
হঠাৎ করে পাশে তাকিয়ে দেখে দিহান দাঁড়িয়ে আছে। চৈতালি ভ্রু কুঁচকে কিছু বলবে অমনি দিহান সালাম জানিয়ে মুচকি হেসে বলে,”কাউকে খুঁজছেন? কিছু লাগবে?”
চৈতালি সৌজন্যতা দেখিয়ে বলে,”না কিছু লাগবেনা।” এরপর সামনে স্টেজের দিকে তাকাতেই দিহান বলে,
“ধন্যবাদ আপা।”
“হঠাৎ ধন্যবাদ কেনো?”
“আপনি কষ্ট করে এসেছেন এজন্য ধন্যবাদ।”
চৈতালি গম্ভীর হয়ে বলে,”আর কিছু বলবে?”
“কোন প্রয়োজন হলে আমাকে জানাবেন আপা।” বিনয়ের সাথে কথাটা বলেই দিহান স্টেজের দিকে হাঁটা শুরু করে আর বিড়বিড় করে বলতে থাকে,”শা*লা কপালটাই খারাপ। ভাবলাম আপাকে একটু পটাবো যাতে ফাল্গুনীকে পাওয়ার রাস্তাটা সহজ হয় কিন্তু ইনি তো …”
দিহান চলে যেতেই ফাল্গুনী এসে পাশের চেয়ারে ধপাস করে বসেই বলে,”সরি আপা একটা কাজে ফেঁসে গিয়েছিলাম তাই দেরী হলো।”
“কোথায় গিয়েছিলি? কীসের কাজ?”
“এইতো স্টেজের পেছনেই ছিলাম। আজ তোমার জন্য দুটো সারপ্রাইজ আছে। আরেকবার রিহার্সেল করতে….” কথাটা বলতেই জিভে কামড় দেয় ফাল্গুনী। অন্য প্রসঙ্গে যেতে চাইলেও চৈতালি সেটা হতে দেয়না। উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
“কীসের রিহার্সেল? তুই কি কিছুতে নাম দিয়েছিস নাকি?”
ফাল্গুনী হেসে মাথা নেড়ে বলে,”হ্যা আপু। কিন্তু প্লিজ তুমি এটা বাসায় কাউকে বলো না। মানে মাকে বলো না। জানো তো মা এসব পছন্দ করে না।”
চৈতালি হেসে বলে,”এতো ভয় পেতে হবে না। চিন্তা করিসনা আমি মাকে বলবো না। আর বলবোই বা কীভাবে? মা কি আমার সাথে প্রয়োজন ছাড়া কথা বলে?”
শেষ কথাটা বলতে বলতে চৈতালির মুখটা আঁধার হয়ে এলে ফাল্গুনী প্রসঙ্গ পাল্টে বলে,”আরেকটা ভালো খবর আছে আপু।”
চৈতলি অন্যমনস্ক হয়ে বলে,”কি ভালো খবর?”
ফাল্গুনী হাসিমুখে বলে,”দীপ্র ভাইয়ার চাকরি হয়েছে। আগামী মাসে এই ডিপার্টমেন্টেই লেকচারার হিসেবে জয়েন করবে।”
“তাই নাকি? এটা তো বেশ ভালো খবর।” চৈতালির ঘোর কাটে। কেনো যেনো খবরটা শুনে ভীষণ ভালো লাগে। ভেতর থেকে বেশ হালকা হালকা একটা অনুভুতি হয়। কারন মনে মনে দীপ্রর পাগলামি দেখে,ওর পেছনে অযাচিত সময় নষ্ট করতে দেখে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা চিন্তিতই ছিলো। তবে আজ খবরটা পেয়ে বেশ খুশি লাগছে। চাকরি শুরু করলে ব্যস্ততা বাড়বে। তখন আর সময়ে অসময়ে বিরক্ত করবে না। তার প্রতি দীপ্রর ঘোরটাও হয়তো আপনাআপনি কেটে যাবে। এসব ভাবতেই ফাল্গুনীর ধাক্কায় ধ্যান ভাঙে তার। ভ্রু কুঁচকে ইশারায় কি হয়েছে জানতে চাইলেই ফাল্গুনী স্টেজের দিকে আঙুল তুলে বলে,”ভাবনার জগত থেকে বের হয়ে এবার আমাদের নতুন লেকচারারকে দেখো। এখন তিনি গান গাইবেন।”
বোনের কথা শুনে চৈতালি সামনে তাকাতেই দেখে স্টেজে দাঁড়িয়ে আছে দীপ্র। নীল রঙের পাঞ্জাবি, চোখে চশমা আর হাতে গিটার। মনে মনে ভাবে দেখতে এতো নম্র,ভদ্র ছেলেটা তাকে এতোটা জ্বালায়?
এদিকে দীপ্র কোন রকম ভূমিকা ছাড়াই গাওয়া শুরু করে,
“হুম…হুম…
হুম…হুম…
বড় ইচ্ছে করছে ডাকতে
তার গন্ধে মেখে থাকতে
কেন সন্ধ্যে সন্ধ্যে নামলে সে পালায়
তাকে আটকে রাখার চেষ্টা
আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে তেষ্টা
আমি দাড়িয়ে দেখছি শেষটা জানালায়
বোঝেনা সে বোঝেনা
বোঝেনা সে বোঝেনা
বোঝেনা সে বোঝেনা
বোঝেনা সে বোঝেনা
বোঝেনা বোঝেনা বোঝেনা
বোঝেনা বোঝেনা বোঝেনা
পায়ে স্বপ্ন স্বপ্ন লগ্নে
তার অন্য অন্য ডাকনাম
তাকে নিত্যনতুন যত্নে কে সাজায়
সব স্বপ্ন সত্যি হয় কার
তবু দেখতে দেখতে কাটছি
আর হাটছি যেদিকে আমার দুচোখ যায়
বোঝেনা সে বোঝেনা
বোঝেনা সে বোঝেনা
বোঝেনা সে বোঝেনা
বোঝেনা সে বোঝেনা
বোঝেনা বোঝেনা বোঝেনা
বোঝেনা বোঝেনা বোঝেনা
হুম…হুম… হুম…হুম…
হুম…হুম…হুম…হুম…”
গানটা গিটার হাতে হালকা মিউজিকের সাথে শুনতে চৈতালির চমৎকার লাগে। কেমন যেনো এক কষ্ট কষ্ট অনুভব। আগে কখনো গানটা শোনেনি সে। যদিও এক সময় খুব গান শুনতো। কিন্তু তুষারের ঘটনার পর থেকে জীবনের মানে পাল্টে গেছে তাই এসবের প্রতি কোন ঝোঁক কাজ করতো না তার। তবে হ্যা দীপ্রর গান তার পছন্দ। ছেলেটা বেশ গায়। অনেকদিন পর দীপ্রর গান দিয়েই আবার শোনা শুরু হয়েছিলো। কিন্তু ছেলেটার প্রেম, ভালোবাসা নিয়ে অতিরিক্ত বিরক্ত করার কারনে মাঝে মাঝে গান শুনতেও বিরক্ত লাগতো।
আজকের গাওয়া গানটা অন্যরকম। দীপ্র বেশ দরদ দিয়েই গেয়েছে গানটা। আর গানটা যে দীপ্র তাকে ইঙ্গিত করেই গেয়ে যাচ্ছে এটা সে ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছে। সামনের দিকে বসায় সামনের মানুষটা যে তার দিকে আড় চোখে বারবার তাকাচ্ছিলো এটাও বুঝতে বাকি ছিলো না তার। কিন্তু বুঝতে পারলেও প্রকাশ করা যাবেনা। না বিরক্তিও দেখানো যাবেনা। কারন তাহলেই আরো প্রশ্রয় পাবে। তাই মোবাইল হাতে ব্যস্ততার ভান করেই পুরো গানটা শোনে সে।
গান শেষ হতেই সবাই হাততালি দেয়া শুরু করে। ফাল্গুনীও হাতে তালি দিতে দিতে বলে,”কি সুন্দর করেই না গাইলো গানটা। আহা! দারুন ছিলো তাই না আপু?”
চৈতালি কোন রকম উচ্ছাস প্রকাশ না করে খুব স্বাভাবিক ভাবেই বলে,”হ্যা ভালোই গেয়েছে।”
বোনের এমন প্রতিক্রিয়া দেখে ফাল্গুনী বলে,”আজ এই গান শুনে কতোজন যে ভাইয়ার ওপর ক্রাশ খেলো আল্লাহ জানেন। তাছাড়া যা সুন্দর লাগছে আজ মাশাআল্লাহ।”
চৈতালি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলে,”আর কতক্ষন? আমাকে বের হতে হবে। জানিস তো কাজ আছে।”
ফাল্গুনী এবার প্রচন্ড বিরক্ত হয়। কপাল কুঁচকে বলে,”তুমি এতো রসকষহীন কেনো আপু? একেবারেই পানসে টাইপ। তোমার মতো পানসে নারীর প্রেমে কীভাবে কেউ এমন পাগলামী করে আমি বুঝিনা। পুরোই…”
চৈতালি চোখ গরম করে তাকালে ফাল্গুনী হালকা কেশে বলে,”না মানে বলছিলাম যে….”
চৈতালি কন্ঠে গম্ভীরতা এনে বলে,”সেদিন বাবার বলা কথাগুলো মনে আছেতো? দীপ্রকে নিয়ে কথা বলার আগে ভেবে বলবি। যাক আর কতোক্ষণ লাগবে সেটা বল। আমার কাজ আছে।”
ফাল্গুনী মুখ আধার করে বলে,”এই তো খুব বেশি সময় না। একটু পর আমার নাচ আছে। আমার নাচটা দেখে তারপর নাহয় যাও?”
“ঠিক আছে।”
এর কিছুক্ষণ পরেই শুরু হয় ফাল্গুনীর নাচ। ফাল্গুনীর নাচের সময় তার দিকে দিহানের অপলক তাকিয়ে থাকা নজর এড়ায়নি চৈতালির। তবে তাই বলে মনে উঁকি দেয়া অযাচিত চিন্তাগুলোকে প্রশ্রয় দেয়না সে। এরপর আরো প্রায় এক ঘন্টা যাবত চলে অনুষ্ঠান। নাচ,গান, আবৃত্তি সব মিলিয়ে বেশ ছিলো আয়োজন। চৈতালি সবচেয়ে বেশি অবাক হয় দীপ্রর উপস্থাপনা শুনে। শেষের দিকে উপস্থাপনা করে দীপ্র। চমৎকার, সাবলীল কথায় সুন্দর ছিলো সবটা। আসেপাশে বসা অনেক ছাত্রীদেরই আলাপে ছিলো দীপ্রর গান, স্মার্টনেস,উপস্থাপনার বিষয়গুলো। এসব বিষয়ও চৈতালিকে বেশ আনন্দ দেয়। বিরক্তির মাঝেও ছেলেটার এসব গুন দেখে ভালোই লাগে আজ।
______
চৈতালি ফাল্গুনীর সব বন্ধুদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে টিএসসির সামনে মাত্রই এসে দাঁড়িয়েছে। কিছু কাজের জন্য ফাল্গুনীর যেতে দেরী হবে। এদিকে চৈতালির নিজেরও নীলক্ষেত কিছু কাজ আছে। তাই অপেক্ষা না করে রওনা দেয় সে। কিন্তু কোন রিকশাই যেতে রাজি হচ্ছে না। এদিকে আকাশেও আবার হালকা মেঘ জমেছে। ঠান্ডা একটা বাতাস বইছে। সকাল থেকে গরমের যে তীব্রতা ছিলো নিমিষেই সেই গরমের তীব্রতা কমে গেছে। যে কোন সময় হয়তো বৃষ্টি শুরু হবে। এমন মেঘলা দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর হাঁটতে চৈতালির ভীষণ ভালো লাগে। নীলক্ষেত খুব বেশি দুরেও নয়। তাই আর রিকশার জন্য অপেক্ষা না করে হাঁটা শুরু করে। এমন সময় দীপ্রর ডাকে ফিরে তাকাতেই দেখে সে দৌড়ে এসে পাশে দাঁড়িয়ে কোমরে হাত রেখে হাপাচ্ছে। এভাবে দৌড়ে এসে হাপাতে দেখে চৈতালি চিন্তিত হয়ে বলে,”কি ব্যাপার? এভাবে দৌড়ে এসেছো কেনো? কোন সমস্যা?”
দীপ্র হাত দিয়ে ইশারা দিয়ে অপেক্ষা করতে বলে জোরে জোরে শ্বাস ছাড়ছে। চৈতালি বিষয়টা বুঝতে না পেরে আবার বলে,”কোন সমস্যা? ফাল্গুনী পাঠিয়েছে তোমাকে? কিছু লাগবে?”
দীপ্র এবার হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,”আপনি আজ এতো কথা বলছেন কেনো জবা? আপনি তো এতো কথা বলেন না!”
চৈতালি এবার নিজেকেই নিজে সুধায়,”আমি আজ বেশি কথা বলছি? কই না তো?”
“হ্যা তো।”
চৈতালি কপালে ভাঁজ ফেলে বলে,”আমি শুধু জিজ্ঞেস করলাম যে এভাবে দৌড়াতে দৌড়াতে এসেছো কেনো? এটা কি বেশি কথা বলা হলো?”
“ধন্যবাদ”
চৈতালি বলে,”হঠাৎ আবার ধন্যবাদ কেনো?”
“সেদিন আমার মা’কে…..”
বিষয়টা চৈতালী বুঝতে পারে। তাই দীপ্রকে থামিয়ে দিয়ে ধীর কন্ঠে বলে,”এটাতো আমার দায়িত্ব তাই না? মানে একটা মানুষ বিপদে পড়লে তাকে সাহায্য করবো এমনটাই তো হওয়া উচিত। এতে ধন্যবাদ কেনো?”
“কারন আপনি এই ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। সবাই তো আপনার মতো ভাবেনা।”
“ঠিক আছে ধন্যবাদ গ্ৰহন করলাম। এবার আসি?”
কথাটা বলে হাঁটা শুরু করতেই দীপ্র বলে,”আমি একটু আপনার সাথে আসি? মানে কিছু কথা ছিলো।”
