
টার্কিস এয়ারলাইন্স কাউন্টারে রিপোর্টিং ভোর চারটায়। ফ্লাইট সকাল সাতটায়। ১৩ মার্চ রাতটা প্রায় না ঘুমিয়েই কাটলো। আমীরুলদের গোলারটেকের বাড়িতে আমাকে সঙ্গ দিতে চলে এলো মাযহার। গত দুটি মাস আমীরুল মাযহার আর আমি—আমরা তিনজন একসঙ্গে কাটিয়েছি দিবস-রজনীর অধিকাংশ সময়। নিচ তলায় যে ঘরটা আমীরুল আমাকে ছেড়ে দিয়েছিলো সেই ঘরে মাযহার আর আমি অনেক গল্প করলাম, ঢাকায় আমার শেষ রাত্রিতে। ঢাকার মশাকে আমি খুব ভয় পাই। আমাকে মশার হাত থেকে বাঁচাতে আমীরুল লিকুইড স্প্রে আর ইলেক্ট্রনিক কয়েলের পর্যাপ্ত যোগান রেখেছে। ওদের বাড়িতে আমার অবস্থানকে কুসুমাস্তীর্ণ করার যাবতীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে। মাছ খেতে ভালোবাসি বলে বিশাল আকারের চিতল-চিংড়ি-আইড়-বোয়াল আর কৈ মাছের আয়োজন ছিলো প্রাত্যহিক।
পুরো ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ থেকে লাইভ অনুষ্ঠান করার হ্যাপা অনেক। অনেক স্ট্রেস জমা হয় মস্তিষ্কে। সেই স্ট্রেস থেকে মুক্ত করতে মেলা শেষ হতেই আমীরুল একটা ট্যুরের ব্যবস্থা করলো। ঢাকা-কাঠমান্ডুর ফ্যান্টাস্টিক ট্যুর। মার্চের ২ থেকে ৫। চারদিনের ফাটাফাটি একটা ঘুর্ণি। পৃথিবীর বহু দেশ আমার ঘোরা হয়েছে কিন্তু বাড়ির পাশে নেপাল যাওয়া হয়নি। আমীরুল তাই নেপালকেই বেছে নিয়েছে। সত্যজিতের কল্যাণে ‘যত কাণ্ড কাঠমান্ডুতে’ পড়ে এমনিতেই কাঠমান্ডুকে আমার অনেক চেনা মনে হতো। আমীরুলের কল্যাণে সেই কাঠমান্ডুর অপার সৌন্দর্য স্বচক্ষে অবলোকনের সুযোগ হলো। কাঠামান্ডুর ট্যুরিস্ট জোন থামেল এলাকায় থাকলাম কয়েকটা দিন। প্রাণভরে ঘুরলাম ভক্তপুর-পাটান এবং নাগরকোট এলাকা। সিটি সেন্টারে হাইওয়ে নামের একটা ফালতু হিন্দি মুভি আধঘন্টা দেখে হল থেকে বেরিয়ে এলাম। টিকিট কাটার সময় ছবিটার পক্ষে অনেক উচ্চপ্রশংসাবানী উচ্চারণ করেছিলো বলে রুপুর ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেলো। আমীরুলের সঙ্গে ভ্রমণের মজাই আলাদা। সঙ্গীদের আনন্দ আর স্বাচ্ছন্দের ব্যাপারে ওর একটা পরিকল্পিত ছক আঁকা থাকে। থামেল ইম্পালা হোটেলে নিশি যাপন করতাম বলে রাতের খাবারটা আশেপাশেই সেরে নিতাম। ব্ল্যাকঅলিভ রেস্টুরেন্টে ডিনার উইথ নেপালি ফোকসং আর যন্ত্রানুষঙ্গ আমাদের পানাহারকে মধুময় করে তুলতো। এখানেই একরাতে দেখা হলো ফেসবুক বন্ধু দীপু মাহমুদের সঙ্গে। কেয়ার-এর কর্মকর্তা। কনফারেন্সে এসেছে। আমাকে দেখে ছুটে এলো পাশের টেবিল থেকে। এটাই আমাদের প্রথম দেখা। ডিনারের এই সময়টায় আমাদের আড্ডাটা জমজমাট হতো। প্রতি রাতেই আলোচনা-সমালোচনা আর বিতর্কে জড়িয়ে পড়তাম আমরা। আশপাশের টেবিলের লোকজন প্রথম প্রথম ভাবতো আমরা ঝগড়া করছি। পরে বুঝেছে এটা ঝগড়া নয়, বিতর্ক। এক রাতে বইয়ের ফ্ল্যাপ নিয়ে পড়লাম। তুমুল হল্লা শেষে আমরা তিনজনেই একমত হলাম যে—ফ্ল্যাপে ফালতু এবং বাড়তি কথাগুলো ছেঁটে ফেলতে হবে। ফ্ল্যাপ হবে নির্মেদ। স্লিম। আগামী বইমেলায় পাঠকরা আমাদের বিতর্কের ফলাফল দেখতে পাবেন। হাতি-ঘোড়া মারার কাহিনি আমাদের বইয়ের ফ্ল্যাপে ঠাঁই পাবে না আর।
