
কানাডার জাতীয় রাজনীতিতে একসময় বামপন্থী শক্তির সবচেয়ে জোরালো কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত ছিলেন নিউ ডেমোক্রেটিক পার্টি (এনডিপি) নেতা জাগমিত সিং। প্রগতিশীল রাজনীতির প্রতীক হিসেবে তরুণদের মাঝে তিনি তৈরি করেছিলেন বিশেষ এক জনপ্রিয়তা। কিন্তু ২০২৫ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর সেই উজ্জ্বল অধ্যায় যেন ধসে পড়েছে এক ঝটকায়।
সর্বশেষ নির্বাচনে এনডিপি পায় মাত্র ৬.৩ শতাংশ ভোট এবং সংসদে জয়ী হয় কেবল সাতটি আসনে। এটাই দলের ইতিহাসে সবচেয়ে খারাপ ফলাফল। আরও বড় আঘাত আসে সিংয়ের নিজের আসন বার্নবি সেন্ট্রাল থেকে পরাজয়ের মাধ্যমে। সেখানে তিনি তৃতীয় স্থানে থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা শেষ করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই হার তার ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার ও দলের অবস্থান দুটোই প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
এমন ভরাডুবির পর সিং আর দলের নেতৃত্বে থাকার ঘোষণা দেননি। ভোটের ফলাফল ঘোষণার পরপরই তিনি পদত্যাগ করেন। বর্তমানে ভ্যাঙ্কুভার কিংসওয়ে থেকে নির্বাচিত সাংসদ ডন ডেভিস অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্ব গ্রহণ করেছেন। মার্চ মাসে পূর্ণাঙ্গ নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কানাডার রাজনীতিতে লিবারেল ও কনজারভেটিভ দল দুই প্রান্তকে ঘিরে ভোটারদের সমর্থন ক্রমশ কেন্দ্রীভূত হয়েছে। ফলে এনডিপি তাদের ঐতিহ্যবাহী সমর্থনভিত্তি ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।
দলীয় সংগঠনের দুর্বলতার কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এনডিপি সংগঠন ও মাঠ পর্যায়ে দুর্বল হয়ে পড়ে। প্রচারাভিযানে অর্থ সংগ্রহে ব্যর্থতা বড় প্রভাব ফেলে। এবং তরুণ ভোটারদের একাংশ সিংয়ের প্রতি আস্থা রাখলেও, বৃহত্তর ভোটারগোষ্ঠীর কাছে তার নীতিগত অবস্থান তেমন সাড়া ফেলেনি।
২০১৭ সালে এনডিপির নেতৃত্ব গ্রহণের পর জাগমিত সিং ছিলেন এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। প্রথম পাগড়ি পরিহিত শিখ হিসেবে জাতীয় দলের নেতৃত্ব দেওয়া তাকে বৈশ্বিক পর্যায়েও আলাদা পরিচিতি এনে দেয়। মানবাধিকার ইস্যুতে সরব অবস্থান, প্রগতিশীল মূল্যবোধে দৃঢ়তা এবং তরুণদের মাঝে ক্যারিশম্যাটিক উপস্থিতি তাকে দ্রুত জনপ্রিয় করে তোলে।
কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতিশীল যাত্রা ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যায়। লিবারেল সরকারকে সমর্থন দিয়ে বিভিন্ন নীতিগত আপস, সংগঠনে ভাঙন এবং দীর্ঘমেয়াদে ভোটারদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করে। শেষ পর্যন্ত সেটিই নির্বাচনী ভরাডুবিতে রূপ নেয়।
প্রশ্ন এখন একটাই জাগমিত সিং কি আবার ফেডারেল রাজনীতিতে ফিরবেন? সম্ভাব্য পথ ১: তিনি প্রাদেশিক রাজনীতিতে নামতে পারেন, যেখানে শিখ ও দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত সম্প্রদায়ের সমর্থন তার জন্য সুবিধাজনক হতে পারে, সম্ভাব্য পথ ২: সামাজিক আন্দোলন, মানবাধিকার প্রচারণা বা সিভিল সোসাইটির কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে পারেন এবং সম্ভাব্য পথ ৩: সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে সরে গিয়ে নতুন পেশাগত বা সামাজিক ভূমিকায় আবির্ভূত হওয়া।
মাত্র সাতটি আসন নিয়ে সংসদে কার্যকর প্রভাব বিস্তার করা কার্যত অসম্ভব। দলকে পুনর্গঠন, নতুন নেতৃত্ব খোঁজা এবং জনআস্থা ফেরানোই এখন সবচেয়ে বড় কাজ। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জাগমিত সিংয়ের অভিজ্ঞতা ও উত্তরাধিকার থেকে শিক্ষা না নিলে এনডিপির পক্ষে পুনরায় শক্ত অবস্থানে ফেরা কঠিন হবে।
কানাডার বামঘরানার রাজনীতিতে জাগমিত সিং একসময় ছিলেন আশার আলো। কিন্তু ২০২৫ সালের নির্বাচনের ফলাফল তাকে রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে সরে যেতে বাধ্য করেছে। এনডিপি এখন নতুন নেতৃত্ব ও নতুন কৌশলের সন্ধানে। আর জাগমিত সিংয়ের ভবিষ্যৎ, অন্তত এখনই, অনিশ্চয়তার ঘোরে আচ্ছন্ন।
This article was written by Rezaul Haque as part of the LJI
