হ্যাপির জন্যে ভালোবাসা

আলোকচিত্রআরিফ নজরুল

০১ ফেব্রুয়ারি সকালে টিএসসি হাকিম চত্বরের সামনে শামিয়ানা টানিয়ে জাতীয় কবিতা পরিষদের উৎসব চলছে। এক ফাঁকে আমীরুল আর মাযহারের সঙ্গে চায়ের আড্ডায় যোগ দিতে একেবারে পেছনের দিককার কয়েকটা চেয়ারে এসে জাঁকিয়ে বসলাম। আমাদের সঙ্গে কলকাতার কবিবন্ধু শ্যামলকান্তি দাশ, অমিত গোস্বামীসহ আরো কয়েকজন। এই এলাকায় এইরকম সমাবেশে ছোট্ট কিছু ছেলেমেয়ের আনাগোনা দেখি। ওদের হাতে থাকে ক্যান্ডি কিংবা ফুল। আমাদের দিকে ছোট্ট একটা হাসিখুশি মেয়ে এগিয়ে এলো। সামনে মেলে ধরলো কয়েকটা ক্যান্ডি। মেয়েটার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেলাম। কী চমৎকার ফুটফুটে একটা মেয়ে! শরীরে আর পোশাকে দারিদ্র্যের সহস্র চিহ্ন ছাপিয়ে ওর মিষ্টি হাসিটা প্রথমে আমাকে আনন্দিত করলেও মুহূর্তেই মনটা বিষণ্ণ হয়ে গেলো। দশ বারো বছরের এই মেয়েটি কোনো ধনাঢ্য পরিবারে জন্মালে ওর রূপের বিভায় আলোকিত হয়ে উঠতো চারপাশ। মেয়েটার চুলে শ্যাম্পু আর কন্ডিশনারের পরিচর্যা থাকলে, মুখে ক্রিম আর ফেসওয়াসের প্রলেপ থাকলে, ঠোঁটে লিপস্টিকের সামান্য স্পর্শ থাকলে, পরনে ঝলমলে একটা ফ্রক থাকলে এই মেয়েটাকে পরীর দেশের রাজকন্যা বলেই মনে হতো। পায়ে পায়ে কী মনে করে মেয়েটা আমার কাছেই এগিয়ে এলো। মিষ্টি হাসিতে উদ্ভাসিত মেয়েটার আকুতি—স্যার কয়ডা চকলেট ন্যান।

–চকলেট দিয়া কী করুম?

- Advertisement -

–ক্যান স্যার খাইবেন!

–আমি চকলেট খাই না। আমার ডাইবেটিস।

আমার ডায়বেটিসের তথ্যে একটুও হতাশ না হয়ে মেয়েটা বললো—তাইলে স্যার অইন্য কেউরে দিবেন।

–আমার কেউ নাই রে দেওয়ার মতোন।

এবার সত্যি সত্যি হতাশা ঝরে পড়ে মেয়েটার কণ্ঠে–তাইলে আমি ট্যাকা পামু কই? আপনেরা চকলেট না নিলে আমগোরে ট্যাকা দিবো কেডা?

এতো মায়া লাগলো মেয়েটার জন্যে! ওর দিকে দশ টাকার একটা নোট বাড়িয়ে দিলাম—নে ট্যাকা নে।

আমাকে অবাক করে দিয়ে মেয়েটা বললো—আপনে চকলেট না নিলে আমি আপনের ট্যাকা নিমু না।

বুকটা ধক করে উঠলো। বলে কী মেয়েটা! ওর আত্মসম্মানবোধ আমাকে মুগ্ধ করলো। আমি খুব দ্রুত ওর হাত থেকে দুটো ক্যান্ডি তুলে নিলাম। একটার গ্লোসি আবরণ ছাড়িয়ে মুখে পুড়লাম। তাই দেখে মেয়েটা লাখ টাকা দামের একটা হাসি উপহার দিলো। ওরা থ্যাংক্স বা ধন্যবাদ দিতে জানে না। কিন্তু ওর চোখে মুখে আনন্দের যে ঝিলিক দেখা গেলো সেটার অনুবাদ ধন্যবাদই।

