টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট জর্জ ক্যাম্পাসের সেই স্মৃতি

মনে হয় এইতো সেদিন ১৩ আগস্ট মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেলো প্রিয় মিশুক মুনীর ও তারেক মাসুদঅথচ এবার হলো ১৪টি বছর

মনে হয় এইতো সেদিন ১৩ আগস্ট মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেলো প্রিয় মিশুক মুনীর ও তারেক মাসুদ,অথচ এবার হলো ১৪টি বছর। অথচ আগের দিন সন্ধ্যায় তারা সবাই ভীষণ হাসিখুশি আড্ডায় কারওয়ান বাজার এটিএন নিউজ অফিসে ছিলো। আমি তখন প্রথম আলো থেকে বেরিয়ে ফুটপাথ ধরে ফার্মগেইটের দিকে হেঁটে যাচ্ছি। লা দাভেঞ্চি হোটেলের মুখে আসতেই দেখি উপর থেকে হন্তদন্ত হয়ে নেমে এলো প্রিয় কবীর হোসেন তাপস। জরুরী তাড়ায় নিজের গাড়ির দিকে ছুটছে। শুধু চিৎকার করে বল্লো- উপরে যান ইকবাল! তারেক এসেছেন মিশুক,মুন্নী সবাই আছে। সকালে নতুন ছবির লোকেশান দেখতে নাকি যাবে। উপরে এটিএন নিউজ অফিসে ঢুকতেই  মিশুকের কাচা পাকা ঝুলন্ত গোফের নিচে মার্কা মারা ভূবন ভাসানো হাসি আর দুই হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরা। নিজের হাতে বানানো লালচা হাতে তুলে দেয়ার পর জানালো চাইলে আগামী সকালে সঙ্গে যেতে পারি দুইজনেরই অনুরোধ। পরদিন অঝোর বৃষ্টি গোটাদিন। বন্ধু অরুণ চৌধুরীও বলে ছিলো সিলেট যাচ্ছে কি যেন ডকোমেন্টারী ফিল্ম সুট করতে। চেয়ে  সাথে যাই। আমি না করেছি। মিশুক তারেককেও না বল্লাম। তখন থাকি আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু দেশের স্বনামধন্য শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হানিফ ও লোপাদের ধানমুন্ডি নয় নম্বর রাস্তার জার্মান কালচার সেন্টার লাগোয়া এপার্মেন্টর গেস্ট রুমে। রয়েল পাবলিশার্স প্রকাশিতব্য নিজের নির্বাচিত গল্প বইয়ের প্রচ্ছদ ডিজাইন করবো আর সিলভিয়া নাজনীন আসবেন প্রথম আলোর জন্যে একটি ইন্টারভিউ নিতে।তাই যাওয়ার চেয়ে থাকাই ভালো। বৃষ্টিদিনে বাসা থেকে এইসব কাজ সারবোবো। পরদিন সবই ঠিকঠাক দিনের প্রথম ভাগে হয়ে গেলো। হানিফ লোপাদের সঙ্গে মুরগীভুনার সাথে গরম খিচুড়ি খেয়ে কফি নিয়ে নিজের রুমে চলে এলাম। বালিশ টেনে বেডে আধশোয়া হয়ে ভাবছি। কি ভাবছি মনে নেই।কফি ঠান্ডা হয়ে গেছে। উঠে গরম করতে যাবো তখনি টরন্টো থেকে এসে সিলেটে বাড়ি যাওয়া দেলওয়ার এলাহীর ফোন এলো। ধরতেই হাঁউমাউ জোরে কান্না। ভাবলাম মা মারা গেছেন বোধহয়। এসব ব্যাপারে সান্তনা দিতে আমি কথা সংকটে পড়ি। কিছুটা সময় দেয়ার পর এলাহী আবার বল্লেন-ইকবাল ভাই মিশুক ভাই তারেক ভাই আর নাই। সন্ধ্যার দিকে আপনার কাছেই পান্থপথে স্কোয়ার হাসপাতালে তাদের লাশ আসছে! আমি হতভম্ব হয়ে শূণ্য অস্তিত্বে কতক্ষণ বসে ছিলাম খেয়াল নেই! শোধবোধ ফিরতে  কাপড় পরে ছুটলাম স্কোয়ার হাসপাতালে।

২. তারেক মাসুদ ও ক্যাথারিন শেষবারের মত টরন্টো এলো। নতুন সর্ট ফিল্ম ‘ নরসুন্দর’ আর তার সাথে মাটির ময়না ও দেখাবে। পোস্টার,ফ্লায়ার,আমন্ত্রণপত্র সব ডিজাইন করে ফাত্তার প্রাইম প্রিন্টিং থেকে ছাপিয়ে রেডি করে দিলাম। দেখানোর জন্যে ভালো হল পাওয়াতে মুস্কিল। আমি জানতাম লেখক চলচ্চিত্রকার নাঈমের দুই কন্যা টরন্টো ইউনিভার্সিটিতে শুধু পড়েই না বাংলাদেশ স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রধাণ । তারা আবেদন করলে নামমাত্র ভাড়ায় সেন্টজর্জ ক্যাম্পাসে আধুনিক প্রদর্শন যন্ত্রপাতি সহ হল পাওয়া গেলো। জমজমাট শো হয়ে গেলো। তারপর তারেক ক্যাথিদের ফিরে যাওয়ার দুইদিন আগে যথারীতি মিশুকের বাসা তার নিজহাতে রান্নায় জনাবিশেকের লাঞ্চ পার্টি। সেই পার্টিতে আমি আমার ছোট্ট ১২’’x১২’’ইঞ্চি একটি পেইন্টিং তাদের উপহার দিতে তারেক হেসে বলে ছিলো- এটি কি দিলেন ইকবাল ভাই! ঘরে টাঙ্গালে খুজে পাওয়া যাবেনা। আপনি দেশে ফিরলে একটি বড় পেইন্টিং দিয়েন। বলে ছিলাম অবশ্যই দেবো। সেই সুযোগ আর আমার হয়নি।

- Advertisement -

Read More

Recent