
আমার জন্মের সাত বছর আগে, ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ নামে একটা সিনেমা মুক্তি পেয়েছিলো ঊনিশ শ তেপান্ন সালে। এই সিনেমার একটা গান আমার ভীষণ প্রিয়। গানের প্রথম কলি–আমার এ যৌবন চম্পা চামেলি বনে অকারণ উচ্ছ্বল দিন গো…। প্রায়ই শুনি গানটা। শুনি মানে দেখিও। কারণ বাংলা সিনেমার সোনালি যুগের এই গানটা শুধু শোনার নয়। একই সঙ্গে দেখারও। কেনো না এই গানে কণ্ঠ দিয়েছিলেন পাঁচ পাঁচজন (মতান্তরে ছয়জন) কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী। শিল্পীরা হচ্ছেন–ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় ও সনৎ সিংহ। এই পাঁচজন সমসাময়িক বিখ্যাত গায়ক এই ছবিতে একটি গানে কেবল কণ্ঠই দেননি সঙ্গে অভিনয়ও করেছেন। বড় মজার সেই গান। বড় স্নিগ্ধ সেই গান। মস্তিষ্কে দোলা জাগানিয়া বড় রিদমিক সেই গান।
মজার সেই গানের চিত্রায়ণে বিখ্যাত এই কণ্ঠশিল্পীদের সমবেত উদ্বাহু নৃত্য, নায়কোচিত ভঙ্গিতে শ্যামল মিত্রের হেঁটে যাওয়া, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের চোখের মুখের দুর্দান্ত সব এক্সপ্রেশন্সসহ চৌকি থেকে আরেকজন শিল্পীর নাচের মুদ্রাযোগে নেমে এসে স্থির হয়ে যাওয়ার দৃসমূহ আমাকে মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন করে রাখে। আর তাই বারবার গানটা শুনি আর দেখি। মন ভালো করে দেয়া জাদুকরী এই গানের গীতিকার শৈলেন রায়। সঙ্গীত পরিচালক কালীপদ সেন। কী অসাধারণ লিরিকস আর কী অসাধারণ সুর ও মিউজিক কম্পোজিশন! বারবার শুনে শুনে শৈলেনের লেখা গানের কথাগুলো আমার মুখস্ত, ইন্টারল্যুড মিউজিকসহ। গানের কথাগুলো স্মৃতি থেকে উদ্ধার করি–
‘আমার এ যৌবন চম্পা চামেলি বনে অকারণ উচ্ছল দিন গো…
আঁচল দোলায়ে হায়
কে গো আসে কে গো যায়,
সুরে সুরে বেজে ওঠে জীবনের বীণ গো…
আহাহা ওহোহোহো
কেবা সেই ললনা
ছন্দেরো ঝরোণা
ভালোবাসা যদি পাও ভালোবেসে মরোনা।
তার কালো চোখে হায়
আলো ছায়া খেলে যায়
সে দিয়ায় হতে চায় হিয়া যেনো লীন গো…
আমার এ যৌবন চম্পা চামেলি বনে অকারণ উচ্ছ্বল দিন গো…
বিদ্যুৎ বরণা সে ছন্দেরো ঝরো না
বিদ্যুৎ বরণা বিদ্যুৎ বরণা
কেবা সেই বিনোদিনী
রিনিকি ঝিনিকি ঝিনি
নূপুরের তালে বাজে কাঁকনের রিনিঝিনি
রিনিকি ঝিনিকি ঝিনি রিনিকি
রিনিকি ঝিনিকি রিনি ঝিনিকি
ভাবি বেলা অবেলায়
যে চাহনি ফেলে যায়
তারই জালে জড়ায়েছি আমি উদাসীন গো…
আমার এ যৌবন চম্পা চামেলি বনে অকারণ উচ্ছ্বল দিন গো’…
‘সাড়ে চুয়াত্তর’ নামের নির্মল হাস্যরসের সিনেমাটির পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার নির্মল দে। বিপুল ভাবে দর্শকনন্দিত এই ছবিতে অভিনয় করেছেন উত্তম কুমার সুচিত্রা সেন। কিন্তু ছবিটা উত্তম-সুচিত্রা জুটির কারণেই দর্শকনন্দিত হয়নি। সাড়ে চুয়াত্তরের টেলপে বা ক্রেডিট লাইনে উত্তম কুমারেরও আগে(মানে ওপরে) তুলসী চক্রবর্তীর নামটি দৃশ্যমান হতে দেখি। এবং সেটা উত্তমের চাইতেও বড় হরফে। সুচিত্রা সেনের আগে রয়েছে মলিনা দেবীর নাম। সেটাও বড় হরফে। সুচিত্রা দেখতে একদম টিঙটিঙে কিশোরী। শাড়ি পরিয়ে তাঁকে কিছুটা বড় বানানো হয়েছে। উত্তম কুমারও তখন সদ্য গোঁফ ওঠা তরুণ। এই ছবিতে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় এবং জহর রায়ও আছেন।
টেলপে সঙ্গীতাংশে গায়ক হিশেবে নাম আছে প্রখ্যাত শিল্পী ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের ছোটভাই বিখ্যাত শ্যামাসঙ্গীত শিল্পী পান্নালাল ভট্টাচার্যেরও। কিন্তু তিনিও কি সাড়ে চুয়াত্তরের দুর্দান্ত সেই গানের দৃশ্যে অভিনয়ে অংশ নিয়েছিলেন? কারো কি জানা আছে?
অটোয়া, কানাডা
