একটা টাকা দিয়া যান আমি গরিব ইনসান

গান খুব পছন্দ নদীর ওর পিচ্চিকাল থেকেই ভিসিআরের কল্যাণে হিন্দি সিনেমার গান এবং বিটিভির ছায়াছন্দের কল্যাণে বাংলাদেশের বহু সিনেমার গান নদীর পছন্দ এবং মুখস্ত ছিলো

গান খুব পছন্দ নদীর, ওর পিচ্চিকাল থেকেই। ভিসিআরের কল্যাণে হিন্দি সিনেমার গান এবং বিটিভির ছায়াছন্দের কল্যাণে বাংলাদেশের বহু সিনেমার গান নদীর পছন্দ এবং মুখস্ত ছিলো। গাইতেও পারতো যথার্থ সুরে। গানের কণ্ঠ ওর বরাবরই শ্রুতিমধুর। বিশেষ করে বাবা বিষয়ক গানগুলো ওর খুবই পছন্দের ছিলো তখন। যখন কথা বলতেই শেখেনি ঠিকমতো, তখনই এইটুকুন পিচ্চি মেয়েটা বিটিভির অডিটোরিয়াম ভর্তি দর্শকদের সামনে দাঁড়িয়ে ছোটদের ঈদের অনুষ্ঠানে গেয়েছিলো ‘জন্ম থেকে জ্বলছি’ সিনেমায় শামীমা ইয়াসমিন দীবার গাওয়া বিখ্যাত গান—‘বাবা বলে গেলো আর কোনোদিন গান করো না/কেনো বলে গেলো সেই কথাটি বলে গেলো না/গান যদি পৃথিবীতে না-ই থাকতো, সারেগামা পাধানিসা কী করে হতো?’

১৯৮৭ সালে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিলো। ভণ্ড এরশাদ তখন একটা গান লিখেছিলো, গানটি গেয়েছিলেন এন্ড্রু কিশোর—তোমাদের পাশে এসে বিপদের সাথী হতে আজকের চেষ্টা আমার…বিটিভির পর্দায় প্রতিদিন কয়েকশ বার প্রচারিত হতো গানটি—এরশাদের নানান কর্মকাণ্ডের স্থিরচিত্রের সঙ্গে। তারমধ্যে কয়েকটা ছিলো হাঁটুসমান পানিতে দাঁড়িয়ে এরশাদ জনগণের দুর্দশার সাথী হচ্ছে! এই গানটি দেখে দেখে নদী এরশাদ সেজে অভিনয় করে দেখাতো আমাকে আর ওর মাকে। এই গানের নাম সে দিয়েছিলো ‘আজকের চেষ্টা’। এই গানটি গাইতে গাইতে নদী এমন ভঙ্গিতে স্লো মোশানে হাঁটতো যে মনে হতো হাঁটুসমান পানি ভেঙে ভেঙে তবেই সে এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। হতভাগ্য পথশিশু টোকাইদের নতুন নামকরণ করেছিলেন এরশাদ—পথকলি। পথকলিদের নিয়েও মায়াকান্নায় ভরা একটা গান লিখেছিলেন এরশাদ। সেই গানটাও নানানচিত্রখচিত হয়ে বারবার প্রচারিত হতো বিটিভিতে। সেই গানে ছেঁড়া লুঙ্গিজামাপরা ছোট্ট একটা বাচ্চাকে দেখানো হতো হাতুড়ি দিয়ে ইট ভাঙছে। আমার একটা পুরনো লুঙ্গি পরে নিজের মাথার চুলগুলোকে এলোমেলো করে একটা হাতুড়ি নিয়ে নদীও বসে যেতো ইট ভাঙার কাজে। আমাকে দেখিয়ে ইট ভাঙতে ভাঙতে বলতো—বাবা আমি পথোকোলি…।

- Advertisement -

একদিন আমার কর্মস্থল দৈনিক খবর অফিস থেকে প্রতিদিনের কাজ সেরে বাড়ি ফিরে দেখি আমাদের ওয়ারির একরুমের বাসায় হুলুস্থুল কাণ্ড চলছে। আমার লুঙ্গিটা পরে, গায়ে আমার পুরনো ছেঁড়া একটা স্যান্ডোগেঞ্জি চড়িয়ে, কোমরে গামছা বেঁধে, মুখে কালি-টালি মেখে ভিক্ষুক সেজেছে নদী। একটা কাঠের পিঁড়ির ওপর বসে আছে নদী। পিঁড়িটাকে ওড়না দিয়ে বেঁধে ওটা টেনে হিঁচড়ে সামনে নিয়ে যাচ্ছে শার্লি আর পিঁড়িতে বসা নদী একটা হাত ডানে বাঁয়ে বাড়িয়ে দিয়ে গান গাইছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম—কীরে নদী ঘটনা কী? নদী বললো—বাবা আমি গরিব ইনসান।

–মানে?

শার্লি জানালো—বিটিভির ছায়াছন্দ অনুষ্ঠানে একটা গান প্রচারিত হয়। গানটায় নায়িকা চম্পা আর এটিএম শামসুজ্জামান খান ভিক্ষুক সেজে গান গাইতে গাইতে টাকা রোজগার করে। গানের কথাটা হচ্ছে—একটা টাকা দিয়া যান আমি গরিব ইনসান। নদী আজ গরিব ইনসান সেজেছে। সিনেমার সেই গানে চম্পাকে এটিম আবার এটিএমকে চম্পা বেয়ারিং-এর চাকাঅলা একটা কাঠের গাড়িতে বসিয়ে ঠেলে ঠেলে নিয়ে যায় আর গান গায়—একটা টাকা দিয়া যান আমি গরিব ইনসান।

পরের দৃশ্য—শার্লি ওড়না টেনে টেনে পিঁড়িতে বসা নদীকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে আর নদী প্রাণপণে গান গাইছে—একটা টাকা দিয়া যান আমি গরিব ইনসান—বাবা জলদি টাকা দাও—একটা টাকা দিয়া যান আমি গরিব ইনসান…

আমি পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে নদীকে একটাকার একটা নোট দিলাম। নোটটা পেয়ে দ্বিগুণ উৎসাহে নদী গাইতে থাকলো—একটা টাকা দিয়া যান আমি গরিব ইনসান…

আজ ইউটিউবে খোঁজদ্যাসার্চ করে নদীর প্রিয় সেই গানটাকে খুঁজে পেলাম। শার্লি আর আমি গানটা দেখতে দেখতে ফিরে গেলাম আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে। আহারে! আমাদের ছোট্ট ঘরের ছোট্ট সেই নদীটা আজ কতো বড় হয়ে গেছে! ভোরের ফ্লাইটে একা একা আমেরিকা পর্যন্ত চলে যেতে পারে সে মায়ের সাহায্য ছাড়াই! ইমিগ্রেশন পার হতে এখন আর বাবার সাহায্যও লাগে না ওর! নদীহীন ঘরটা কী রকম নিঝুমপুরী নিঝুমপুরী মনে হচ্ছে। সকাল থেকে বাড়িটা বিষণ্নতায় কী রকম স্থবির হয়ে আছে!

 

অটোয়া, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent