জোসেফ জো এবং স্যালভাদর

জোসেফকে জো নামেই ডাকে সহকর্মী স্যালভাদর করুণ সুরে উত্তর দেয় জো

জোসেফকে জো নামেই ডাকে সহকর্মী স্যালভাদর। করুণ সুরে উত্তর দেয় জো। নো স্যাল, ক্রিসমাসের আগে আর যেতে পারছিনা। তেইশ তারিখ ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এখন মন্ট্রিয়ল হয়ে লিসবোয়া পৌঁছাতে ছাব্বিশ ডিসেম্বর সকাল হয়ে যাবে। সেখান থেকে এলভাস আরো দুঘন্টা। স্পেন বর্ডারের কাছাকাছি। যেতে যেতে দুপুর।

ড্রিলিং রিগের যান্ত্রিক শব্দে জো’র করুন সুর স্যালভাদরের কানে পৌঁছায় না। কেবল বুঝতে পারে ক্রিসমাস রাস্তায় বসে কাটাতে হবে ওকে । দুজনই পর্তুগাল থেকে টরন্টো এসেছে গেলো অক্টোবরে। কোভিড পরিস্থিতি একটু ভালো তখন। কানাডার লিডিং পাইলিং কোম্পানির সাথে দুমাসের চুক্তি।

- Advertisement -

স্যালভ্যাদর বিশেষ শ্রেণীর রিগ অপারেটর। ঘন্টায় আয় একশো ডলারের উপরে। জো মাঝারি সারির এক্সক্যাভেটর চালায়। স্যালের তুলনায় মজুরি অর্ধেক। নভেম্বরের শেষে কাজ ফুরোবার কথা। ডিসেম্বরে পাগলের মতো বারো ঘন্টার শিফট চালিয়েছে কোম্পানি। তবু ক্রিসমাসের আগে সাইট গোছাতে ক্রিসমাস ইভ রাত চলে আসে।

ক্রিসমাস ইভ রাতটা ঢাকার চাঁন রাতের কথা মনে করিয়ে দেয়। সেলুনগুলোয় চুল কাটার সে কী ধুম! সারারাত গাউছিয়া চাঁদনী চকে রমনীদের শাড়ির দরদাম। টেলিভিশনে ঈদের নানা আয়োজন।

পশ্চিমাদের চিত্রটা অবশ্য ভিন্ন। ক্রিসমাস ইভ রাতে ওঁরা ডাউনটাউন এলাকায় ভিড় জমায়। সবগুলো বার ঠাঁসা থাকে আমুদে মানুষের আড্ডায়। রাতভর সরগরম ফুর্তি। বাড়িগুলো ক্রিসমাস ট্রি’র আলোয় ঝলমল। বাচ্চারা শান্তা ক্লস আর রেন ডিয়ার উৎসবে মেতে ওঠে। করোনা নামের ন্যানো দানবের তান্ডবে এবার সব মাটি।

ড্রিলিং রিগের মনিটরে চোখ রেখে চিৎকার দেয় জো। স্যাল, তোমার ফ্লাইট কবে?

তেইশ তারিখ বিকাল চারটায়। ব্রাসেলস এয়ারলাইন্স। পিয়ারসন্স থেকে মন্ট্রিয়ল হয়ে ব্রাসেলস। সেখান থেকে লিসবোয়া। বাড়ি পৌঁছবো ক্রিসমাসের আগের রাতে।

তুমি অনেক ভাগ্যবান, স্যাল।

নাহ। ঠিক নয় জো। মেয়েদুটো অপেক্ষা করছে তিন সপ্তাহ হলো। ডিসেম্বরের শুরুতেই বাড়ি ফেরার কথা আমার।

পর্তুগীজ ভাষায় ওঁদের কথোপকথন শুনছিলাম। হুবহু এমন ছিলো কিনা নিশ্চিত নই। তবে এটা বুঝেছি দেশে ফেরার গল্প করছিলো স্যাল আর জো।

রিগ প্লাটফর্ম ছেড়ে ট্রেলারে ফিরে আসি। লাঞ্চ ব্রেক। ট্রেলারের লম্বা ডাইনিংএ সারি বেঁধে খেতে বসেছে সবাই। করোনা প্রটোকল অনুযায়ী ছ’সাত ফুট দূরে দূরে চেয়ার পাতা। দূরত্ত্বের কারণেই ওঁরা কথা বলছে উচ্চ স্বরে। প্রসঙ্গ একটাই। বাড়ি ফেরা। তবে এবার ইংরেজিতে। বুঝতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হয়নি। আলবার্টা থেকে আসা ব্রানডেন মজা করে জো’কে বলছিলো, পর্তুগাল যাবার দরকার কি? পুরোনো গার্লফ্রেন্ড ভুলে নতুন একটা জুটিয়ে নাও। টরন্টোতে কত মেয়েই তো একা?

প্রজেক্ট সুপারিনটেন্ডেন্ট আলেসান্দ্রো গম্ভীর মানুষ। ইতালিয়ান রক্ত শরীরে। তবে চার পুরুষ ধরে কানাডায় বসবাস। ওদের গল্প শুনে আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো। বললো, প্রতি বছর এসময়টায় কাজের চাপ এতো বেশি। লোকজন ক্রিসমাস অজুহাতে পালতে পারলে বাঁচে। আগামি একমাস এঁরা কাজে যোগ দেবে না।

কনসাল্টিং ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে গত ছয় বছরে আমার নিজ অভিজ্ঞতাও তাই বলে। অক্টোবরে এসে সব কন্ট্রাক্টর নাকানি চুবানি খেয়ে কাজ শুরু করে। ডিসেম্বরে পাগল হয়ে যায় ক্রিসমাসে সব গুছিয়ে নিতে। দূরের শ্রমিকেরা বাড়ি চলে গেলে সহজে ফিরে আসেনা। আপনজনের সান্নিধ্য ছেড়ে কারই বা ফিরতে ভালো লাগে।

কন্ট্রাক্টরের ট্রেলারে বসে শ্রমিকদের কথা শুনতে ভীষণ ভালো লাগছিলো। বারবার ফিরে যাচ্ছিলাম ঈদের চিরচেনা বাড়ি ফেরার দৃশ্যগুলোতে। আনন্দ বেদনার কাব্য এঁদের একসুরে গাঁথা। পার্থক্য কেবল জীবনমানে। ট্রেনে, বাসে বা লঞ্চের ভিড়ে ঠেলাঠেলি। দুর্ঘটনায় জীবন হারানো। কিন্তু পশ্চিমা শ্রমিকদের ভ্রমণ নিরাপত্তা দেশের বাকি নাগরিকদের সাথে বিন্দুমাত্র তফাৎ তৈরী করেনা। একজন তথাকথিত ভিআইপির নিরাপদ ভ্রমণের অধিকার যতোটুকু একজন নির্মাণ শ্রমিকের নিরাপদ ভ্রমনের অধিকার ঠিক ততটুকুই।

স্প্যানিশ ভাষার বিখ্যাত ক্রিসমাস সং, “ফেলিজ নেভিদাদ, ফেলিজ নেভিদাদ, প্রসপেরো এনো ই ফেলিসিদাদ” গাইতে গাইতে উৎসবে ওঁরা নিরাপদে বাড়ি ফেরে। “রমজানের ওই রোজার শেষে” গান গেয়ে নিরাপদে বাড়ির পৌঁছার নিশ্চয়তা আমাদের কতটুকু?

 

ব্রাম্পটন, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent