
বেশ কিছুদিন আগে মন্ট্রিয়েলে এসেছিল সঙ্গীতশিল্পী মিলা ও মিনার। এক ছুটির সকালে কফির জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছি টিমহর্টনে। এমন সময় পরিচিত এক ছোটভাই পিছন হতে বললো, ভাই মিনারের গান শুনেছেন?
-কেন?
ওর ” কারণে অকারণে ” না শুনে থাকলে জীবন বৃথা। বিকেলে প্রোগ্রামে চলেন।
কথার ধরণ বলার ভঙ্গিতে হেসে দিয়ে বলি, আমি তো কোন প্রোগ্রামে যাই না। আপনি উপভোগ করে আসেন। আর আপনি কি জানেন এই গানের গীতিকার কে?
না ভাই।
– ইশতিয়াক আহমেদ, আমাদের নারায়ণগঞ্জের গর্ব। মিনারকে সামনে পেলে আমার কথা বলবেন,আমি চ্যানেল ওয়ানে তাঁর গানের ভিডিও করেছিলাম।
২.
সম্ভবতঃ দুই হাজার তের সালের ঘটনা।
কোন এক শুক্রবার।
ছুটির দিনগুলোতে সন্ধ্যায় আমি নারায়ণগঞ্জে কাটাতাম। প্রায় ছুটির রাতে বাপীদা’র বাসায় আড্ডায় যেতাম। দীর্ঘ খোশগল্পের সাথে মুখরোচক খাবার ও সোমরস ছিল অবধারিত।
সেদিন বাপীদা আমাকে হঠাৎ বললেন, ভাই, অনেক গানই শুনে থাকেন। এখন বলবো মন দিয়ে এই গানটি শুনেন।
বাপীদার ল্যাপটপে গান বাজছে।
” অবিকল সেই মেঘ ভুল দরোজায়
তোমার সে হাত ছোঁয়ায়
চেনা জলকনা
তবুও এই বৃষ্টি আমাদের নয়
তুমি নিয়ে চলে গেছ ভেজার সময়
ও গৃহবন্দী মন রোদের জামিন
তোমার আমার এক বরষার ঋন…”
আমি তন্ময় হয়ে গানের কথাগুলো বারবার শুনতে থাকি।
একটা সময় গানটি শোনার পর মনে হয়েছে লিরিকের সাথে বেশি মুগ্ধতা এনেছে লুৎফর হাসান ও পুতুলের গায়কিতেই।
বাপীদা আমার মুগ্ধতা দেখে জানতে চাইলেন, কে লিখেছে জানেন?
– না, কিন্ত কন্ঠ দু’টো চেনা। লুৎফরভাই ও পুতুল।
এই গানের গীতিকার ইশতিয়াক আহমেদ।
– আমাদের ইশতিয়াক!
হ্যাঁ ভাই।
৩.
আমি ইশতিয়াক আহমেদকে জানি প্রথমে ছড়াকার। পরে দৈনিক যুগান্তরের ফান ম্যাগাজিন বিচ্ছুর নিয়মিত লেখক ( পরবর্তীতে সম্পাদক) হিসেবে। এরপর তাঁর সম্পাদিত গল্প সংকলন “ইশতিয়াক আহমেদ এবং তাঁর ভাইব্রাদারদের গল্প” বইটি পড়া শেষে খুঁজে পাই শক্তিশালী একজন কথাকারকে।
আমার ধারণা, লেখালেখিতে ইশতিয়াক অলস প্রকৃতির। সারাবছর সে টুকটাক নানান ধরনের লেখা লিখে কিন্ত বই প্রকাশের জন্য যে লেখাটি লিখতে হবে, দেখা যায় নভেম্বর বা ডিসেম্বরে সে লিখতে বসেছে। আর বই প্রকাশে বড্ড কৃপন। অন্যরা যেখানে বইমেলাকে কেন্দ্র করে ২/৪ টি বই লিখেন, সেখানে বছরে একটি বই প্রকাশ করবে এটাই যেন তাঁর পণ।
ইশতিয়াক আহমেদ আমাদের কথাসাহিত্যে শক্ত অবস্থান করে নিয়েছে। ২০০৯ সালে হোটেল বনলতা (আবাসিক) প্রকাশের পর পাঠকের দৃষ্টি কেড়ে নেয়। এরপর তাকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তাঁর পাঠক জনপ্রিয়তা কি রকম, সেটা টের পাওয়া যায় বইমেলায়। বইয়ের কাটতি শুধু নয়, তাঁর প্রকাশিত বইটি মেলাতেই দ্বিতীয়, তৃতীয় মুদ্রন নিমিষেই শেষ হয়ে যায়।
ইশতিয়াকের প্রথম প্রকাশিত বই হতে শুরু করে ২০১৭ পর্যন্ত যতো বই প্রকাশিত হয়েছে এর সবক’টি আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহে আছে। দেশ ছেড়ে আসার পর লোক মারফত ‘সাদা প্রাইভেট ‘ সংগ্রহ করে কানাডায় আনিয়েছি। বইটি পড়ে আমার মনে হয়েছে ইশতিয়াক তাঁর গল্পের বুনন ও পাঠককে শেষ পর্যন্ত টেনে নেয়ার ঈর্ষনীয় ক্ষমতাবান।
তাঁর লেখা গল্প, উপন্যাস, ছড়া এবং সম্পাদিত গল্পগ্রন্থ, কবিতার বই নেহাত কম নয়। নেইলকাটার,মাফলার,শিল্পী স্টুডিও, নন্দিতা পরিবহন, ডেথসার্টিফিকেট আপেলশাস্ত্র, আদর্শলিপি, সিনেমা হলের গলি, ৫০ গল্প (গল্প সংকলন), আজহার ট্রেনিং কার,সুটকেস বইগুলো ভীষন পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে৷
৪.