–নাম কী রে তোর? মেয়েটা বললো—হ্যাপি।

বিকেলে বাংলা একাডেমির বইমেলা সরাসরি সম্প্রচার সেরে সন্ধ্যার পর আবার ফিরে এলাম কবিতা উৎসবে। আমার চোখ মেয়েটাকে খোঁজে। কিন্তু পায় না।

পরদিন সকালে আবারো টিএসসি। আবারো সেই একই জায়গায় আমাদের চা-আড্ডা বসে। হঠাৎ দেখি আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে মেয়েটা।–কী রে হ্যাপি খবর কি তোর?

–স্যার আপ্নে আমার নাম মনে রাখছেন!

–হ রাখছি তো। তুই হ্যাপি না?

–হ স্যার আমি হ্যাপি।

–দে কয়টা চকোলেট দে।

মেয়েটা ওর ক্যান্ডির প্যাকেটটা আমার সামনে মেলে ধরে। আমি মুঠোর মধ্যে পাঁচ-ছ’টা ক্যান্ডি তুলে নিই। তারপর মানিব্যাগ খুলে ওর হাতে গুঁজে দিই কয়েকটা খুচরো টাকার নোট। খুব বেশি হলে চল্লিশ-পঞ্চাশ টাকার মতো হবে। টাকাগুলো নিতে ওর আত্মসম্মানে একটুও লাগলো না। কারণ আমি কিছু চকোলেটের বিনিময়ে ওকে টাকাগুলো দিচ্ছি। কবিতা উৎসব দুদিনের। সুতরাং আজকেই ওর সঙ্গে আমার শেষ দেখা।

যথারীতি মেয়েটাকে আমি ভুলে গেলাম। ব্যস্ত হয়ে পড়লাম বইমেলা নিয়ে। প্রতিদিন লাইভ সম্প্রচারের হ্যাপা অনেক। নতুন বই আর বিস্তর মানুষের ভিড়ের মধ্যে আমার বিকেল আর সন্ধ্যেগুলো বর্ণিল হয়ে উঠলো। এক পড়ন্ত বিকেলে, তখন সন্ধ্যা হয় হয়, মাত্র লাইভ সম্প্রচার শেষ হয়েছে। কিছু অটোগ্রাফ আর কিছু ফটোসেশন পর্ব চলতে থাকে এই সময়টায়। ক্লাশের পাঠ্য বইতে আমার কবিতা পড়া বিস্মিত বাচ্চগুলোকে নিয়ে আসে ওদের বাবা মায়েরা। বিস্মিত বাচ্চাগুলোর সঙ্গে হাসিমুখে ছবি তুলি। একজন প্রভাষক তরুণী তাঁর সদ্য প্রকাশিত একটা বই আমার দিকে বাড়িয়ে দিলো—‘রিটন ভাই আমার এই বইটা আমি আপনাকে দিতে চাই।’ নিশ্চয়ই বলে হাত বাড়িয়ে বইটা নিই। তারপর প্রচ্ছদ উলটে সদ্য প্রকাশিত বইয়ের ঘ্রাণ নিতে থাকি। এমন সময় সেই তরুণীর পাশে থাকা মলিন পোশাকের ছোট্ট একটা মেয়ে দুতিনটে লাল গোলাপ বাড়িয়ে দিলো আমার দিকে—আমার তো বই নাই আমি স্যার আপ্নেরে এই ফুল কয়ডা দিতে চাই…

বইয়ের পাতা থেকে মুখ তুলে দেখি আমার দিকে ফুল বাড়িয়ে দেয়া মেয়েটা হাসছে—আরে হ্যাপি তুই!

