীবনের ভালোবাসার গল্পও তিনি শোনেন গভীর অভিনিবেশ নিয়ে। জানতে চান প্রবাস জীবনের ঘাত প্রতিঘাতগুলো। প্রবাসের তরুণ-তরুণীদের মুক্ত স্বাধীন জীবন যাপনের সুফল আর কুফলগুলো। তিনি নিজে প্রায় সারা পৃথিবী ভ্রমণ করেছেন। নিজের চোখেই দেখেছেন বহুকিছু। তারপরেও আমার কাছ থেকে জানার চেষ্টা করেন। মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করেন তাঁর দেখা আর আমার দেখাকে। ভিন্ন বয়েসী আমাদের দুজনের উপলব্ধির মিল অমিলগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যবচ্ছেদ করেন। একজন প্রকৃত লেখক তো সেটাই করে থাকেন। নিজের উপলব্ধিটা লেখেন ঠিকই কিন্তু অন্যের উপলব্ধিকেও মাথায় রাখেন।

কতো স্মৃতি খালাম্মার সঙ্গে। কক্সবাজার সী বিচ, চান্দের গাড়ি, ইনানি বিচ, বগুড়া এফ কটেজ, কলকাতা বইমেলা, কলকাতা গ্র্যাণ্ড হোটেল সুইমিং লবি, ব্যাংকক হসপিটাল—কোনটা রেখে কোনটা বলি। একটিমাত্র রচনায় সেগুলো লেখা সম্ভবও নয়। তবে যেখানেই গেছি আমার কথাবার্তা আর পাগলামি দেখে খালাম্মা তো হেসেই খুন হয়েছেন বারবার, প্রতিবার।

কক্সবাজারের ঘটনাটা বলি।

২০০৭ এর নভেম্বরে সাত বছর দুঃসহ প্রবাস জীবন কাটিয়ে বাংলাদেশে ফেরার সুযোগ পেলাম। সে এক আবেগঘন সময় আমার জীবনে। সাগর দেখাতে নিয়ে গেলেন সাগর ভাই মানে ফরিদুর রেজা সাগর। কক্সবাজার গেলাম দল বেধে। সমুদ্র সৈকতে ছাতা-গাঁথা হেলানো ইজি চেয়ারে বসে গল্প করছি কথাশিল্পী রাবেয়া খাতুনের সঙ্গে। রাবেয়া খালাম্মার জামাতা মামুন ভাই আমাকে খোঁচানো শুরু করলেন—হই মিয়া সী বিচে এইভাবে ভদ্রলোকের মতো বইসা থাকলে চলবো? নামেন মিয়া!

মামুন ভাইয়ের উস্কানিতে কিংবা বলা উচিৎ সমুদ্রের প্রবল হাতছানিতে খালাম্মার কাছে হাতের মোবাইল ফোনটা রেখে আমি ঝাঁপিয়ে পড়লাম সমুদ্রের কোলে। বিশাল বিশাল ঢেউ এসে বারবার আমাকে জড়িয়ে ধরে ভাসিয়ে নিয়ে গেলো। কানের ভেতরে নোনা জল প্রবেশ করে ফিসফিস করে বললো—কতোদিন পরে এলি!

আমার পরনে স্নানের পোশাক ছিলো না। দুদিন আগে বঙ্গবাজার থেকে কয়েকটা ব্যাগি প্যান্ট কিনে দিয়েছিলো আমীরুল। সেদিন আমার পরনে নীল ব্যাগি প্যান্ট। এই প্যান্টের অনেকগুলো পকেট। ঝাঁপাঝাঁপির এক পর্যায়ে টের পেলাম আমার ডান পকেটের ওয়ালেটটা একটু বেশিমাত্রায় ফোলা। ওয়ালেটের চাইতেও জরুরি আমার সাইড পকেটগুলো। ওখানেই কোনো একটায় ভাঁজ করে রেখেছি আমার ছড়াগুলো, অন্যটায় দশটা পাঁচশ টাকার নোট। প্যান্টের সাইড পকেটে চেইন কিংবা বোতাম সিস্টেম ছিলো না। ছিলো জ্যাক সিস্টেম। টের পেলাম ঢেউয়ের তোড়ে আমার দুটো সাইড পকেটেরই ঢাকনা খোলা। সর্বনাশ! তাড়াতাড়ি উঠে এলাম।

ঢাকনা খোলা সাইড পকেটে ভাঁজ করে রাখা এ-ফোর সাইজের কাগজ এবং টাকাগুলো নেই। দুটি পকেটেই বেশ কিছু বালির উপস্থিতি।

দীর্ঘ সময় ঝাঁপাঝাঁপি করে আমার চোখ দুটি লালে লাল। খুবই স্লো মোশানে হেঁটে হেঁটে আমি রাবেয়া খালাম্মার কাছে এলাম। খালাম্মা আমার চেহারা দেখেই পড়ে ফেললেন আমার মনের অবস্থা। বললেন—মানিব্যাগটা আমার কাছে রেখে গেলে না কেনো? টাকাগুলো ভিজিয়েছো তাই না? সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে আমি পকেট থেকে ভেজা ওয়ালেটটা বের করে খালাম্মার কাছে জমা দিলাম। দুটো কলম আর ছোট্ট চিরুনিটাও দিলাম। ওয়ালেটে কিছু টাকা ছিলো। ওগুলো ঠিকই আছে। কিন্তু তারপরেও আমার মনটা কেনো বিষণ্ণ—খালাম্মা জানতে চাইলেন। দামি কিছু কি হারিয়েছে তোমার? আমি মাথা নাড়লাম—জ্বি খালাম্মা।

–কি হারিয়েছে?

–তিরিশ-চল্লিশটা ছড়া। (পাঁচ হাজার টাকার বিষয়টি বেমালুম চেপে গেলাম।)

–বলো কি? তিরিশ-চল্লিশটা ছড়া!

ঘটনার বিস্তারিত শুনে খালাম্মা খানিকক্ষণ আমাকে তিরস্কার করলেন। আমার দায়িত্বজ্ঞান এবং কান্ডজ্ঞান বিষয়ে গভীর উষ্মা প্রকাশ করলেন।

ভেজা নীল প্যান্ট আর ভেজা শাদা টিশার্ট পরা আমি বেশিক্ষণ গোমড়ামুখো না থেকে অচিরেই স্বমূর্তি ধারণ করে খালাম্মাকে হাসাতে শুরু করলাম। আমার ছড়াগুলোর সলিল সমাধি হয়েছে এবং আমি এখন ওদের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করে দাঁড়িয়ে তিরিশ সেকেন্ড নিরবতা পালন করবো শুনে খালাম্মা কিশোরী মেয়ের মতো হাসতে হাসতে গুঁড়োগুঁড়ো হলেন। সত্যি সত্যি খালাম্মাকে আনন্দ দেয়ার জন্যে আমি দাঁড়িয়ে নিরবতা পালন করলাম তিরিশ সেকেন্ড। তারপর এক দৌঁড়ে আবারো ঝাঁপিয়ে পড়লাম সমুদ্রের বুকে–এই সমুদ্র আমার ছড়াগুলো তুই ছিনতাই করেছিস কেনো?

পরম মমতায় সমুদ্রের নোনাজল আমাকে জাপটে ধরলো—সো হোয়াট!

কক্সবাজার সমুদ্রের বিপুল ঊর্মিমালার ফেনায়িত নোনা জলে সলিল সমাধি ঘটা চার থেকে আট লাইনের ছড়াগুলো রচিত হয়েছিলো এ-ফোর সাইজের তিন পৃষ্ঠার একটি খসড়া স্ক্রিপ্টের উলটো পিঠে। আমার ছড়া কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড নামের বইটিতে এই গোটা চল্লিশের সহোদররা মুদ্রিত হয়েছে।

