
অন্টারিওর স্কুলগুলোতে সহিংসতার ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। প্রাদেশিক সরকারের সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে প্রদেশজুড়ে নথিভুক্ত হয়েছে মোট ৪ হাজার ৪২৪টি সহিংস ঘটনা। সাত বছর আগে যা ছিল এর চেয়ে প্রায় ৮০ শতাংশ কম। শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকরা একে শুধু শৃঙ্খলা ভঙ্গ নয়, বরং গভীরতর একটি সামাজিক সংকট হিসেবে বর্ণনা করছেন।
তথ্য অনুযায়ী, মোট ঘটনার এক-তৃতীয়াংশ মাত্র পাঁচটি স্কুল বোর্ডে ঘটেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রেকর্ড হয়েছে পিল জেলা স্কুল বোর্ডে ৪৩১টি। যদিও এটি আগের বছরের (৭১৭) তুলনায় কিছুটা কম, তবে মহামারির শুরুতে ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে প্রায় এক হাজার ঘটনার রেকর্ডের তুলনায় পরিস্থিতি এখনও গুরুতর।
কানাডার সবচেয়ে বড় শিক্ষা বোর্ড টরন্টো জেলা স্কুল বোর্ডেও সহিংসতার সংখ্যা কম নয়। গত বছর এখানে ঘটেছে ৪১০টি ঘটনা, যা আগের বছরের (৪০৭) সঙ্গে প্রায় সমান। তবে শিক্ষার্থী সংখ্যা অনুযায়ী হিসাব করলে চিত্র আরও স্পষ্ট হয়। পিল জেলায় প্রতি এক হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে সহিংস ঘটনার হার ৪.৮, টরন্টোতে ১.৭ এবং হল্টন ক্যাথলিক শিক্ষা বোর্ডে এ হার দাঁড়িয়েছে উদ্বেগজনক ৫.৭।
শিক্ষাবিদদের মতে, এই সংখ্যা শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সংকট, শিক্ষক সংকট এবং পর্যাপ্ত সহায়তা ব্যবস্থার অভাবের প্রতিফলন। বহু শিক্ষক জানিয়েছেন, পর্যাপ্ত জনবল ও সহায়তা ছাড়া সহিংস পরিস্থিতি সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, মহামারির পর সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, পারিবারিক চাপ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং প্রযুক্তি-নির্ভরতার কারণে শিক্ষার্থীদের আচরণে পরিবর্তন এসেছে। এর ফলেই সংঘর্ষ, মারামারি এমনকি শিক্ষকের ওপর আক্রমণের মতো ঘটনাও বাড়ছে।
সমাধানের পথ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা সুপারিশ করেছেন ১) স্কুলে কাউন্সেলর ও মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সংখ্যা বাড়ানো ২) শিক্ষকদের সংকট মোকাবিলা ও আচরণ নিয়ন্ত্রণে প্রশিক্ষণ দেওয়া ৩) শ্রেণিকক্ষে ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত কমানো এবং ৪) অভিভাবক ও সম্প্রদায়ের সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া। তাদের মতে, এখনই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নিলে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং শিক্ষাব্যবস্থার ওপর আস্থা আরও কমে যেতে পারে।
একই সময়ে জাতীয় আলোচনায় উঠে এসেছে অভিবাসন নীতি। নতুন এক জরিপে দেখা গেছে, কানাডিয়ানরা এ বিষয়ে গভীরভাবে বিভক্ত।
৫৫ বছর বা তার বেশি বয়সীরা চান, দেশে কম সংখ্যক বৈধ অভিবাসী প্রবেশ করুক। তরুণ প্রজন্ম এর বিপরীতে অভিবাসন নীতিকে আরও উন্মুক্ত করার পক্ষে।
জরিপে অংশ নেওয়া ৪৩% কানাডিয়ান মনে করেন, অভিবাসন দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। গত বছরের তুলনায় এ হার এক শতাংশ বেড়েছে। তবে ৩৯% বলেছেন, অভিবাসন অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বাকিরা নিরপেক্ষ বা অনিশ্চিত।
এনডিপি সমর্থকদের ৫৯% অভিবাসনকে ইতিবাচক মনে করেন। আবার লিবারেল সমর্থকদের মধ্যে এ হার ৫৫% এবং কনজার্ভেটিভ সমর্থকদের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব মাত্র ২৭%।
সার্বিকভাবে দেখা গেছে, ৪১% কানাডিয়ান অভিবাসীর সংখ্যা কমাতে চান, ৩৪% বর্তমান স্তর বজায় রাখতে চান এবং মাত্র ১৬% সংখ্যা বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছেন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আবাসন সংকট, কর্মসংস্থানের চাপ এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে অভিবাসন নিয়ে জনমত বিভক্ত হয়ে পড়েছে।
অন্টারিওর স্কুলে সহিংসতার উত্থান এবং অভিবাসন নীতি নিয়ে কানাডিয়ানদের বিভক্ত মতামত দুটি বিষয়ই এখন জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে।
শিক্ষাবিদ ও নীতি-নির্ধারকরা বলছেন, একদিকে স্কুলে নিরাপত্তা জোরদার ও শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। অন্যদিকে, অভিবাসন নীতিতে ভারসাম্য এনে শ্রমবাজারের চাহিদা পূরণ করার পাশাপাশি নাগরিকদের উদ্বেগও মোকাবিলা করতে হবে।
অন্যথায়, সামাজিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক চাপ টোই কানাডিয়ান সমাজে আরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