–হ স্যার আপ্নেরে কতো খুঁজছি! শ্যাষে পাইলাম।

তরুণী প্রভাষক শাহীনা মিতা হ্যাপির কাণ্ড দেখে হতবাক হয়ে গেলো—আরে মেয়ে তুমি এটা কী করলে! তোমার বই নেই বলে তুমি তো বইয়ের চাইতেও ভালো কিছু দিলে রিটন ভাইকে! বলতে বলতে মলিন ফ্রক পরা মেয়েটাকে আদর করে একটু জড়িয়ে ধরে থাকলো কিছুক্ষণ।

সেদিন আমি পাঞ্জাবির সঙ্গে গাঢ় মেরুন রঙের একটা কটি পরেছিলাম। কটির বুক পকেটে হ্যাপির দেয়া লাল একটা গোলাপ গেঁথে রাখলাম। সেই সন্ধ্যায় আমার সঙ্গে যারাই ছবি তুলেছে, ওই ফুলটাও সঙ্গে ছিলো। কয়েকটা টিভি চ্যানেলের কিশোরী উপস্থাপক আমার সাক্ষাৎকার বা বাইট নিলো। ক্যামেরায় আমার সঙ্গে সেই লাল গোলাপও রেকর্ডেড হলো এবং প্রচারিতও হলো রাতের সংবাদে। হ্যাপিকে বললাম—তুই আমাকে ফুল দিয়েছিস। আমি তোকে কোনো টাকা দেবো না। দেখলি না বই দেয়া ম্যাডামকেও আমি কোনো টাকা দেইনাই বইয়ের বিনিময়ে। খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে হ্যাপি বললো—আমি আপ্নের কাছে ট্যাকা চাইছি!

কাল আসিস বলে আমি ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।

পরদিন মেয়েটা এলো। আমার অনুষ্ঠান শেষ হতেই ভিড় ঠেলে আমার সামনে এসে দাঁড়ালো। তারপর মুঠো থেকে একটা টুকরো কাগজ বের করে মেলে ধরলো আমার দিকে। টুকরো কাগজটায় আমার ছোট্ট একটা রঙিন ছবি আঠা দিয়ে লাগিয়ে রেখেছে। ছবিটা নিয়েছে সে কোনো একটা পত্রিকা থেকে। আমার ছবির পাশেই মাযহারের আরেকটা ছবি। একই কায়দায় আঠা লাগানো। জিজ্ঞেস করলাম—আমারটা না হয় বুঝলাম কিন্তু লগেরটা কে রে?

মেয়েটা হাসতে হাসতে বললো—আপ্নের বন্ধু। অইযে বলে মাযহারকে ইঙ্গিত করলো। হ্যাপি মেয়েটার কাণ্ড মাযহারকে দেখালাম। মাযহারের মতো গুরুগম্ভীর প্রাবন্ধিকও বিস্মিত হতে বাধ্য হলো।

পরের দিনও হ্যাপি এলো একটা ক্যান্ডির প্যাকেট হাতে। আমি বসেছিলাম বাংলা একাডেমির তথ্য কেন্দ্রের গোলচক্কর সিঁড়িতে। মেয়েটা খুব কাছে এসে খানিকটা হাসি বিনিময় করে সিঁড়িতে বসে থাকা আমার সঙ্গীসাথীদের হাতে হাতে একটা করে ক্যান্ডি ধরিয়ে দিলো। সাত আটজনকে ক্যান্ডি বিলি করে মেয়েটা আমার সামনে ঘুরঘুর করছে। আমি কপট ধমক দিলাম—তুই যে ওদের সবাইকে চকোলেট দিলি আমি কিন্তু এইগুলার দাম দিমু না।

মেয়েটা হেসে ওঠে—হিহিহি দিয়েন্না।

মেয়েটার জন্যে আমার বাজেট বরাদ্দ হয় একশো টাকা প্রতিদিন। আমার ডায়বেটিস শুনে আমাকে আর ক্যান্ডি খাওয়াতে চায় না মেয়েটা। কিন্তু ওর প্রাপ্য একশো টাকা ঠিকই নেয়। পরিস্থিতি এমন দাঁড়ালো যে—আমার কাছ থেকে প্রতিদিন একশো টাকা পাওয়াটা ওর একটা অধিকার হিশেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলো। বিনা বাক্যব্যয়ে এই টাকাটা সে গ্রহণ করে।

