ননদকাঁটা

রুনি অস্থিরভাবে বিথির ব্যাগে টাকা খুঁজছে আজ সকালে রানা বিথিকে আট হাজার টাকা দিয়েছে বাসার বাজার করাব জন্য

রুনি অস্থিরভাবে বিথির ব্যাগে টাকা খুঁজছে। আজ সকালে রানা বিথিকে আট হাজার টাকা দিয়েছে বাসার বাজার করাব জন্য। রুনি টাকা চাইলে রানা বললো, ‘আগে সংসার খরচ দেই। এ মাসে একটা লোনের টাকা দিতে হবে তোর নামে।’ রুনি জানে, ওর জন্য শিক্ষা বীমার টাকা রানা বহন করে। বিথি টাকাটা কোথায় লুকালো, রুনি ভেবে পায় না। ব্যাগের কাগজ এলোমেলো করার সময় ঠক করে হাতে একটা শক্ত বস্তু ঠেকে। রুনি হাতে নিয়ে দেখে, চোখ কপালে তুললো। এটা মায়ের কাছে দিতে হয়। ব্যাগের জিনিসপত্র আবার গুছিয়ে রুনি চলে এসেছে সুফিয়ার ঘরে। বিথি সুফিয়াকে দুপুরের রান্না কি হবে জানতে এসেছে। রুনি চট করে হাতের জিনিষটা লুকিয়ে ফেলল।

‘ভাবী, তোমার কাছে এক হাজার টাকা হবে। আমি কালকে দিয়ে দেব। ‘

- Advertisement -

‘তুমি কোথা থেকে দেবে?’

‘আমাদের কলেজে মেলায় স্টল সামলাতে মেয়ে নেবে। ওরা আগাম এক সপ্তাহের টাকা দিবে। ‘

‘ও!আগাম টাকা দেয় জানতাম না। টাকা নেই। আমি চালডালে বাজার করিয়েছি। বিকাশ দিয়ে পেমেন্ট করলাম।’

সুফিয়া তসবী চালানো থামায়। এখনকার মেয়েরা কুড়ের বাদশা। রানাকে নিয়ে বাজারে গিয়ে পাল্লা ধরে বাজার করে আনা হয়েছে, ছেলে চাকরী পাবার পর। জীবনে তেল-চাল-নুনের হিসাব করার সময় শেষ হলেও টাকা পয়সা হিসাব করতে হয় আমৃত্যু।

‘দুটা পা নিয়ে হেঁটে বাজারে গেলে কি হতো।’

‘আমার শরীর ভালো না আম্মা।’

‘পিরিয়ড হয়েছে ভাবী?’

রুনির প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে বিথি দেখলো রুনির চোখ কেমন চকচক করছে তাচ্ছিল্যে।

‘না, বমি পাচ্ছে।  গ্যাস্টিক এর সমস্যা। ‘

‘ডাক্তারের কাছে যাইও না আবার। তোমরা তো ফাঁক পাইলেই দৌড়ায়। একগাদা পয়সা দিয়া টেস্ট করায় ঔষধ আনো গ্যাসের। ‘

‘আম্মা, আমি ঔষধ খেয়েছি। একটু ঘুমালে ঠিক হয়ে যাবে।’

‘হ, ঘুমায় থাকো। যাও, শাশুড়ীর সংসার করতে আসছো। না ঘুমাইলে হয়?’

‘রান্না শেষ হোক। ছোটো মাছ রাঁধব? ‘

রুনি বাচ্চাদের মত নাক সিঁটকায়। ছোটো মাছ ভুনা করে মচমচে বানাতে হবে। তবেই, তার খেয়ে ভালো লাগে।

‘আমার জন্য ডিম ভুনা করো ভাবী। ছোটো মাছ আমি খাই না।’

‘করলাম। আর কি খাবে।’

‘ভাবী, তুমি ফান করছো?’

বিথি দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ থাকে। রানার কাছে সে গতকাল একটি আলাদা সংসারের আবেদন করেছে। রানা প্রথমে বিশ্বাস করেনি, বিথি কি বললো। তারপর, আস্তে করে বিথিকে বললো,

‘একটা রুম গুছিয়ে আলাদা হবার সিদ্ধান্তঃ নিতে চাও? ‘

‘আমার কোনো প্রাইভেসী নেই’।

রানা বিথির সাথে আর কথা বলেনি। সকালে অফিস চলে গেলো না খেয়ে। সুফিয়া টের পায়নি। যদি জানতো, রানা অভুক্ত বেরিয়েছে তাহলে বিথির কলিজা কথা শুনিয়ে কালো করে দিত।

‘মজা করিনি। আর কিছু লাগবে?’

‘ভাবী, পাঁচশ টাকা দাও না।’

‘আমার কাছে নেই, রুনি। তোমার ভাই যা টাকা দিয়েছে সব অনলাইন বাজার, বিল এসব দিয়ে শেষ।’

সুফিয়া তসবী ঘোরানো থামায়। অনলাইনে বাজার করার চল এ বাড়িতে নেই। বিথি নতুন নিয়ম চালু করলেই তিনি মানবেন কেনো।

‘হাঁটতে পারো না। দুই পয়সা বাঁচলে নিজের থাকে। ‘

‘আমার শরীর ভালো না, আম্মা।’

‘কম বয়সে শরীরের আবার ভালো মন্দ কি।’

রুনি হাতের স্ট্রীপ চাপে। সুফিয়াকে একলা এবিষয়ে বলবে। বিথিকে সরানো দরকার।

‘ভাবী, একটা ডিম ভেজে দাও। রুটি খাই।’

‘ডিমের তরকারী করা আছে। আম্মা, আমার বাসায় যেতে হবে৷ বোনের বিয়ের কথা চলছে। ‘

‘যাও। রানা আসলে নামায় দিবে।’

‘না, আম্মা। এখনি যাবো।’

‘ভাবী, আমাকে তোমাদের বাসায় যাওয়ার মুখের কাঁটায় নামায় দিও। ওখান থেকে বাসে উঠব।’

‘তুই আবার যাবি কই।’

‘একটু ঘুরব আম্মা। একটা বই বাঁধাই করাব।’

বিথি চলে গেলো চুপচাপ। সুফিয়া বাঁধা দেয়নি। রুনি অনেকক্ষণ মায়ের রুমে কাটিয়ে বার হয়ে দেখলো, বিথি নেই। গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে বিথিকে গালিগালাজ করলো সে। সুফিয়া শুধু দুইবার বললো, ‘থাম এখন। কই যাবি যা। রাতে তোরে লাগব।’

….

অফিসে আজ রানার মন বসছে না। বিথির মুখ ভাসছে। মেয়েটা তার পারিবারিক পরিস্থিতি জেনে বিয়ে করেছে। দেখাশোনার বিয়ে, পরিবার সমমর্যাদার। ছেলে চাকরী করে। মেয়ে শিক্ষিত। সবাই  তো আর বড়লোক হয় না। রানার তেমন কোনো চাহিদা নেই। বিথি তার মা -বোনকে ভালোবাসবে। নিয়ম করে সেক্স হবে। ডাল-ভাত-তরকারীর সাথে সপ্তাহে একদুই বার পোলাও গোষ খাবে। সেখানে, বিথি আলাদা হতে চাইলো। বিয়ে ছেলেখেলা নয়। যে মন চাইলো করলাম, মন না চাইলো, ভেঙে ফেললাম। এসব বিয়ে ভাঙা -গড়া বড়লোকদের। রানার মত দিন আনে দিন খায় মানুষেরা জীবনে বিয়ে একটাই করে। আগে বিথি অনেক মেসেজ দিতো। সারাদিন কয়েকবার ফোনকল। এখন, খুব দেরী হলে, হয়ত একটা মেসেজ- ‘কখন আসবে’?

রানার খুব খারাপ লাগে। বিয়ে নামক বন্ধনে ভালোবাসা খুব দরকার। রানা একাকী বসে থাকে। চোখ-মুখ জুড়ে একরাশ বিষণ্ণতা।

‘রানা ভাই! কি হলো। চেহারায় তো কাঁদো কাঁদো ভাব?’

সায়রা, রানার সহকর্মী। হাসিখুশি মেয়ে। সারাক্ষণ হাসে অন্যদের হাসায়। অফিসে ওকে বলা হয় লাফিং ওমেন। পজিশনে রানার সিনিয়র হলেও বয়সে ছোটো। মেয়েটা স্মার্ট, গুড লুকিং। রানা চট করে উঠে বসে।

‘আরে না না৷ আপু, এদিক হঠাৎ। ‘

‘আপনাকে দেখছিলাম। মন মরা হয়ে আছেন।’

‘এই এমনি’।

‘লাঞ্চ শেষ?’

