
আমাদের স্বাধীনতার সমান বয়েসী মেয়েটি। সবাই ওকে চেনে তুরিন আফরোজ নামে। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্যে গঠিত ‘আন্তার্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের’ একজন তুখোড় প্রসিকিউটর হিশেবে তুরিন আফরোজ ইতোমধ্যে দেশের মানুষের বিপুল আস্থা ও সম্মান অর্জন করেছে। সবাই ওকে তুরিন আফরোজ নামে চিনলেও আমি চিনি সেতু নামে। বাংলাদেশ টেলিভিশনের উজ্জ্বল এক শিশুশিল্পী সেতু। তুরিন আফরোজ সেতু। বিটিভির নতুন কুঁড়ির একজন প্রতিভাময়ী অংশগ্রহণকারী হিশেবে আবৃত্তি এবং অভিনয়ে পুরস্কারপ্রাপ্ত মেধাবী শিশুশিল্পী। আমার ভাগ্নি। আমি ওর রিটন মামা। আশির দশকে বিটিভির প্রযোজক কাজী কাইয়ুমের নতুন কুঁড়ির টিম-এ আমরা অনেকেই যুক্ত ছিলাম। সাগর ভাই ছিলেন। আজকের মহাবিখ্যাত ফরিদুর রেজা সাগর। টেলপে সাগর ভাইয়ের নাম যেতো পরিচালক হিশেবে। আমি ছিলাম স্ক্রিপ্ট রাইটার। টেলপে আমার নাম যেতো গবেষক হিশেবে। নতুন কুঁড়ি অনেক বিখ্যাত শিল্পী উপহার দিয়েছে আমাদের। এখন সংসদ সদস্য তারানা হালিম নতুন কুঁড়ির পুরস্কারপ্রাপ্ত শিশুশিল্পী। নৃত্যশিল্পী হিশেবে নতুন কুঁড়ির পুরস্কার অর্জন করেছিলো হুমায়ূন আহমেদের দ্বিতীয় স্ত্রী শাওন।
বিটিভিতে ছোটদের অনুষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘ সময়ব্যাপী জড়িত ছিলাম বলে ওখানকার শিশুশিল্পীদের কাছে আমি ছিলাম ‘রিটন মামা’।
আমার ভাগ্নে-ভাগ্নিরা মহা বিখ্যাত একেকটা। আমার লেখা স্ক্রিপ্টে নতুন কুঁড়ির ‘ফালানি’ চরিত্রে একক অভিনয় করে ইশিতা নামের একটা ভাগ্নি তো স্বৈরাচার এরশাদকেও কাঁদিয়ে ছেড়েছিলো। আশির দশকে আমার রচনা ও পরিচালনায় প্রচারিত ছোটদের ধারাবাহিক নাটক ‘ঝন্টু-পন্টু’তে টুই নামের চরিত্রে অভিনয় করে বিপুল দর্শকের কাছে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছিলো আরেক ভাগ্নি তারিন। সম্ভবত ঝন্টু-পন্টুই ছিলো ওর প্রথম ধারাবাহিক নাটক। ভাগ্নে অঞ্জন বিখ্যাত হয়েছিলো আবদুল্লাহ আল মামুন প্রযোজিত সংশপ্তক-এ খুদে মালুর ভূমিকায় অভিনয় করে। কিন্তু অঞ্জন জীবনের প্রথম অভিনয় করেছিলো কাজী কাইয়ুম প্রযোজিত আমার লেখা ‘গুরু শিষ্য’ নাটকে শিষ্যের চরিত্রে। আমার একটা ঈদের অনুষ্ঠানে অপূর্ব একটা চায়নিজ গান গেয়ে মাতিয়ে দেয়া পিচ্চি ভাগ্নি নওরীন এখন সংসার করছে আমেরিকায়। সেতুর একটি ছোট ভাই ছিলো। বিটিভির নতুন কুঁড়ি এবং নাটকের এক উজ্জ্বল শিশুশিল্পী। এখন কোথায় আছে জানি না। অনুমান করতে পারি বড়বোন সেতুর মতো সে-ও তার মেধার গুণে জীবনে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।
নতুন কুঁড়ির ভাগ্নে ভাগ্নিরা পরবর্তী জীবনে সমাজের নানান পেশায় প্রতিষ্ঠিত হলেও তারানা হালিম ছাড়া আর কাউকে জাতীয় ইস্যুতে সোচ্চার হতে দেখিনি। তারানার পর আরো বড় প্রেক্ষাপটে আরো বড় প্লাটফর্মে এসে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে তুরিন আফরোজ সেতু। আমাদের সেতু নতুন এক সেতুবন্ধ রচনা করেছে। মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্মের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের সেতুবন্ধ। মুক্তিযুদ্ধ একটা রিলে রেস। তিরিশ লক্ষ শহিদের হাত থেকে রক্তাক্ত পতাকাটি নিয়ে ছুটে চলেছে সেতু। সেতুর সঙ্গে আছে তার নিজের পুরো একটি প্রজন্ম। সেতুর সঙ্গে আছে তার আগের প্রজন্মও। কয়েকটি প্রজন্মের স্বপ্নের প্রতিনিধিত্ব করছে একজন সেতু। ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে ট্রাইব্যুনালে যোগ দিয়েই স্বাধীনতার সমান বয়েসী তুরিন আফরোজ সেতু তারুণ্যের দীপ্তির সঙ্গে মেধা আর প্রজ্ঞার সমন্বয় ঘটিয়েছে অপরূপ দক্ষতায়। প্রসিকিউটর হিশেবে সেতুকে দেখলেই আশাবাদী হয়ে ওঠে বিচারপ্রার্থী জাতি। যুদ্ধাপরাধীদের দোসররা একাধিকবার হামলা করেছে সেতুর বাসভবনে। ট্রাইব্যুনালে সেতুর যৌক্তিক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে পরাভূত হয়েই ঘাতকদের সহযোগিরা হামলা করছে। আইনমত্রী শফিক আহমেদের কাছে একটি নিরাপদ বাড়ি চেয়েছিলো সেতু। আইনমন্ত্রী অপারগতাই জানিয়েছেন প্রকারান্তরে। ট্রাইব্যুনালে স্বাক্ষ্য দিয়ে অনেকেই বিপদে আছেন। হত্যার শিকারও হয়েছেন কেউ কেউ। শুধু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করলেই তো হবে না। স্বাক্ষীদের নিরাপত্তাও দিতে হবে সরকারকে। নিজের জীবনকে বিপন্ন করে যিনি স্বাক্ষ্য দিচ্ছেন তার নিরাপত্তার ব্যবস্থা না করে সরকারের বাকোয়াজ নীতিনির্ধারকরা শুধু গলাবাজীই করে যাচ্ছেন।
তুরিন আফরোজ, আমাদের সেতু, নতুন বছরে তোমার জন্যে অনেক অনেক শুভ কামনা মামা।
অটোয়া, কানাডা