আমীরুল ইদানিং ককটেল এক্সপার্ট হিশেবে বন্ধুদের বিস্মিত করছে। ঢাকা কলকাতা আর কাঠমান্ডুর শপিংমল ছেনে নিয়ে এসেছে ‘ককটেল টুলস্’ সামগ্রী। কিনেছে ককটেল এনসাইক্লোপিডিয়াসহ এই বিষয়ে নানান রকম বই। সেইসঙ্গে তিন জায়গা থেকেই কেনা হয়েছে ককটেল ইনগ্রিডিয়েন্স। কয়েনথ্রু, মালিবু, কাহালু থেকে লাইম কর্ডিয়াল–কী নেই ওর সংগ্রহে! টাকিলা-হুইস্কি-রাম-জিন আর ভদকার বিপুল সমাহার ওর ব্যক্তিগত বার-এ। ১৩ মার্চ রাতে মাযহারের সম্মানে ভদকা উইথ লাইম কর্ডিয়াল বানালো আমীরুল। ফিরোজা রঙের সুমিষ্ট ককটেল। দেখলেই চুমুক দিতে ইচ্ছে করে। কয়েক গ্লাস ফিরোজা পান করে আমাকে সঙ্গ দিতে আসা মাযহার আধশোয়া অবস্থায় নাসিকা গর্জন শুরু করলো। একপর্যায়ে নিজের গর্জনে নিজেই জেগে উঠে আমাকে জিজ্ঞেস করলো—নাক ডাকে কে?
রাত সাড়ে তিনটার পর এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। সঙ্গে মাযহার আর পলু। আমীরুলের ছোট ভাই। রেড ক্রিসেন্টের যুব বিষয়ক কর্মকর্তা। ড্রাইভারের আসনে হযরত। আমীরুলের বিশ্বস্ত ড্রাইভার। চমৎকার ড্রাইভ করে। ঢাকার পথ-ঘাট অলিগলি খুব ভালো চেনে। গত দুটি মাস অসহনীয় যানজটে বিপর্যস্ত আমি এই প্রথম যানজটমুক্ত রাস্তায় নতুন এক ঢাকাকে দেখলাম। মিরপুর গোলারটেক থেকে এয়ারপোর্ট পৌঁছুতে মাত্র মিনিট কুড়ি লাগলো। টি-টুয়েন্টি ক্রিকেট বিশ্বকাপের উদ্বোধন উপলক্ষে এয়ারপোর্ট রোডটি বর্ণিল আলোকসজ্জায় ঝলমল করছে। এরকম খুদে খুদে বর্ণাঢ্য তারাবাতি কানাডায় বিস্তর দেখেছি। প্রতিবছর উইন্টারে কানাডা এইরকম তারাবাতির চাকচিক্যে রূপসী হয়ে ওঠে। প্রিয় ঢাকাও অসম্ভব রূপসী হয়ে উঠেছে! আহারে ঢাকা আমার ঢাকা!
প্রতিবার কানাডা ফেরার দিন বাড়ি থেকে এয়ারপোর্ট যাবার এই পথটা অতিক্রম করতে খুবই কষ্ট হয় আমার। ঢাকা এয়ারপোর্ট যতো এগিয়ে আসে আমি ততোই আক্রান্ত হই বিষণ্নতায়। বাংলাদেশের সঙ্গে আমার যোগাযোগের শেষ সূতোটা কেটে দেয় এই এয়ারপোর্ট। আমি বারবার মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে ঘড়ির সময় দেখি। আর বাকি তিন ঘন্টা। তিনঘন্টা পরেই বিদায় বাংলাদেশ। গুডবাই বাংলাদেশ। কিন্তু বাংলাদেশকে আমি কখনো বিদায় বলি না। গুডবাই বলি না। প্রিয় বাংলাদেশকে বিদায় বলা যায় না। গুডবাই বলা যায় না। আমাকে সি অফ করতে আসা মাযহার পলু আর হযরতের কাছ থেকে অশ্রু গোপন করে বিদায় নিয়ে ঢুকে পড়ি এয়ারপোর্ট নামের রহস্যময় টানেলে। এই টানেলই আমাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাবে বিমানের আসনে। তারপর শুরু হবে আমার এক বিপন্ন বিষণ্ন বিরামহীন যাত্রা। ফিল্মের রিল যেমন দ্রুত দৌঁড়ায় আমার