‘না। খিদে নেই।’

‘এটা ঠিক না। চলেন, আমিও লাঞ্চ করব।’

‘আপা, আপনি যান। আমার বদহজম হয়েছে মনে হয়।’

‘সর্বনাশ। আজ আপনার পাশে যে বসেছে তার তো খবরই আছে।’

সায়রার রসিকতায় রানা না হেসে পারে না। মাথাটা এতক্ষণে একটু হালকা লাগে। সায়রা বেশ জোর করে খেতে নিয়ে গেলো রানাকে। সাধারণ খাবার। ভাত -ডাল- সরিষা ভর্তা-মাছভর্তা-বেগুন আলুর ঝোল। খাওয়া শেষে বিল দিল সায়রা।

‘খেতে আসলে ছেলেরা বিল দেয় আপা।’

‘আমি আপনাকে নিয়ে এসেছি।’

‘আরেকদিন আপনাকে আমি নিয়ে আসব।’

‘অফকোর্স আসবেন। যেদিন আমি চেয়ারে বসে মুখ হাঁড়ি বানিয়ে রাখব, তখন যদি না আসেন তো খবর আছে।’

অফিস আওয়ারটা আর খারাপ লাগলো না রানার। এমনকি বের হয়ে সায়রার সাথে হেঁটে অনেকদূর এলো সে। রানা অনুমতি নিয়ে একটা সিগারেট ধরালো।

‘আমি একটা সময় স্মোক করতাম।’

কাশতে কাশতে রানা সিগারেট ফেলে দেয়। এই মেয়ে বলে কি!

‘আহা, ধ্যাৎ। মাটি থেক ওটা তুলুন। ঝেড়ে নিন।’

‘আপা, কি বলেন না বলেন। কি হাসান নাকি।’

‘হাসালাম কোথায়। মেয়েরা সিগারেট খেতে পারে না? ‘

রানা রিকশা ডাকে। সায়রা মাটিতে পরে থাকা সিগারেটটা তুলে ডাস্টবিনে ফেলে দেয়। রানা রিকশায় বসে সায়রাকে বিদায় জানালে সায়রা বলে ওঠে,

‘আপনি আমাকে নেক্সট স্টপেজে নামিয়ে দিন। ‘

রানা আমতা আমতা করে। বিয়ের আগে তেমন মেয়েদের সাথে বন্ধুত্ব বা কথা বলা কোনোটাই হয়নি। বিথি তার জীবনে প্রথম।

‘আবার ভয় পাচ্ছেন। থাক চলে যান। আমি হেঁটে যাব।’

রানা সায়রাকে রিক্সায় আসতে বলতে চেয়েও থেমে যায়। একটা অদৃশ্য বাধা তাকে টেনে ধরে। সায়রা হাত নাড়িয়ে বিদায় জানালে রানা আনমনে ভাবে, অফিসে চাকরী করে সায়রা কত দিল খোলা। গল্প গুজবে সময় কেটে গেলো কখন টের পেলো না। আর বিথি! সারাদিন বাসায় থেকে ওর মন সংকীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। বউটা সায়রার মত মন খোলা পাখি হলে কত্ত ভালো হতো।

টুংটাং শব্দে রিক্সা চলে। রানার ফোনো সায়রার টেক্সট আসে। ‘ কালকে বাসা থেকে খাবার আনবেন। ভাবীর হাতের রান্না খাবো। আপনার এত সুন্দর ফিগার আর কর্মক্ষমতার উৎস আমিও চাখতে চাই। হাহাহা।’

রানার মন জুড়ে উৎফুল্লতা। সায়রাকে আগামী শুক্রবার বাসায় দাওয়াত দিলে কেমন হয়। না৷ শুধু সায়রাকে ডাকলে দেখতে খারাপ দেখায়। কয়েকজন সহকর্মীকে বলবে একত্রে। বিথি তো আছেই। রান্না ছাড়া ওর কাজ করার কিছু নেই। একদিন কয়েকজনকে আতিথেয়তা করা এমন কোনো কঠিন বিষয় না। রানাও সাহায্য করলো। সায়রার মেসেজটা বারবার পড়ে রানা। এমন একটা মেসেজ যাি বিথি তাকে আজ দিতো!.

- Advertisement -

Read More

Recent