ইশতিয়াকের গানের ভুবন নিয়ে লেখাটি শুরু করেছিলাম। ইতোমধ্যে গীতিকার হিসেবে সে দেশের অন্যতম সেরা গীতিকারের স্থানে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বাংলাদেশের গন্ডি ছাড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গে ওর লেখা গানের কথায় অনেক প্রতিষ্ঠিত শিল্পী কন্ঠ দিয়েছেন। বিখ্যাত রেকর্ড প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান টি-সিরিজ হতে তাঁর লেখা গান নিয়ে সিডি বের হয়েছে।
ইশতিয়াক আহমেদের লেখা একটি গানে কণ্ঠ দিয়েছেন ১৮ জন শিল্পী। আর গানটির ভিডিও শুটিং হয়েছে বাংলাদেশ- যুক্তরাষ্ট্রসহ ১১টি দেশের নানামাত্রিক লোকেশনে! অর্ধশত মডেলের অংশগ্রহণে নির্মিত এই থিম সংটির নির্মাতা ছিলেন আরেক গুনীশিল্পী, সাংবাদিক, লেখক তানভীর তারেক।
সিনেমার জন্য ইশতিয়াক বেশ কিছু গান লিখেছেন। মোস্তফা সরয়ার ফারুকী নির্মিত ‘সামথিং লাইক অ্যান অটোবায়োগ্রাফি’র টাইটেল গানটি ইশতিয়াকের লেখা।
যে গানে দীর্ঘদিন পর কণ্ঠ দিয়েছিলেন অভিনয়শিল্পী তিশা।
বছর দুয়েক আগে বিদেশ নাটক দেখতে বসে ইশতিয়াকের লেখা গানটি হৃদয় ছুঁয়ে গিয়েছিল। নাটকটি নির্মান করেছিলেন ব্যাচেলরখ্যাত নির্মাতা অমি।
গত বছর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বছরব্যাপী চলা ‘তারুণ্যের উৎসব’-এর থিম সং টি লিখেছেন ইশতিয়াক আহমেদ ।
ইশতিয়াক আহমেদ এখন কথাসাহিত্যিক হিসেবে শুধু পরিচিত নয়। একজন গীতিকার হিসেবে সমাধিক পরিচিত। তাঁর লেখা “কারণে অকারণে, ভালোবাসা অকারণ,কী লাভ বলো, তোর সাথে নামলাম রে পথে, একলা আগন্তুক,মেঘে ভাসা দিন” গানগুলো বিভিন্ন জনপ্রিয় শিল্পীর কণ্ঠে শোনা যায়।
৫.
পেশাগত জীবনে ইশতিয়াক আহমেদ পুরোদস্তুর সাংবাদিক। গনমাধ্যমের মানুষ। দীর্ঘদিন যাবত দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রে কাজ করছেন। একসময় একটি দৈনিকের জনপ্রিয় ফান ম্যাগাজিন বিচ্ছু’র সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেছেন।
সাম্প্রতিক সময় নাটক লেখা ও পরিচালনা , বিজ্ঞাপন নির্মাণে ব্যস্ততার মাঝে ইশতিয়াকের সময় কাটে। তাঁর পরিচালিত অনেক নাটক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। মোল্লা সল্টের বিজ্ঞাপনগুলোতো সুপার হিট।
মাঝেমাঝে ভাবি, একটা মানুষ এতো কিছু করে কি করে?
৬.