এক বিকেলে হ্যাপি এসে বসলো তথ্য কেন্দ্রের সিঁড়িতে আমার একেবারে পাশ ঘেঁষে। আমি বললাম—আজ তোকে কোনো টাকা দিতে পারবো না রে। আজ আমার কাছে কোনো টাকাই নাই। পারলে তুই আমাকে কিছু দিয়ে যা। কতো আছে তোর কাছে?

মেয়েটা বললো—আমার কাছে স্যার দুইশ ট্যাকা আছে। এই লন বলে মুঠোয় ভরা ওর সম্বল দুমড়ানো মোচড়ানো টাকাগুলো আমার দিকে বাড়িয়ে দিলো। আমি বললাম এতো টাকা লাগবে না। দশটা টাকা দে। তাতেই চলবে। পাঁচ টাকার দুটো পরিচ্ছন্ন নোট আমাকে দিলো মেয়েটা। আমি সেই টাকা থেকে পাঁচটা টাকা ওকে দিলাম—নে, এই টাকাটা রাখ। তুই তাহলে বলতে পারবি না যে আজ আমি তোকে একটা টাকাও দেইনাই! মেয়েটা হাসে—হিহিহি।

২৮ ফেব্রুয়ারি বইমেলার শেষ দিনেও মেয়েটা এসেছিলো। অনেকক্ষণ আমার পেছন পেছন ঘুরঘুর করেছে। যথারীতি নিঃশঙ্কোচে আমার কাছ থেকে ওর পাওনা একশো টাকাও নিয়েছে সে হাসিমুখেই। ওকে আমি বুঝতেই দিইনি ওই সন্ধ্যাটাই ওর সঙ্গে আমার শেষ সন্ধ্যা। এরপর মেয়েটা আমাকে আর খুঁজে পাবে না। আমি নিশ্চিত ও আমাকে খুঁজবে টিএসসিতে। হয়তো খুঁজতে খুঁজতে চলে আসবে বাংলা একাডেমিতেও। কিন্তু কোথাও আমাকে খুঁজে পাবে না সে। খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়ে একসময় আমাকে ভুলে যাবে সে। হয়তো আমার ওপর খানিকটা অভিমানও করবে। কারণ আমি ওকে বলে আসিনি যে আমি কানাডা চলে আসবো ক’দিন বাদেই।

সেই সন্ধ্যায় ওর সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হবার আগে আগে ওর গালটা একটু ছুঁয়ে দিয়ে বলেছিলাম—যাই রে। ভালো থাকিস। মেয়েটা ওর দারিদ্র্যপীড়িত অথচ প্রাচুর্যমন্ডিত হাসিতে আমার স্নেহটুকু গ্রহণ করেছিলো–আইচ্ছা।

ভালো থাকিস বলে ওকে আশীর্বাদ করে এলেও আমি জানি ভালো থাকা ওর পক্ষে সম্ভব হবে না। হ্যাপি নামের মেয়েটাকে ভালো থাকতে দেবে না আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা। কে জানে একটা সুস্থ স্বাভাবিক জীবনও হয়তো পাবে না ফুটফুটে এই মেয়েটা। রূপই হয়তো কাল হবে রূপবতী দরিদ্র্য এই মেয়েটার জন্যে। এতো রূপ নিয়ে কেনো সে জন্মেছিলো একটা হতদরিদ্র পরিবারে? চারপাশে ওঁত পেতে থাকা পুরুষের লোভাতুর থাবা থেকে কী করে বাঁচবে সে! তবুও আশীর্বাদ করি—হ্যাপি তুই ভালো থাকিস।

 

অটোয়া, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent