
টরন্টোর প্রাণভোমরা গণপরিবহন ব্যবস্থা টরন্টো ট্রানজিট কমিশন (টিটিসি) এখন এক অভূতপূর্ব আর্থিক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন কানাডিয়ান ডলারের ঘাটতি ধরা পড়েছে, যা সংস্থার সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম বড় বাজেট ঘাটতি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
মহামারীর পরে শহরের জনসংখ্যা বাড়লেও যাত্রী সংখ্যা এখনও আগের স্তরে ফেরেনি। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ১.৫ মিলিয়ন যাত্রী টিটিসি ব্যবহার করেন, যেখানে মহামারীর আগে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ১.৭ মিলিয়ন। এই ঘাটতি বছরে প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলারের ভাড়া আয় কমিয়ে দিয়েছে।
এদিকে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ এবং কর্মচারীদের বেতন বেড়ে মোট ব্যয় প্রায় ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। কেবল জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতেই অতিরিক্ত ৫০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। টিটিসির হিসাব বলছে, বর্তমান আয়ের তুলনায় এই ব্যয়ভার সামাল দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
অতিরিক্ত তহবিল না পেলে বাস, স্ট্রিটকার ও পাতালরেলের সময়সূচি কাটছাঁটের সম্ভাবনা প্রবল। শহর প্রশাসনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, যদি বাস চলাচল ৮–১০ শতাংশ কমানো হয়, তাহলে যাত্রীদের গড়ে অপেক্ষার সময় অন্তত ৪ মিনিট বেড়ে যাবে।
ব্যবসায়ী মহল মনে করছে, ভাড়া সামান্য না বাড়ালে সংকট সামলানো কঠিন। বর্তমানে একক যাত্রার ভাড়া ৩.৩৫ ডলার; মাত্র ১০ সেন্ট বাড়ালেই বছরে প্রায় ৫০ মিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত আয় হতে পারে। তবে যাত্রী সংগঠনগুলির দাবি, বাজেট ঘাটতির পুরো চাপ যাত্রীদের কাঁধে চাপানো উচিত নয়। তাদের প্রস্তাব, বিজ্ঞাপন থেকে আয় বাড়ানো ও দীর্ঘমেয়াদি তহবিল পরিকল্পনা গ্রহণ করা।
শহরের মেয়র জানিয়েছেন, প্রাদেশিক সরকারের সঙ্গে জরুরি আলোচনায় বসা হয়েছে যাতে অন্তত ২০০ মিলিয়ন ডলার সহায়তা পাওয়া যায়। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকারের অবকাঠামো উন্নয়ন তহবিল থেকেও অর্থ সহায়তা চাওয়া হয়েছে। মেয়র স্পষ্টভাবে বলেছেন, “গণপরিবহন টরন্টোর প্রাণ। এটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে শহরের অর্থনীতি ও পরিবেশ দুই-ই বিপর্যস্ত হবে।”
অর্থনীতিবিদদের মতে, গণপরিবহনের মান কমে গেলে অনেক যাত্রী ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের দিকে ঝুঁকবেন। বর্তমানে টরন্টোতে প্রতিদিন গড়ে ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়। যাত্রী সংখ্যা আরও ৫ শতাংশ কমলে গড়ে যানজটে আটকে থাকার সময় ২০ থেকে ২৫ মিনিট পর্যন্ত বাড়তে পারে। এতে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, কার্বন নিঃসরণও বাড়বে, যা শহরের জলবায়ু লক্ষ্যের জন্য বড় হুমকি।
ইগলিনটন ক্রসটাউন ও অন্টারিও লাইনের মতো বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পগুলোও ঝুঁকির মুখে। ইতিমধ্যেই এই প্রকল্পগুলোর ব্যয় ৩০ শতাংশের বেশি বেড়ে গেছে। বাজেট ঘাটতি অব্যাহত থাকলে প্রকল্প শেষ হওয়ার সময় আরও পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, টরন্টো ট্রানজিট কমিশনের সামনে কঠিন সময়। বাড়তি তহবিল না মিললে সেবা কমানো, ভাড়া বৃদ্ধি এবং উন্নয়ন প্রকল্প স্থগিত করা ছাড়া বিকল্প নেই। এখন সারা শহরের নাগরিক ও যাত্রীদের দৃষ্টি প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় সরকারের দিকে, যারা পরবর্তী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করবেন আগামী বছর টরন্টোর গণপরিবহন ব্যবস্থা স্বাভাবিক থাকবে নাকি এক নতুন সংকটের দিকে যাবে।