স্মৃতিও তেমনি দৌঁড়ুতে থাকে। গত দুমাসের সমস্তস্মৃতি এক ঝটকায় সামনে এসে দাঁড়ায়। বইমেলা। নতুন বই। বাংলা একাডেমি। চ্যানেল আই। সরাসরি সম্প্রচার। আইএফআইসি ব্যাংক। শাহ আলম সারওয়ার। লক্ষ হাজার চেনা অচেনা মানুষ। শামসুজ্জামান খান। সায়ীদ স্যার-আবেদ ভাই-সানজিদা আপা-মেনকা আপা-মনজুর ভাই। আনন্দ আলো প্রতিদিন-রেজানুর। পিটু-আসাদ। ঢালী-কাজল-সফিক-ফরিদ-মনিরুল হক। হাশেম খান। ধ্রুব-সোহাগ-তুলি। লেখক,হবু লেখক,তবু লেখক। তেজগাঁও চ্যানেল আই ভবন। নান্টু, জামাল রেজা। মোহসীন রেজা-হাবিব আহসান-আদিত্য শাহীন-মঈন-শাজাহান-কফিল-মানিক। রহমান-মিলন-আফজাল-আলী ইমাম। ব্রাউনিয়া-মৌসুমী বড়ুয়া। অনন্যা রুমা। ওয়াসিফ-শিরীন বকুল-অমি-মেহদি-রুপু। শাহজাহান চৌধুরী-শ্বেতা-চন্দন। রাবেয়া খাতুন-কেকা-প্রবাল। সাগর ভাই। ফরিদুর রেজা সাগর। সাগর ভাইয়ের বিশাল কক্ষ। সেই কক্ষের সামনের টেবিলে বসে আমার প্রতিদিনের টুকটাক কর্মকাণ্ড-ল্যাপটপ-লেখালেখি। সাগর ভাই বেশ কয়েকদিন পাশের একটি কক্ষে এককভাবে বসার কথা বলেছেন। কিন্তু আমি রাজি হইনি। কেনো হইনি? সেই কক্ষে আলাদা প্রাইভেসি নিয়ে বসা হয়তো হবে কিন্তু আমি তো সারাক্ষণ চোখের সামনে সাগর ভাইকে দেখতে পাবো না। আমি তো চাই তাঁকে দেখতে। যতোক্ষণ পারি। প্রতিবার ইমিগ্রেশন ক্রস করে সাগর ভাইকে শেষ কলটা দিই—যাই সাগর ভাই। সাগর ভাই বলেন—আবার দেখা হবে। কিন্তু এবার অন্য এয়ারলাইন্সে যাচ্ছি বলে আগের দিন রাতেই বিদায় নিয়েছি তাঁর কাছ থেকে। বলেছি ভোর চারটায় আপনাকে কল দেবো না। সাগর ভাই বললেন—দিও। আমি জেগে থাকবো। কিন্তু আমি দিইনি। সাগর ভাইয়ের ঘুম দরকার। আমি তাঁর ঘুম ভাঙাতে চাই না। ভোর সাড়ে চারটায় সাগর ভাই ফোন করলেন—সব ঠিক আছে তো? আমাকে শুভ বিদায় জানাতে সাগর ভাই ঘুমোননি! এয়ারপোর্টে আমার শেষ সময়টুকুর স্বাচ্ছন্দ নিশ্চিত করতে উদ্যোগী হয়ে ওঠেন সাগর ভাই। ভেজা চোখ নিয়ে আমি ইমিগ্রেশন পার হই। এরকম ভালোবাসাই তো আমাকে বাঁচিয়ে রাখে আরো একটি বছর!
বিমানে নিজের আসনে বসে টের পাই বুকের ভেতরটা ধুকপুক করছে। আমার বড় ভাই মিজানকে ফোন করি। বিমানের চাকা সচল হয়ে ওঠে। রানওয়ে ধরে বিমানটা দৌঁড়ুতে থাকে সামনের দিকে। আর আমি দৌঁড়ুতে থাকি পেছন দিকে। বিমান দৌঁড়োয়। আমিও দৌঁড়াই। আমাকে পরাজিত করে বিমান জয়ী হয়। বাংলাদেশের মাটি থেকে আমাকে বিচ্ছিন্ন করে ছত্রিশ হাজার ফিট উঁচুতে আমাকে তুলে নিয়ে যায় বিমান। দ্রুত আমি একটা ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে নিই। আমার পদ্মা-মেঘনা-যমুনা থেকে আমাকে তুলে নিয়ে আটলান্টিক মহাসাগরের উদ্দেশ্যে ছুটতে থাকে বিমান। আটলান্টিকের ওপারে আমার জন্যে অপেক্ষা করছে নদী আর শার্লি। ঘুমিয়ে পড়ার আগে বাংলাদেশকে আমি বিদায় বলি না। গুডবাই বলি না। বলি—আবার দেখা হবে। তুমি ভালো থেকো বাংলাদেশ।
অটোয়া, কানাডা
