চিত্রা

আকাশ দু হাতে দুটো কোল্ড চকোলেট কফি নিয়ে অয়নের কেবিনে ঢুকলোওকে দেখে অয়ন হিম কণ্ঠে বললতুই জরুরি কিছু বলবি

আকাশ দু হাতে দুটো কোল্ড  চকোলেট কফি নিয়ে অয়নের কেবিনে ঢুকলো।ওকে দেখে অয়ন হিম কণ্ঠে বলল,”তুই? জরুরি কিছু বলবি?”

আকাশ কেবিনের সোফায় আয়েশ করে বসে বলল,”কেনো? জরুরি কিছু না বললে তোমার কাছে আসা বারণ?”

- Advertisement -

অয়ন বলল,”আমি কি তা বলেছি?”

আকাশ ফটাফট বলল,”তুমি কি আমার উপর রেগে আছো?”

অয়ন ভ্রু উচায়,”তোর হঠাৎ এমনটা মনে হবার কারণ?”

আকাশ বলল,”যেভাবে মুখটা তুমি গম্ভীর করে বসে থাকো,তাতে কি মনে হওয়া স্বাভাবিক নয়?”

অয়ন মোটা গলায় বলল,”আকাশ,ভনিতা না করে কিছু বলার থাকলে বলে ফেল,আর না বলার থাকলে আসতে পারিস এখন,আ ম বিজি নাও।”

আকাশ বলল,”আসলে তোমার সঙ্গে আমার বিষয়ে একটা কথা বলতে এসেছি!”

অয়ন ভ্রু কুচকে শুধায়,”কি কথা?”

আকাশ একটু ইততস্ত বোধ করলো।হাতের কোল্ড কফির গ্লাসটা ভাইয়ের দিকে বাড়িয়ে ধরে বলল,”আগে এটা খেয়ে নাও!”

অয়ন বলল,”আকাশ,আমার টাইম লস্ট করিসনা! যা বলার বলে ফ্যাল।এখন দুপুর একটা,এই টাইমে আমি কফি খাইনা।”

আকাশ অভিমানী সুরে বলল,”আমি এত আশা নিয়ে আনলাম আর তুমি এইভাবে ফিরিয়ে দিলে? কফি টা নে খেলে বুঝবো তুমি আমার উপর সত্যিই রেগে আছো!”

অয়ন জিভের ডগায় বিরক্তিকর শব্দ ফোটাল।বলল,”উফ! এই বয়সে এমন বাচ্চামো তোকে আদোও মানায়?”

তারপর অতিষ্ট হয়ে ফের বলল,”আচ্ছা দে কফিটা!”

আকাশ চুপসানো মুখে হাসি টেনে ভাইয়ের হাতে কফি দিল।অয়ন অনিচ্ছা সত্বেও সেটায় চুমুক দিয়ে বলল,”নে খেয়েছি,খুশি হয়েছিস?এবার বল কি বলবি!”

আকাশ শুষ্ক ঠোঁট দুটো জিভে চুবিয়ে বলল,”ইয়ে ভাইয়া আমিনা একটা মেয়েকে খুব ভালোবাসি,ওকে বিয়েও করতে চাই!কিন্তু ড্যাড কে সাহস করে বলে উঠতে পারছিনা!”

অয়ন শান্ত কণ্ঠে বলল,”তো সেখানে আমি কি করতে পারি?এসব কথা আমায় কেনো বলছিস?”

আকাশ বলল,”আমার বিয়ে করাটা তো তোমার উপরই নির্ভর করছে ভাইয়া!আম্মু বাবা সবাই জেদ ধরে বসে আছে তোমার বিয়ে না করিয়ে আমায় বিয়ে দেবেনা!”

অয়ন এবার ভ্রু গুছিয়ে সোজাসুজি বলল,”এখন নিশ্চই তুই তোর বিয়ের জন্যে আমাকে বিয়ে করতে বলবিনা?”

আকাশ থতমতো খেলো।বিস্ময় নেত্রে,হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইলো কেবল। না বলতে তার ভাই কেমন করে তার মনের কথা ধরে ফেলল?

নিজেকে গুছিয়ে জিভের ডগায় শব্দ ফুটিয়ে বলে গেলো,”তো আর কি বলবো বলো? তুমি বিয়ে করছ না বলে আমারটাও ঝুলে আছে! এখন  তুমি আশি বছর বয়সে বিয়ে করবে আমাকেও কি সেই অবধি অপেক্ষা করতে হবে?”

অয়নের দায়সারা জবাব,”আমি তোর হাত পা বেঁধে রেখেছি যেন বিয়েটা না করতে পারিস!আমার ইচ্ছে আমি বিয়ে করছিনা,তোর ইচ্ছে,তুই কর?কে ধরেছে?”

