
জাতিসংঘের ৭৯তম সাধারণ অধিবেশনে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এক ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছেন, যা দেশটির পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক কৌশলে নতুন দিক নির্দেশনা যোগ করেছে। বিশ্ব নেতাদের সামনে তিনি ঘোষণা দেন যে, আসন্ন দশকে কানাডা শুধু একটি অংশগ্রহণকারী দেশ নয়, বরং একজন কার্যকর বৈশ্বিক নেতৃত্ব প্রদানকারী শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে প্রস্তুত।
মার্ক কার্নির বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও শক্তি খাতে কানাডার বহুমুখী কৌশল ও অঙ্গীকার যা ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে কানাডার ভূমিকা নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী কার্নি বলেন, “বিশ্ব যখন বাণিজ্য যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি সংকট ও প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার মতো বহুমুখী সংকটে নিমজ্জিত, তখন কানাডা পিছিয়ে থাকবে না।”
দীর্ঘদিন ধরে কানাডার বাণিজ্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপকেন্দ্রিক ছিল। তবে এবার তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, দেশটি আর কেবল ঐতিহ্যগত বাজারের ওপর নির্ভর করবে না। বরং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার সঙ্গে নতুন বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরে রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি অন্তত ২০ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে তিনি ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে সদ্য স্বাক্ষরিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির কথা উল্লেখ করেন। এই চুক্তির মাধ্যমে কানাডার ৯৫ শতাংশ পণ্য শুল্কমুক্তভাবে ইন্দোনেশিয়ার বাজারে প্রবেশাধিকার পাবে, যা কানাডার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সাফল্য।
আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ, সাইবার হামলা এবং আঞ্চলিক সংঘাতকে বিশ্ব শান্তির জন্য বড় হুমকি হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী জানান, কানাডা এখন থেকে আরও সক্রিয় ও কৌশলগত ভূমিকা পালন করবে। তিনি ঘোষণা দেন, আগামী তিন বছরের মধ্যে আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অতিরিক্ত ৫,০০০ সেনা ও বিশেষজ্ঞ পাঠানো হবে।
এছাড়া সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করতে ২ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পরিকল্পনাও ঘোষণা করা হয়েছে। কানাডা ন্যাটো, জি–৭ এবং জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে তার অংশগ্রহণ আরও বৃদ্ধি করবে বলে তিনি জানান।
জ্বালানি সংকটে বিপর্যস্ত বিশ্বের প্রেক্ষাপটে কানাডা নিজেকে একটি নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহকারী দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চায়।
২০২৪ সালে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানিতে কানাডা ছিল বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশ। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৬০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসবে—যা পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় বড় ভূমিকা রাখবে।
এছাড়া উত্তর আমেরিকার জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কানাডা যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর সঙ্গে সমন্বিত জ্বালানি নীতি প্রণয়নেও অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে।
কার্নি তাঁর ভাষণে কানাডার বহুসাংস্কৃতিক সমাজ ও মানবাধিকারের প্রতি অঙ্গীকারের কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “কানাডার শক্তি শুধু প্রাকৃতিক সম্পদে নয়, বরং মানুষের বৈচিত্র্য ও সহাবস্থানে। আমরা সেই বৈচিত্র্যকে কাজে লাগিয়ে বিশ্ব শান্তি ও উন্নয়নে অবদান রাখতে চাই।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কানাডাকে শুধু অর্থনৈতিক বা নিরাপত্তা শক্তি নয়, নৈতিক ও মানবিক নেতৃত্বের ভূমিকায়ও তুলে ধরেছেন।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী কার্নির এই বক্তব্য কানাডার বৈশ্বিক ভাবমূর্তিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। বিশেষ করে বাণিজ্য ও জ্বালানি খাতে বহুপাক্ষিক সহযোগিতার আহ্বান আন্তর্জাতিক মহলে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। তবে সমালোচকরাও চুপ নেই। তাঁদের মতে, এই উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা সহজ হবে না। দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ, সম্ভাব্য অর্থনৈতিক মন্দা এবং আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির জটিলতা এই তিনটি বিষয় কার্নির প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবায়নের পথে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে মার্ক কার্নির ভাষণ কানাডাকে একটি মধ্যম শক্তি থেকে উদীয়মান বৈশ্বিক নেতৃত্বের ভূমিকায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।
এখন দেখার বিষয়, আগামী দিনে কানাডা কতটা দক্ষতার সঙ্গে এই অঙ্গীকার বাস্তবে রূপ দিতে পারে। বিশ্ব রাজনীতির বিশ্লেষকরা ইতিমধ্যেই এই পরিবর্তনের দিকে গভীর নজর রাখছেন।