ইশতিয়াক খেলা পাগল মানুষ। সে আর্জেন্টিনার ভক্ত। লিওনেল মেসি তাঁর প্রিয় শুধু নয়, ধ্যান জ্ঞান। ইউরোপীয়ান ক্লাব বার্সেলোনা তাঁর প্রিয় দল। ইশতিয়াকের সাথে খেলার এই জায়গায় আমার ঘোর অমিল।
এই ব্যস্ত মানুষটি খুবই দায়িত্বশীল এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষায় বদ্ধপরিকর। খুবই পরিবার কেন্দ্রিক মানুষ ইশতিয়াক। পরিবার,সন্তানের প্রতি ওর ভালবাসা, দায়িত্বশীলতা মুগ্ধ জাগানিয়া।
৭
ইশতিয়াকের বাসায় একবার কথাসাহিত্যিক, অভিনেতা আহসান কবীরভাইসহ দুপুরে প্রচুর খাওয়া দাওয়া করেছিলাম। খাবার টেবিলের আয়োজন দেখে বুঝতে পারি ওর মা,বাবা খুবই অতিথিপরায়ণ। এতো বেশী খাওয়া দাওয়া করেছিলাম যে, আমাদের কারোই চেয়ার ছেড়ে নড়াচড়ার উপায় ছিল না।
নারায়ণগঞ্জ হতে ঢাকা যাওয়ার পথে প্রায় সময় ইশতিয়াকের সাথে দেখা হত। কথা যে খুব একটা হত, তা কিন্ত নয়। মনে হয়, চুপচাপ থাকতে বেশি পছন্দ করে। গুলিস্থান বা মতিঝিল নেমে আমরা একই সিএনজিতে অফিস যেতাম। ইশতিয়াক আমাকে কারওয়ান বাজার ড্রপ করে তেজগাঁও ওর অফিসে চলে যেত। কখনো সন্ধ্যায় কারওয়ান বাজার এলে চাম্পুগলিতে দাঁড়িয়ে কিছু সময় লেখালেখি, মিডিয়ার কিছু বিষয় নিয়ে কথা হত।
একবার দুপুরে হঠাৎ ইশতিয়াকের ফোন।
ভাই, নীচে নামেন। ইকবাল আর আমি দাঁড়িয়ে আছি।
অফিস হতে নীচে নামতেই দেখি ইশতিয়াকের সাথে কথাসাহিত্যিক ও জনপ্রিয় উপস্থাপক ইকবাল খন্দকার।
ওরা দু’জন ধরে নিয়ে গেল রাস্তার ওপাশের কুপার্স রেস্টুরেন্টে। দু’জনে মিলে আমাকে ভরপেট লাঞ্চ করিয়ে তারপর ছেড়েছিল। উপলক্ষ্য একটা ছিল, আমার বেশ লম্বা সময়ের জন্য জার্মান ও ফ্রান্সে যাওয়া।
অদ্ভুত একটা বিষয় হচ্ছে, আমরা দু’জন একই শহরের মানুষ ছিলাম। চলাফেরার গন্ডি, দৌড় সবই একই বৃত্তের মধ্যে ছিল। কিন্ত আমাদের নারায়ণগঞ্জে দেখা হওয়া বা গল্প করার তেমন সুযোগ হয়নি। যা কিছু হয়েছে সবই রাজধানী ঢাকায়। নারায়ণগঞ্জকে ও ভীষন ভালবাসে বলে সারাদিন ঢাকায় কাজ শেষ করে আবার ফিরে আসে নিজগৃহে। আমিও ছিলাম ওর মতন।
ক’দিন আগে ফেসবুকে ইশতিয়াক ব্ল্যাক টি-শার্ট পড়া একটি ছবি পোস্ট করে। যার বুকে ছবির ওপর লেখা নারায়ণগঞ্জ। পোস্টটি দেখে নস্টালজিয়ায় ভুগতে থাকি।
আহা আমার নারায়ণগঞ্জ!
পোস্টের কিছুক্ষন পরেই ইশতিয়াককে মেসেঞ্জারে নক করে জানতে চাই,টি-শার্টটি কোথায় পাওয়া যাবে?
ও বুঝতে পারে আমি টি-শার্টটি চাইছি।
বললো,আপনি বাসার ঠিকানা দেন। দু’চারদিন পর পেয়ে যাবেন।
শনিবার আমার নারায়ণগঞ্জের বাসায় লোক মারফত টি-শার্ট পাঠিয়ে দেয়। আমার মা বেশ ক’দিন যাবত অসুস্থ।তিনি জানেন না তাঁর ছেলের জন্য টি-শার্ট কে পাঠিয়েছেন। সকালে ফোনে যখন মায়ের সাথে কথা বলছি, তখন বললেন, তোমার জন্য কে যেন টি-শার্ট পাঠিয়েছে। আমি ছবি পাঠাচ্ছি।
আম্মা ছবি পাঠালেন।
যখন জানলেন ইশতিয়াক আহমেদ এর নাম। তিনি বললেন, এর বই তো আমার পড়া।
হ্যাঁ।
আম্মা আমার ছোট্ট লাইব্রেরির প্রায় সব বই পড়েছেন। আমার সংগ্রহে থাকা ইশতিয়াকের বেশ ক’টা বই আম্মার পড়া। আম্মা খুব খুশি তাঁর ছেলেকে একজন লেখক টি-শার্ট পাঠিয়েছেন।
অনেক ভালবাসা ইশতিয়াক।
মন্ট্রিয়ল, কানাডা