আকাশ চিমসানো চেহারাটা নিয়ে বলল,”সেরকম হলে তো ভালই হতো!কিন্তু আম্মু বাবা তো কিছুতেই তোমার আগে আমার বিয়ে দেবেনা!”

আকাশের কণ্ঠে হতাশার ছাপ স্পষ্ট।

অয়ন ওকে আশ্বস্ত করে বলল,”সমস্যা নেই,আমি মামুনির সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলবো।”

মুহুর্তের মাঝেই আকাশের মুখে জ্বলজ্বলে হাসি ফুটলো। স্ফূর্ত চিত্তে বলল,”সত্যি ভাইয়া! সত্যিই তুমি আমার বিয়ের ব্যাপারে আম্মুর সঙ্গে কথা বলবে?”

অয়ন হিম কণ্ঠে বলল,”মিথ্যে মিথ্যে কথা বলা গেলে নাহয় মিথ্যে মিথ্যেই বলবো!”

আকাশের ঠোঁটের হাসি প্রশস্ত হলো।খুশিতে আত্মহারা হয়ে চট করে অয়নকে জড়িয়ে ধরল।

অয়ন বিরক্ত হয়ে বলল,”উফ! ছাড়তো! মেয়ে মানুষের মতো এত ঢং করতে হবেনা!”

*

ছাদ থেকে শুকনো কাপড় চোপড় এনে ভাজ করছে হৈমি।ইকবালের তিন চারটা শার্ট ভাজ করে আলমারি তে তুলে রাখতে যাবে আচমকা পেছন থেকে কেউ জড়িয়ে ধরলো ওকে।প্রথম দফায় চমকে উঠলো ও

পরমুহূর্তেই বুঝতে পারলো এটা কার কান্ড!

ইকবাল কিছু ন বলেই হৈমির ঘাড়ে চুমু খেল।খোঁপা করা ঘন চুল খুলে দিল।নিমিষে সেসব পিঠ ছাড়িয়ে কোমর অবধি নামলো।

হৈমি অবাক হয়ে বলল,”আজ এত তাড়াতাড়ি এলেন যে!”

ইকবাল উত্তর দিলনা।ঘন চুলের ভাজে নাক ডোবাল। মদ্যক কণ্ঠে বলল,”চুলে কি এলকোহল মাখো?যেন আমি পাগল হয়ে যাই?”

হৈমি হকচকায়।ইকবালের এ অনাকাঙ্ক্ষিত আগমনের হেতু সে ঠাওর করতে পারলো।  ইকবাল, হৈমির গলার খাজে ঠোঁট বুলায়। নাক টেনে মেয়েলি ঘ্রাণ শুকে।খাদ মাখা কন্ঠে বলে,”গায়ে কি মাখো? তোমার গায়ের মিষ্টি ঘ্রাণটা তো আমায় পাগল বানিয়ে দিচ্ছে!এই মুহূর্তে কিছু অনর্থ কান্ড ঘটে গেলে সে জন্যে কিন্তু আমি দায়ী থাকবনা!”

হৈমি বিস্মিত হলো।দুজন একই ওয়াশরুম ব্যবহার করে।সেখানেই তো সব শ্যাম্পু, বডি ওয়াশ রাখা,তার বউ কি মাখে,সেটাও জানেনা এই লোক?

অকস্মাৎ ইকবাল হৈমিকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে ওর ঠোঁটে আলতো চুমু খেল।তারপর পাজকোলে তুলে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে বলল,”সরি,মুড এসেছে, কিচ্ছু করার নেই!”

হৈমি লাজে কাচুমাচু হয়ে মিনমিন করে বলল,”আমি পিরিয়ড হয়েছি!”

ইকবালের চোখেমুখের প্রেম ভাব নিমেষেই  উবে গেল।বিরক্তি কণ্ঠে জানতে চায়,”কদিন চলছে?”

হৈমি মাথা নুইয়ে মিহি কণ্ঠে বলল,”আজ সকালে।”

ইকবাল ফোঁস করে শ্বাস ঝাড়ে।তারপর হৈমির উপর ঝুঁকে যায়।

হৈমি হকচকিয়ে বললে,”ক…কি করছেন?”

ইকবাল ফিসফিস করে বলে,”তেমন কিছু করবো না,শুধু অল্প একটু আদর করবো!”

**

পরদিনকার কথা…

ঘড়িতে তখন সাড়ে এগারোটা বাজবে প্রায়।

একটা বড়সর কেবিনের বাইরে পাশাপাশি চেয়ারে বসে আছে চিত্রা আর মিথিলা।দুজনের চোখেমুখেই চিন্তার ছাপ স্পষ্ট।

একটু আগেই ওরা অফিসে এসেছে, ইন্টারভিউ দিতে।আশেপাশে আরো বিশ পঁচিশ জনের মতো লোকজন বসে। উনারাও ওদের মতোই এখানে ইন্টার ভিউ দিতে এসেছে।

আচমকা মিথিলার ডাক পড়লো। ও উঠে দাঁড়িয়ে চিন্তিত স্বরে চিত্রকে বলল,”জান,আমার জন্য দোয়া করিস রে!”

চিত্রা বলল,”আল্লাহ্ পাকের নাম নিয়ে যা।”

মিথিলা মনে মনে নিজেকে স্বাভাবিক ঘোষণা করে ভেতরে ঢুকলো। নার্ভাসনেসে গলা শুকিয়ে যাচ্ছে।কপালের শ্বেত ত্বকে নোনতা স্রোত গড়াচ্ছে।মিথিলা ব্যাগ থেকে টিস্যু বের করে কপালের ঘাম মুছে কাচের দরজায় টোকা দিয়ে শুধায়,”মে আই কাম ইন স্যার?”

আকাশ ফোন ঘাটছিল চেয়ারে আয়েশ করে বসে।কাঙ্ক্ষিত রমণীর রিনরিনে কণ্ঠ শুনে চকিতে মাথা তুলে চাইল।মিথিলার সুশ্রী আনন দেখে মুগ্ধ হলো একটু।ধ্যান খুইয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল কেবল।

মনে মনে বলল,”ঘুর্নায় মান এ প্রভাতে তোমার সঙ্গে আমার শুভ দৃষ্টি বলো মাই লাভ!”

মিথিলা মনে মনে ঢের বিরক্ত হচ্ছে।এইভাবে ভ্যাবলার মতন তাকিয়ে থাকার কি আছে?

ও গলার স্বরটা আরেকটু উচু করে বিনোয় সমেত বলল,”আসবো স্যার?”

আকাশের পাশেই অয়ন গম্ভীর মুখে ল্যাপটপ ঘাটছিল।আকাশ কে কিছু বলতে না শুনে সে নিজেই হিম কণ্ঠে বলল,”কামিন প্লিজ।”

অনুমতি পেয়ে মিথিলা ভেতরে ঢুকলো।আকাশ তখনও তাকিয়ে ওর পানে।মিথিলা আড়ালে চোখ পাকালে আকাশ তৎপর চোখ নামায়।নিজেকে স্বাভাবিক ঘোষণা করে মনে মনে।গলা খাকারি তুলে সামনের পাতা চেয়ার দেখিয়ে বলে,”আপনি বসুন প্লিজ।”

মিথিলা থ্যাংকিউ জানিয়ে বসলো।

নিজের বাওডাটা ভর্তি ফাইলটা এগিয়ে দিল।আকাশ আগ বাড়িয়ে নিল। ফাইলটা খুলে মিছেমিছি নিবেশন দিল হেথায়।মনে মনে ভাবলো,”ফাইলে ঘেঁটে আর কি হবে?মিথিলার জব এমনেতেই কম্ফরাম ও যে আগেই করে রেখেছে! প্রেয়সি কে কাছে রাখার এ অদম্য সুযোগ কি আর হাতছাড়া করা যায়?”

অয়ন মিথিলাকে টুকটাক প্রশ্ন করলো।মিথিলা গুছিয়ে সব কিছুর উত্তর দিল।

প্রথম প্রথম একটু সমস্যা হচ্ছিল বটে,ওই বজ্জাত আকাশের জন্যে,কেমন ক্যাবলা কান্তের মতোন তাকিয়ে আছে দেখো!

অয়ন থমথমে মুখে বলল,”আপনি এখন যেতে পারেন।”

তারপর বলল,”নেক্সট…”

মিথিলা সালাম ঠুকে নরম পায়ে কেবিন ছাড়ে।ওর যাওয়ায় পথে অনিমেষ চেয়ে রইলো আকাশ। ইশ!আজ মিথিলাটাকে কি দারুন লাগছিল না?কত সুন্দর করে চোখে কাজল টেনেছিল!এমন একটা সুন্দর মুখ শ্রী ওদের অফিসে ঘুরে বেড়াবে,ভাবতেই আনন্দে ডগমগ করে উঠছে তার প্রেমিক সুলভ মনটা!

এবার চিত্রার পালা। ক বার দোয়া ইউনূস পড়ে কেবিনের দিকে পা বাড়ালো ও।কে জানে আজ ওর কপালে কি নাচছে?

- Advertisement -

Read More

Recent