২০১০ সালে খালাম্মার সঙ্গে বগুড়ায় তাঁর শশুরবাড়ি যাওয়া হলো। বগুড়া টিটো হলে খালাম্মা আর সাগর ভাইয়ের সংবর্ধনা ছিলো। আমাদের দলে ছিলেন ইমদাদুল হক মিলন এবং আমীরুল ইসলামও। অনুষ্ঠান বিকেলে। সকাল বেলা খালাম্মা আমাকে আর মিলন ভাইকে নিয়ে গেলেন ‘এফ কটেজ’ নামের শান্তস্নিগ্ধ একটি বাড়িতে। বিয়ের পর স্বামী ফজজুল হকের (বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র বিষয়ক পত্রিকা ‘সিনেমা’র সম্পাদক এবং প্রথম ছোটদের চলচ্চিত্র ‘প্রেসিডেন্ট’-এর পরিচালক)সঙ্গে এই বাড়িটিতেই এসে উঠেছিলেন কথাশিল্পী রাবেয়া খাতুন। এটা তাঁর শশুরবাড়ি। এই বাড়ির প্রতিটি ইট-সুড়কি-গাছ-পাথরের সঙ্গে খালাম্মার প্রথম যৌবনের সহস্র স্মৃতি মিশে আছে। অনেক আবেগ আর উচ্ছ্বাসের তোড়ে ভাসতে ভাসতে খালাম্মা আমাদের দেখালেন—এই ঘরটায় হয়েছিলো আমাদের প্রথম বাসর। সাগরের জন্ম এখানে। ভেতর বাড়ির প্রশস্ত বারান্দায় নিয়ে গিয়ে দেখালেন—ঠিক এই জায়গাটায় নারকেল গাছের চিরল চিরল পাতার ফাঁক গলে রোদ আসতো প্রচুর। সেই রোদে সাগরকে এখানে আমি গোসল করাতাম।

আমি জানতে চাইলাম– বাড়ির নাম ‘এফ কটেজ’ কেনো? খালাম্মা বললেন—সাগরের বাবা ফজলুল হক, ওর দুই চাচা ফজলুল করিম আর ফজলুল আলম। সবার নামের প্রথম অক্ষর এফ। সেই বিবেচনায় সাগরের বাবা বাড়িটার নাম দিয়েছিলেন ‘এফ কটেজ’।ফজলুল হক সাহেবের ক্রিয়েটিভিটি নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। নিজের দুই পুত্রকেও তিনি এফ এলফাবেটের আওতায় রেখে ‘এফ কটেজ’ভুক্ত করেছেন—ফরিদুর রেজা আর ফরহাদুর রেজা।

স্মৃতি হিশেবে এফ কটেজের ছোট্ট সেই নামফলকটিই এখনও যত্ন করে ঝুলিয়ে রাখা আছে বাড়ির একটি অংশে। খালাম্মা আমার হাত ধরে নিঃশব্দে ওই বাড়ির এইঘর সেইঘর, এই বারান্দা সেই বারান্দা, এই দরোজা সেই দরোজা, এই জানালা সেই জানালার কাছে ঘুরে ঘুরে এলেন কয়েকবার। আমি জানি ঠিক ওই সময়টায় খালাম্মা তাঁর প্রথম যৌবনের আনন্দের প্লাবনে ভেসে যাওয়া দিন আর রাত্রিগুলোর অনিঃশেষ সৌরভকে অনুভব করছিলেন তাঁর প্রতিটি নিঃশ্বাস আর চোখের পাপড়ির প্রতিটি কম্পনে। আমি চুপ করে ছিলাম। অহেতুক কথা বলে আমি খালাম্মার নিরবতার সৌন্দর্যটুকু নষ্ট করিনি একটুও।

প্রিয় খালাম্মা, সারাটা জীবন আপনি কতো কষ্টই না করেছেন। তরুণী থাকা অবস্থায় চার চারটি ছেলেমেয়েকে নিয়ে একলা একা পাড়ি দিয়েছেন জীবনের দীর্ঘ-দীর্ঘতম পথ। সেই পথ কুসুমাস্তীর্ণ ছিলো না। কিন্তু অনটন-ক্লান্তি-অবসাদ-না পাওয়ার বেদনা কোনোকিছুই আপনাকে টলাতে পারেনি, পারেনি থামিয়ে দিতে। জীবন আপনার সঙ্গে কানামাছি খেলতে চেয়েছে। উলটো জীবনকে নিয়ে আপনি কানামাছি খেলেছেন নিরন্তর।

আপনার অসংখ্য গল্প-উপন্যাসের শত সহস্র মুদ্রিত পৃষ্ঠা মুহুর্মুহু আপনাকে জয়ী ঘোষণা করছে। রাবেয়া খাতুন, প্রিয় খালাম্মা, আটাত্তরতম জন্মদিনে বাংলাদেশের অতিনগন্য এক ছড়াকারের প্রণতি গ্রহণ করুন।

 

অটোয়া, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent